Homeস্পোর্টস‘প্রবাসীরা আসায় স্থানীয়দেরও উন্নতির তাগিদ তৈরি হয়েছে’

‘প্রবাসীরা আসায় স্থানীয়দেরও উন্নতির তাগিদ তৈরি হয়েছে’

জাতীয় দলে ফিরেই ‘সুপার-সাব’ হিসেবে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেললেন মোহাম্মদ ইব্রাহিম; বৃহস্পতিবার সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের উদ্বোধনী ম্যাচে ভুটানের বিপক্ষে করলেন জয়সূচক গোল। ফর্টিস এফসির হয়ে দারুণ ছন্দে থাকা ২৯ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড তার গোল, বেঞ্চে ও দলের বাইরে কাটানো সময়, জাতীয় দলে ফের ডাক পেতে নিজের পারফরম্যান্সে আনা উন্নতির বাইরেও দলের ভেতরের আবহ নিয়ে ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর সঙ্গে কথা বলেছেন।

মোহাম্মদ ইব্রাহিম: যখন মাঠে নামি, কোচ আমাকে বলছিল থার্ড ম্যান হিসেবে বক্সে রান করার জন্য। কারণ আমাদের তখন গোল হচ্ছিল না, গোলের দরকার ছিল। ডি-বক্সে বল যাচ্ছিল অনেক, বলছিল ডি-বক্সের আশপাশে থাকতে। আমার লক্ষ্য ছিল অনেক দিন পর সুযোগ যখন পেয়েছি, সুযোগটা কাজে লাগাতে হবে। যেন গোল করতে পারি, অনেক ভালো লাগছে এখন।

ওই নির্দিষ্টভাবে ওই গোলটা আমরা যেটা দেখলাম—লেফট সাইড থেকে একটা ক্রস গেল, একটু যদি বর্ণনা দিতেন।

ইব্রাহিম: বল যখন ক্রস হয়ে ডি-বক্সে আসছিল, তখন আমি রিড করছিলাম যে বলটা কোথায় থাকতে পারে। যখনই দেখলাম বল এয়ারে শমিতের মাথায়, তখন আমি সেকেন্ড বলটা কোথায় পড়তে পারে ওইটার জন্য তৈরি ছিলাম। সেকেন্ড বলটা দেখলাম আমার ফেভারে আসছে। এরপর গোলকিপারের দিকে একটু তাকাই, পরে বারে ট্রাই করি।

ইব্রাহিম: ওই মুহূর্ত তো ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। এটা শুধুমাত্র ফরোয়ার্ড লাইনের প্লেয়ার হিসেবে না, যেকোনো খেলোয়াড়ের জন্য… ওই মুহূর্তে দেশের মাটিতে এতগুলো দর্শকের সামনে গোল করা, এটা তো অবিশ্বাস্য একটা ব্যাপার। সেটা তো ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। তখন মাথায় অনেক কিছু ঘুরপাক খায়, অনেক কিছু মনে রাখা যায় না। কারণ ওটা একটা রোমাঞ্চকর মুহূর্ত।

Bangladesh vs Bhutan SAFF Championship 2026 match resultইব্রাহিম, মোহামেডানের বিপক্ষে আপনার গোলেই আসলে দলটা (ফর্টিস এফসি) বের হয়ে গেল। তারপরে ধরেন এশিয়ান কাপ আসলো, এশিয়ান কাপে প্রিলিমিনারি স্কোয়াডে ডাক পেলেন, ফাইনাল স্কোয়াডে আপনি ছিলেন না। এই যে দলে ফিরতে আপনাকে কী ধরনের কাজ করতে হয়েছে?

ইব্রাহিম: আসলে আগে যেরকম খেলতাম আমরা—উইংয়ে গিয়ে ক্রস করা, তারপর ডিফেন্সে হেল্প করা। দেখছি এটা এখন সাম্প্রতিক সময়ে ফরোয়ার্ড লাইনের প্লেয়ার হিসেবে ইনভার্টেড উইঙ্গার হয়ে গোল করা ডি-বক্সে, এটা আমাদের আগে ছিল না। আমি এটা অনেক দিন ধরে অ্যানালাইসিস করছিলাম। এখন আমার গোল কন্ট্রিবিউশন কতগুলো, অ্যাসিস্ট করতে হবে, গোল করতে হবে… ক্লাবে এখন এটাই চেষ্টা করি যে আমি যেহেতু ফরোয়ার্ড লাইনের প্লেয়ার, আমার গোলের মানে ডি-বক্সের আশপাশে থাকাটা উচিত। অ্যাসিস্ট করা না হলে গোল করা, এটাই এই লিগেও ট্রাই করেছি আমি। লিগে ভালো করছি, জাতীয় দলেও এটা চেষ্টা করছি।

এটার জন্য ফিজিক্যাল ফিটনেস বা অ্যাকুরেসি, অন দ্য টার্গেট—এইসবের জন্য কি আলাদা কোনো চেষ্টা?

ইব্রাহিম: ফিজিক্যাল ফিটনেস না থাকলে তো ধরেন অসম্ভব এটা। অন্তত টপ লেভেলটা ধরে রাখা অসম্ভব, এটা কেউ পারবে না। আপনি হুট করে একটা ম্যাচ ভালো খেলতে পারবেন, দুইটা ম্যাচ ভালো খেলতে পারবেন, কিন্তু কন্টিনিউ এই ধরনের স্টেজে পারফর্ম করা—নিজের ফিজিক্যাল ফিটনেস যদি আমরা পরিচর্যা না করি, এই লেভেলে খেলা সম্ভব না।

জাতীয় দলে ইব্রাহিম ওইভাবে ধারাবাহিক না। আমার ২০১৯-এর সল্টলেকের কথা মনে পড়ে, যে খেলা ইব্রাহিম খেলছিল। পরবর্তীতে দু-একটা ম্যাচ বাদে আবার আপস অ্যান্ড ডাউন দেখা গেছে। মানে এই ঘাটতিটা কোথায় আসলে? জাতীয় দলে ধারাবাহিক না কেন?

ইব্রাহিম: জাতীয় দলে আফগানিস্তান ম্যাচের পরে শেষ গোল করেছিলাম আমি মালয়েশিয়াতে এশিয়ান গেমস বাছাইপর্বে। ওই দুই গোল করার পরে কেন আমাকে বাদ দিয়েছে আমি কিছুই জানি না। দুই গোল করার পরের ম্যাচ থেকেই আমি নাই। আমি কেন বাদ জানি না। তারপরে ক্লাবে তো আল্লাহর রহমতে নিয়মিত পারফর্ম করছিলাম, কিন্তু জাতীয় দলে আসলে হুট করে বাদ পড়ি। আবার স্কোয়াডে থাকলে নামার সুযোগ পাই না।

প্রবাসী প্লেয়ারদের যে হাইপ বা উপস্থিতি, সেটা নিয়ে কী বলবেন?

ইব্রাহিম: ইদানীং প্রবাসী খেলোয়াড়দের জন্য একটু কঠিন হয়ে গেছে আমাদের মতো স্থানীয়দের। ওই পজিশনগুলো একটু টাফ হয়ে গেছে মনে হয়। তবে ওদের দোষ দেব না, আমাদেরও উন্নতি করার দরকার ছিল, আমরা ওদের মতো উন্নতি করতে পারি নাই হয়তোবা। এখন আবার স্থানীয় খেলোয়াড়রা বাড়তি পরিশ্রম করছে। ব্যক্তিগতভাবে আমাদের ক্লাবের কোচের সঙ্গে আলাপ করে দেখি আমার কী করলে আরও উন্নতি হবে, ওগুলো আমরা চেষ্টা করছি।

তার মানে প্রবাসী খেলোয়াড়রা আসার কারণে আপনাদেরও মনে হচ্ছে যে উন্নতি দরকার এবং সেটা সবাই করছে?

ইব্রাহিম: হ্যাঁ।

এবারে যদি ওভারঅল গতকালকের পারফরম্যান্স দেখি, ভুটানের বিপক্ষে খেলাটা প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত দল হিসেবে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

ইব্রাহিম: আমাদের তো লক্ষ্য ছিল অন্তত গোল না খেয়ে আমরা গোল করব। ওটা হয় নাই, কিন্তু শেষ দিকে গোলটা হয়েছে আমাদের। ভুটান তো অত চাপ দিতে পারে নাই আমাদেরকে। তাদের তুলনায় আমরা যথেষ্ট চান্স ক্রিয়েট করেছি, সবকিছুতে আমরা এগিয়ে ছিলাম। আরেকটু ভালো হলে ভালো লাগত, তবে যা হয়েছে আলহামদুলিল্লাহ।

বাংলাদেশের এই খেলার ধারা অব্যাহত থাকলে কি বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হতে পারবে, নাকি আরও লেভেল আপ করতে হবে?

ইব্রাহিম: অবশ্যই লেভেল আপ করতে হবে। কারণ আপনারা জানেন আমাদের মূল খেলোয়াড় হামজা ভাই, হামজা ভাই আসলে দলের চেহারাও অন্যরকম হয়ে যাবে। আর আমরা এখনো চ্যাম্পিয়নশিপ না, আমরা ম্যাচ বাই ম্যাচ টার্গেট করছি।

হামজা আসলে চেহারা বদলে যাবে বলছেন, তার প্রভাবটা ঠিক কেমন?

ইব্রাহিম: এটা তো বলার অপেক্ষা রাখে না, হামজা থাকা মানে দলের… আমাদের বাড়তি একটা আত্মবিশ্বাস থাকে যে হামজা ভাই আছে, মানে আমাদের আরও ভালো করতে হবে। সবার মধ্যেই এটা কাজ করে।

মাঠেও মনে হয় হামজা সবাইকে নির্দেশনা দেন, তাই না?

ইব্রাহিম: হ্যাঁ।

বর্তমানে স্কোয়াডে মূলত ‘নাম্বার নাইন’ পজিশনের খেলোয়াড় নেই। সেক্ষেত্রে এই পজিশনে যারা অ্যাভেলেবল আছে, তাদের মধ্যে রাইট প্লেয়ার কাকে মনে করেন?

ইব্রাহিম: আমি এটা এভাবে বলতে পারব না। আল্টিমেট সিদ্ধান্তটা কোচের। কোচের যেটা সিদ্ধান্ত হবে… এখন আমাকে যদি বলে যে রাইট ব্যাক খেলতে হবে, আমি চেষ্টা করব সর্বোচ্চ দিয়ে রাইট ব্যাকে খেলতে।

বিশ্বনাথ কালকে ‘নাম্বার নাইন’ পজিশনে খেলল। কিছুটা সারপ্রাইজড হয়েছেন কিনা এবং ওর খেলাটা কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

ইব্রাহিম: ওর কাছ থেকে কোচ যেটা চাইছে—গোল করতে না পারলেও ও প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের ক্লান্ত করবে। ওইটা ও ওর কাজে ঠিকঠাক করেছে। আমরা সবাই জানি বিশ্বনাথের সামর্থ্য কতটুকু। ও কঠোর পরিশ্রমী খেলোয়াড়, ফিজিক্যাল ডুয়েলে যথেষ্ট ভালো। একদম ওইটাই চাইছিল কোচ—ওদেরকে ক্লান্ত করে পরে আমরা চেঞ্জিংয়ে নামলে যেন চান্স ক্রিয়েট করতে পারি। ওইটাই হয়েছে আরকি।

ও যদি ঘরোয়া ফুটবলে ফরোয়ার্ড পজিশনে খেলত, যে সুযোগগুলো পেয়েছিল, সে কি আরও ভালো ফিনিশ করতে পারত?

ইব্রাহিম: বিষয় তো ফরোয়ার্ডদের ক্ষেত্রেও ওই রকম হয় যে সুযোগ হাতছাড়া হয়ই। স্ট্রাইকাররা তো মিস করবেই, তিন-চারটা মিসের পর একটা গোল হয়ে গেলে তো আর এই কথা আসত না। দুর্ভাগ্যবশত হয় নাই। তবে ওর কাছ থেকে যেটা চাওয়া হয়েছিল, ওটা ও করতে পারছে।

চ্যাম্পিয়ন হতে গেলে এখনো তিনটা ম্যাচ জিততে হবে—শ্রীলঙ্কা ম্যাচ, সেমিফাইনাল, ফাইনাল। টানা তিনটি ম্যাচ জেতা কি সম্ভব এবং কীভাবে?

ইব্রাহিম: অবশ্যই সম্ভব ইনশাল্লাহ। যেহেতু ঢাকায় খেলা, আমাদের মাঠে খেলা, আমাদের সমর্থকরা সাপোর্ট দেবে। আর ম্যাচ বাই ম্যাচ—আমাদের প্রথম লক্ষ্য আগে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করা। সেমিফাইনালে যে প্রতিপক্ষ আসবে, ওইভাবে প্রস্তুতি নেব।

জেতার পর দলের পরিবেশটা এখন কেমন? ভুটানের সঙ্গে জয় দিয়ে শুরু করার পর দলের সব মিলিয়ে আবহ কেমন?

ইব্রাহিম: ইন্দোনেশিয়া থেকে হেরে আসার পর আবহ ছিল থমথমে। এখন সবকিছু চেঞ্জ হয়ে গেছে, পরিবেশ সবাই উপভোগ করছে। ট্রেনিং আছে, পজিটিভ ভাইব চলে আসছে সবার মধ্যে। পরের ম্যাচে আরও দুই তারকা (হামজা, ফারহান) এসে যোগ দেবে, সেটাও আরেকটা নতুন মোটিভেশন। বিশেষ করে হামজা ভাই আসলে সবকিছু আরও চেঞ্জ হয়ে যাবে।

 

RELATED ARTICLES

Most Popular