Homeস্পোর্টসমিরপুর টেস্টে বিপর্যয়ের চার কারণ

মিরপুর টেস্টে বিপর্যয়ের চার কারণ

সিরিজ শুরুর আগে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত বলছিলেন, তাদের সব নজর আপাতত মিরপুর টেস্টের দিকে। যদিও মূল আলোচনা ঘুরপাক খাচ্ছিল বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালের স্বপ্ন ঘিরে। মুখে যাই বলুন, শান্তর মনেও যে সেই স্বপ্ন উঁকি দিচ্ছিল, তা বলা বাহুল্য। তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে প্রথম টেস্টে ৮ উইকেটের বড় ব্যবধানে হেরে আপাতত বাস্তবতার শক্ত জমিনেই পা রাখতে হচ্ছে। মিরপুর টেস্টে পরিষ্কার ফেভারিট হিসেবে নেমেও কেন মিলল না হিসাব? কেন সবকিছু উল্টো বুমেরাং হয়ে গেল? 

অন্যের জন্য পাতা ফাঁদে যদি নিজেরই পা আটকে যায়, তবে দৃশ্যটি বেশ বিব্রতকর। মিরপুর টেস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে ধরাশায়ী শান্তদের অবস্থা ঠিক যেন তেমনই। ঘরের মাঠের সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা দোষের কিছু নয়। তবে কোন পথে এগোলে সত্যিকারের সুবিধা পাওয়া যাবে, সেই হিসাবটা তো ঠিকঠাক মেলাতে হবে! 

পরিসংখ্যান বলছে, মিরপুরে গত পাঁচ বছরে যখনই বিদেশি দলগুলোর বিপক্ষে স্পিন-ফাঁদ পেতেছে বাংলাদেশ, তখনই ধসে পড়েছে নিজেদের ব্যাটিং লাইনআপ। আয়ারল্যান্ড, আফগানিস্তান বাদ দিলে গত ছয় টেস্টের পাঁচটাতেই হার এই মাঠে।  প্রতিপক্ষের স্পিনারদের চেয়ে দেশি স্পিনারদের অনুজ্জ্বল থাকা, ব্যাটারদের স্কিলের ঘাটতি এবং স্পিন উইকেটে ম্যাচের ভাগ্য লটারির মতো হয়ে যাওয়া—এসব কিছুই বারবার পেছন থেকে টেনে ধরেছে। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সিরিজে বাংলাদেশের পেসাররা দুর্দান্ত পারফর্ম করছিলেন। এই পেস বোলিং আক্রমণের ওপর ভর করেই টেস্টে অস্ট্রেলিয়া ও পাকিস্তানের বিপক্ষে স্মরণীয় জয় এসেছিল। সেই ইতিবাচক ধারা বজায় না রেখে মিরপুরে অতিমাত্রায় স্পিন-সহায়ক উইকেট তৈরি করা হয়, যা শেষ পর্যন্ত বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায় এবং নিজেদের ব্যাটাররাই সফরকারী স্পিনারদের সামনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন। 

২. ব্যাটারদের স্পিন-দুর্বলতার কঙ্কালসার রূপ 

বাংলাদেশের ব্যাটাররা আসলে কিসে বেশি দুর্বল—পেসে নাকি স্পিনে? শান্তর সরল স্বীকারোক্তি ছিল, ‘মাঝে মাঝে আমরা পেস ভালো খেলি, মাঝে মাঝে স্পিন।’ উপমহাদেশের দল মানেই স্পিন ভালো খেলবে—বিষয়টি এখন কেবলই একটি অলীক রূপকথা। বাস্তবতা বলছে, স্পিনে চরম দুর্বল টাইগার ব্যাটাররা। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে স্পিন উইকেট বানালে নিজেদেরও তো তাতে খেলার সামর্থ্য থাকতে হবে! 

চেনা কন্ডিশনে স্পিন উইকেটে খেলতে গিয়ে স্পিনের বিপক্ষেই ব্যাটারদের কঙ্কালসার চেহারা ফুটে উঠেছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্পিনারদের জোরালো টার্ন ও শার্প আর্ম-ডেলিভারির সামনে স্বাগতিক ব্যাটারদের মনে হয়েছে একদম দিশেহারা। বিশেষ করে সঠিক শট সিলেকশনের চরম অভাব, জড়তাহীন ফুটওয়ার্কের অনুপস্থিতি এবং টেকনিক্যাল ভুলের কারণেই দুই ইনিংসেই বড় বিপর্যয় ঘটেছে। 

৩. স্পিন আক্রমণের ধারহীনতা ও ছন্দহীনতা 

যেখানে ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্পিনাররা দুই ইনিংস মিলিয়ে ১৬টি উইকেট তুলে নিয়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছেন, সেখানে স্বাগতিক স্পিনাররা দুই ইনিংস মিলিয়ে নিতে পেরেছেন মাত্র ৮টি উইকেট। তাইজুল ইসলাম কিংবা মেহেদী হাসান মিরাজরা উইকেটের ভালো লেংথে বল ফেলতে পারেননি—এ কথা সোজাসাপ্টা স্বীকার করেছেন খোদ অধিনায়ক নিজেই। ক্যারিবিয়ান স্পিনাররা যেখানে গড়ে সাড়ে তিন ডিগ্রি করে টার্ন আদায় করেছেন, বাংলাদেশের স্পিনাররা তার থেকে ০.৫ পিছিয়ে ছিলেন। ছিলো গতির তারতম্যও। ক্যারিবিয়ান স্পিনাররা অনেক বেশি বল স্কিড করাতে পেরেছেন, যেটা পারেননি তাইজুলরা।

তারা প্রতিপক্ষের ওপর কোনো ধরনের ধারাবাহিক চাপ তৈরি করতে পারেননি। ক্যারিবীয় স্পিনারদের দুর্দান্ত বোলিংয়ের বিপরীতে বাংলাদেশি স্পিনারদের এই চরম ছন্দহীনতা ও ধারহীনতাই গোটা ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিয়েছে। 

৪. অপর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও মাঠের বাইরের অস্থিরতা 

সিরিজ শুরুর আগে নিখুঁত প্রস্তুতির দিক থেকেও ওয়েস্ট ইন্ডিজ ছিল বেশ কয়েক ধাপ এগিয়ে। বাংলাদেশে আসার আগে তারা ভারতের চেন্নাইয়ে নিবিড় ক্যাম্প করেছে। ঢাকায় এসেও ১০ দিন আগে থেকে অনুশীলন ও প্রস্তুতি ম্যাচ খেলে কন্ডিশনের সঙ্গে পুরোপুরি মানিয়ে নিয়েছে। 

অন্যদিকে, বাংলাদেশ দল সাম্প্রতিক সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ব্যস্ত ছিল সাদা বলের ত্রিদেশীয় সিরিজে। সেখান থেকে দেশে ফিরে মূল দল একসঙ্গে অনুশীলন সেশন করার সুযোগ পেয়েছে স্রেফ দুটি। এর ওপর ব্যাটিং কোচের বদল ঘিরে নাটক এবং ঘরোয়া টুর্নামেন্টের নিলামসহ নানা ইস্যু মাঠের বাইরে তৈরি করেছিল চরম অস্থিরতা, যা স্বাভাবিকভাবেই খেলোয়াড়দের মনোযোগ ও মানসিক প্রস্তুতিতে বিঘ্ন ঘটিয়েছে।

RELATED ARTICLES

Most Popular