Homeসারাদেশচলছে গাড়ি জ্বলছে ল্যাম্পপোস্ট, তবু সন্ধ্যা হলেই কেন রাস্তার পাশের গাছে চড়ুইয়ের...

চলছে গাড়ি জ্বলছে ল্যাম্পপোস্ট, তবু সন্ধ্যা হলেই কেন রাস্তার পাশের গাছে চড়ুইয়ের ভিড়

সন্ধ্যা নামছে। একে একে জ্বলে উঠছে সড়কের বাতি। আলোয় ঝলমল করছে ঢাকা শহর। সড়কেও গাড়ির হর্ন আর মানুষের কোলাহল। এরই মধ্যে পান্থপথের সড়ক বিভাজকের বকুল গাছগুলোতে শুরু হয় অন্যরকমের ব্যস্ততা। 

এক ডাল থেকে অন্য ডালে উড়ে বেড়াচ্ছে ঝাঁকে ঝাঁকে চড়ুই পাখি। কিচিরমিচিরে ভরে উঠছে গাছগুলো। পাখিগুলো সেখানে জড়ো হয়েছে রাত কাটাতে। আবার ভোর হলেই গাছটা ফাঁকা করে দিয়ে উড়ে যাবে ওরা।

রাজধানীর অলিগলিতে বড় গাছপালা ছাড়াও সায়েন্সল্যাব থেকে শাহবাগ, বসুন্ধরা সিটি কমপ্লেক্সের পেছনের রাস্তা, উত্তরার বিভিন্ন সড়ক, এমনকি যমুনা ফিউচার পার্ক চত্বরের আশপাশের গাছেও দেখা যায় এমন দৃশ্য।

দিনের বেলায় যেসব গাছে তেমন পাখি চোখে পড়ে না, সন্ধ্যা হলেই সেগুলো হয়ে ওঠে চড়ুইদের রাতের আশ্রয়।

সাধারণত মানুষের উপস্থিতি টের পেলে অনেক পাখিই দূরে সরে যায়, আড়ালে চলে যায়। কিন্তু চড়ুই যেন এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। মানুষের বসতি, দোকানপাট, ব্যস্ত সড়ক, সবকিছুর কাছাকাছি থেকেও তারা দিব্যি নিজেদের মতো জীবন কাটায়। শহরের শব্দ আর আলো উপেক্ষা করে নির্দিষ্ট কিছু গাছে রাত কাটায় দল বেঁধে।

চড়ুইয়ের বৈজ্ঞানিক নাম ‘প্যাসার ডমেস্টিকাস’। অনেকে একে ‘ঘর চড়ুই’ও বলেন।

গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের রিপ্রোডাক্টিভ হেলথ বিভাগের অধ্যাপক পাখি বিশেষজ্ঞ আ ন ম আমিনুর রহমান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ঘরের কোণে বাসা বাঁধা এবং মানুষের আশপাশে থাকতে পছন্দ করার কারণেই এদের এমন নাম। চড়ুই পোষা পাখি নয়, বরং মানুষের বসতির সঙ্গে অভ্যস্ত একটি আবাসিক পাখি।’

তিনি আরও বলেন, ‘চড়ুইয়ের একটি বিশেষ অভ্যাস হলো, প্রজনন মৌসুমের বাইরে দলবদ্ধভাবে গাছে রাত কাটানো। পাখিবিজ্ঞানে এ আচরণকে “রুস্টিং” বলা হয়।’

অধ্যাপক আমিনুরের ভাষ্য, সন্ধ্যার দিকে চড়ুই নির্দিষ্ট কিছু গাছে জড়ো হয়। সারা রাত সেখানে কাটিয়ে ভোর হলে আবার বিভিন্ন দিকে চলে যায়। পরে অনেকক্ষেত্রে একই গাছে ফিরে আসে। এভাবে কোনো কোনো গাছ দীর্ঘদিন তাদের রাত কাটানোর জায়গা হয়ে ওঠে।

দলবদ্ধভাবে রাত কাটানোর পেছনে চড়ুইদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন অধ্যাপক আমিনুর রহমান।

তার মতে, ঘন পাতাযুক্ত গাছের ডালপালা পাখিদের বাতাস ও বৃষ্টি থেকে কিছুটা আড়াল দেয়। একই সঙ্গে সম্ভাব্য শিকারির চোখ থেকেও তাদের আড়াল করতে পারে।

তিনি বলেন, দলবদ্ধভাবে থাকলে বিড়াল, পেঁচা কিংবা অন্য কোনো শিকারির উপস্থিতি টের পাওয়ার সুযোগ বাড়ে। একটি পাখি বিপদ বুঝতে পারলে অন্যদের মধ্যেও সতর্কতার সংকেত ছড়িয়ে দিতে পারে। ফলে একসঙ্গে থাকার কারণে শিকারির আক্রমণ থেকে বাঁচার সম্ভাবনা বাড়ে।

এছাড়া, রাত হলে যখন প্রকৃতি শীতল হতে শুরু করে তখন কাছাকাছি থাকলে তাদের শরীরের তাপ ধরে রাখতেও সুবিধা হতে পারে। আবার, যেসব এলাকায় দিনের বেলায় খাবার ও পানির সংস্থান থাকে, সেসব এলাকার কাছাকাছি গাছও রাত কাটানোর জন্য বেছে নিতে পারে চড়ুই।

অধ্যাপক আমিনুর রহমান বলেন, চড়ুই সামাজিক পাখি। দলবদ্ধভাবে থাকা তাদের স্বাভাবিক আচরণের অংশ। সন্ধ্যার আগে নির্দিষ্ট গাছে জড়ো হওয়ার সময় তাদের মধ্যে বেশ কিচিরমিচিরও শোনা যায়।

ঢাকা ছাড়াও বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে এমন দৃশ্য দেখা যায় বলে জানান এই পাখি বিশেষজ্ঞ। সিরাজগঞ্জে মহাসড়কের পাশে ফুড ভিলেজ এলাকা, কুমিল্লা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, কিশোরগঞ্জে একটি পেট্রলপাম্পের আশপাশ এবং সিলেট সড়কের বাস থামার জায়গাগুলোতে গাছে দলবদ্ধভাবে চড়ুইদের থাকতে দেখেছেন তিনি।

তবে প্রজনন মৌসুমে তাদের আচরণ বদলে যায়। আমিনুর রহমান বলেন, ‘তখন চড়ুই জোড়া বাঁধে এবং প্রজনন নিয়ে ব্যস্ত থাকে। সে সময় প্রজনন মৌসুমের বাইরের মতো বড় দলে রাত কাটানোর প্রবণতা দেখা যায় না।’

চড়ুই কেন সড়কের পাশে কিছু গাছকে বেছে নেয়, তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে নিরাপত্তা ও খাবারের বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন উদ্ভিদ, প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক এবং তরুপল্লবের সাধারণ সম্পাদক মোকারম হোসেন।

তিনি বলেন, ‘পাখিরা এমন জায়গা খোঁজে, যেখানে নিরাপদে থাকতে পারে এবং মানুষের হাতে ধরা পড়া বা বিরক্ত হওয়ার আশঙ্কা কম। একই সঙ্গে সেখানে খাবারের সংস্থান থাকাও গুরুত্বপূর্ণ।’

মোকারম হোসেন আরও বলেন, ‘শহরে চড়ুইয়ের উপস্থিতির আরেকটি কারণ মানুষের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের সহাবস্থান। মানুষের আশপাশে থাকতে থাকতে তারা এই পরিবেশের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। তাই মানুষের উপস্থিতি বা শহরের কোলাহল তাদের কাছে কোনো সমস্যা মনে হয় না।’

বন বিভাগ ও যুক্তরাষ্ট্রের বন বিভাগের সংস্থা ইউএস ফরেস্ট সার্ভিসের করা ঢাকার প্রথম নগর বৃক্ষ জরিপ থেকে জানা যায়, রাজধানীর ৩০৬ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১৩ লাখ গাছ আছে।

২০২৫ সালে প্রকাশিত ‘আরবান ট্রি ইনভেনটরি অব ঢাকা সিটি’ শীর্ষক এই জরিপ অনুযায়ী, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রতি হেক্টরে গড়ে ১৫টি গাছ রয়েছে। উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় এ সংখ্যা প্রায় সাতটি।

অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ওয়াইল্ড লাইফ রিসার্চ ল্যাবরেটরির অধীনে ২০১৩ সাল থেকে পরিচালিত এক গবেষণার ফল ২০২৩ সালে প্রকাশিত হয়। এতে ঢাকায় ১৬২ প্রজাতির পাখির উপস্থিতির তথ্য উঠে আসে, যার মধ্যে চড়ুইও রয়েছে।

তবে শহরে গাছের সংখ্যা থাকলেই পাখির জন্য যথেষ্ট আশ্রয় নিশ্চিত হয় না। গাছের ধরন, আকার, ডালপালার ঘনত্ব এবং আশপাশের পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ।

মোকারম হোসেন বলেন, শহর ও সড়কগুলোতে পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগানো প্রয়োজন। দেশি গাছ পাখিদের খাবার, আশ্রয় ও বাসা বাঁধার সুযোগ তৈরি করে। কোনো গাছে ফল ধরে, কোনো গাছে থাকে কীটপতঙ্গ, যা পাখির খাবার হিসেবেও কাজে আসে।

তার মতে, শুধু কয়েকটি গাছ টিকিয়ে রাখাই যথেষ্ট নয়, শহরে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের বৈচিত্র্য নিশ্চিত করতে হবে।

ঢাকার ব্যস্ত সড়কের পাশে সন্ধ্যায় চড়ুইয়ের কিচিরমিচির হয়তো অনেকের কানে স্বস্তি দেয়। তবে মানুষের বসতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া এই পাখিদের জীবনযাপনের জন্য শহরে গাছ থাকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা-ও মনে রাখতে হবে।

কোলাহলের মধ্যেও চড়ুইদের রাতের আশ্রয় টিকিয়ে রাখতে হলে গাছের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি গাছের বৈচিত্র্য রক্ষার দিকে নজর দিতে বলেন মোকারম হোসেন।

RELATED ARTICLES

Most Popular