Homeসারাদেশরংপুরের গ্রামাঞ্চলে পেশাদার ঢাকি না পেয়ে ঢাক বাজাচ্ছেন পূজা কমিটির সদস্যরা

রংপুরের গ্রামাঞ্চলে পেশাদার ঢাকি না পেয়ে ঢাক বাজাচ্ছেন পূজা কমিটির সদস্যরা

রংপুরের গ্রামাঞ্চলে দুর্গাপূজার আয়োজনে ঢাকির সংকট দেখা দিয়েছে। পেশাদার ঢাকি না পেয়ে অনেক মণ্ডপে পূজা কমিটির সদস্যরাই ঢাক বাজাচ্ছেন। এর ফলে পূজার বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা সময়মতো সম্পন্ন করতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে তাদের।

ঢাকিরা বলছেন, সারা বছর কাজ না থাকায় অনেকেই এই পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। নতুন প্রজন্মেরও এ পেশায় আগ্রহ কম। অন্যদিকে, প্রতিবছর বাড়ছে পূজামণ্ডপের সংখ্যা। ফলে দুর্গাপূজার সময় ঢাকির সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। 

তাদের আশঙ্কা, এই পেশায় আগ্রহ বাড়ানোর পাশাপাশি সারা বছর কাজ ও আয়ের নিশ্চয়তা তৈরি করা না গেলে ভবিষ্যতে সংকট আরও বাড়বে।

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর রংপুর বিভাগের আট জেলায় ৫ হাজার ১৩৬টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ২০১০ সালে এ সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ হাজার। প্রতিবছর মণ্ডপের সংখ্যা বাড়ছে। 

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার নামুড়িহাট কেন্দ্রীয় দুর্গামন্দিরে প্রতিবছর চুক্তিতে ঢাকি আনা হতো। এবার অনেক খুঁজেও কোনো ঢাকি পাননি মন্দির কমিটির সদস্যরা। শেষ পর্যন্ত ৬ হাজার টাকা খরচ করে একটি ঢাক তৈরি করিয়েছেন তারা। এখন সেই ঢাক বাজিয়েই পালা করে পূজার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করছেন কমিটির সদস্যরা।

মন্দির কমিটির সদস্য নির্মল চন্দ্র রায় বলেন, অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তারা পেশাদার ঢাকি পাননি। অথচ দুর্গাপূজায় ঢাকের বাদ্য অপরিহার্য। বাধ্য হয়ে একটি ঢাক তৈরি করিয়েছেন তারা। একজন ঢাকিকে দুর্গাপূজার সময় ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরি দিতে হয়।

নির্মল চন্দ্র রায় বলেন, ‘ছয় হাজার টাকা দিয়ে যে ঢাক বানিয়ে নিয়েছি, তা দিয়ে তিন-চার বছর পূজায় ঢাক বাজানো যাবে। কমিটির সদস্যরা পালা করে ঢাক বাজাচ্ছেন। তবে এতে সমস্যা হচ্ছে। অনেক সময় নির্ধারিত সময়ে ঢাকের শব্দ শোনা যায় না।’

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার সিঙ্গারডাবরী এলাকার একটি দুর্গামন্দিরেও একই পরিস্থিতি। গত বছর ১৩ হাজার টাকা চুক্তিতে সেখানে একজন ঢাকি এসেছিলেন। এবার তাকে পাওয়া যায়নি। পরে ৮ হাজার টাকা খরচ করে একটি ঢাক তৈরি করিয়েছে মণ্ডপ কমিটি।

কমিটির সদস্য অবিনাশ চন্দ্র বর্মণ বলেন, ঢাকির সংকটে পূজার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। স্থানীয় কেউ কেউ ঢাক বাজাতে পারলেও পেশাদার ঢাকিদের মতো তাল ও ছন্দ বজায় রাখা কঠিন। পূজায় ঢাক বাজানো জরুরি হওয়ায় বাধ্য হয়ে কমিটির সদস্যরাই সেই দায়িত্ব পালন করছেন।

রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার মিলনপুর গ্রামের দুর্গামন্দির কমিটির সদস্য রনজিত চন্দ্র রায় বলেন, এবার তারাও কোনো ঢাকি পাননি। কমিটির সদস্যরাই ঢাক বাজিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করছেন।

তিনি বলেন, ‘ঢাকির পেছনে যে টাকা খরচ হতো, তা সাশ্রয় হচ্ছে। কিন্তু মন্দিরে সময়মতো ঢাকের শব্দ শোনা যাচ্ছে না। বিশেষ করে আরতির সময় সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। পেশাদার ঢাকি ছাড়া পূজার আনুষ্ঠানিকতা ঠিকভাবে সম্পন্ন করা যায় না।’

লালমনিরহাট শহরের কেন্দ্রীয় কালীবাড়ী শ্রীশ্রী দুর্গা ও কালীমন্দিরে গত ১৫ বছর ধরে ঢাক বাজাচ্ছেন বাবুল চন্দ্র দাস। তিনি বলেন, গ্রামের অধিকাংশ মন্দিরে এখন আর নির্ধারিত ঢাকি নেই। সারা বছর কাজ না থাকায় অনেকেই এ পেশা ছেড়ে দিয়েছেন।

বাবুল চন্দ্র দাস বলেন, ‘দুর্গাপূজা এলে ঢাকিদের চাহিদা বাড়ে। হাতেগোনা কিছু মন্দিরে পেশাদার ঢাকি রয়েছেন। অধিকাংশ মন্দিরে মৌসুমি ঢাকি দিয়ে কাজ চালানো হয়। এখন অনেক মন্দিরের কমিটির সদস্যরাই নিজেদের ঢাক তৈরি করে নিচ্ছেন।’

রংপুর নগরীর মুলাটোল এলাকার একটি পূজামণ্ডপের নির্ধারিত ঢাকি সুখেন দাসও মনে করেন, এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে সংকট আরও বাড়বে। 

তার ভাষ্য, সারা বছর কাজ না থাকায় অনেক ঢাকি অন্য পেশায় চলে গেছেন। নতুন করে কেউ এ পেশায় আসতেও চাইছেন না। দুর্গাপূজার সময় শহরে ঢাকিরা ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা মজুরি পেলেও গ্রামে পান ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা।

তিনি বলেন, ‘আগামীতে আরও বেশি ঢাকির সংকট তৈরি হবে। একসময় হয়তো আমাদের পেশাটাই হারিয়ে যাবে।’

 

RELATED ARTICLES

Most Popular