গ্রাম এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, সালিশ ও বিচারকাজ পরিচালনা ও উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সর্বনিম্ন স্তর ‘গ্রাম সরকার’ পুনরায় চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার।
এ লক্ষ্যে বিএনপি প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৯৮০ সালে এবং খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় ২০০৩ সালের আইনের আলোকে একটি খসড়া তৈরি করা হয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের একাধিক সিনিয়র কর্মকর্তা দ্য ডেইলি স্টারকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তারা জানান, খসড়াটি শিগগির অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় উত্থাপন করা হবে।
‘গ্রাম সরকার’ ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হবে গ্রামের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও উন্নয়নে স্থানীয়দের অংশগ্রহণ জোরদার।
নতুন করে প্রস্তুত করা খসড়া ‘গ্রাম সরকার আইন ২০২৬’ অনুযায়ী, স্থানীয় সরকারের এই নতুন মডেলে দেশের ৪ হাজার ৫৬৮টি ইউনিয়নের আওতাধীন ৪১ হাজার ১১২ ওয়ার্ডের প্রতিটিতে ১৭ জন করে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি থাকবেন।
খসড়ায় বলা হয়, নারী নির্যাতন ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে স্থানীয়ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়তা করতে কাজ করবে গ্রাম সরকার। এটি গ্রামীণ রাস্তাঘাট ও কালভার্ট নির্মাণের পরিকল্পনা প্রণয়ন করবে, চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনায় সাহায্য করবে এবং নিয়মিত ইউনিয়ন পরিষদে প্রতিবেদন পাঠাবে।
১৯৮০ সালে চালুর কয়েক বছর পরই তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদের শাসননামলে গ্রাম সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়।
পরে ২০০৩ সালে অনির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে এই স্থানীয় ব্যবস্থা নতুন করে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও হাইকোর্ট এটিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করার পর আইনটি বাতিল হয়ে যায়।
বাতিল হওয়া সেই আইনে প্রতি ওয়ার্ডে ১৫ সদস্যের গ্রাম সরকার গঠনের বিধান ছিল, যার সব সদস্য মনোনীত হবেন স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘গ্রাম সরকার’ ব্যবস্থা সারাদেশে একযোগে চালু হলে কাঙ্ক্ষিত ফল নাও আসতে পারে।
প্রথমে এটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প হিসেবে চালু করার এবং প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
খসড়ায় বলা হয়, প্রতি ইউনিয়নের ৯ ওয়ার্ডের প্রতিটিতে একজন নির্বাচিত ইউপি সদস্যের নেতৃত্বে ১৭ সদস্যের ‘গ্রাম সরকার’ গঠন হবে। ওয়ার্ডের একজন নির্বাচিত নারী ইউপি সদস্য এতে উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
বাকি ১৫ সদস্য ওই ওয়ার্ডের অন্তত ১০ শতাংশ ভোটারের ভোটে নির্বাচিত হবেন।
জিয়াউর রহমানের আমলে গ্রাম সরকারের সদস্যরা সরাসরি সরকার মনোনীত হতেন এবং তাদের জন্য কোনো সম্মানি ভাতা ছিল না।
এবারের প্রস্তাবিত খসড়া আইনেও দেশব্যাপী প্রায় ৭ লাখ সদস্যের সম্মানি ভাতার বিষয়ে কোনো উল্লেখ নেই। তবে এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় সম্মানির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতামত চাওয়া হয়েছে।
তবে, প্রস্তাবিত আইনের একটি ধারায় নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদেরও গ্রাম সরকারের সদস্য হওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
খসড়ার ৯(ঘ) উপধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে এক বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে সদস্য পদের জন্য অযোগ্য হবেন।
এর অর্থ হলো, নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধের জন্য এক বছরের কম কারাদণ্ড পেলে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ পাবেন। তবে ওই ধারায় উল্লেখ রয়েছে যে, কারাদণ্ড ভোগ শেষে মুক্তি পাওয়ার পর তাকে ৫ বছর অপেক্ষা করতে হবে।
আইন বিশেষজ্ঞরা দণ্ডিত ব্যক্তিদের স্থানীয় সরকারের এই ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রাখা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, গ্রাম সরকার সালিশ ও বিরোধ নিষ্পত্তির মতো দায়িত্ব পালন করায় দণ্ডিতদের অন্তর্ভুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়া ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘যদিও সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে এ ধরনের বিধান ইতোমধ্যে রয়েছে, তবু কোনো অপরাধে দণ্ডিতকে মধ্যস্থতাকারী বা সালিশকারী হিসেবে দায়িত্ব দিলে পুরো ব্যবস্থাটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন উঠবে।’
‘নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে আদালত কাউকে দণ্ডিত করলে—সরকারি কর্মচারী বা রাজনীতিবিদ যিনিই হোন না কেন—রাষ্ট্রীয় কোনো কর্মকাণ্ডে সংশ্লিষ্ট থাকা উচিত নয়,’ বলেন তিনি।
জনপ্রশাসন গবেষক আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, ভালো উদ্দেশ্যে গ্রাম সরকার পুনরায় চালু করা হলে তা ইতিবাচক ফল দেবে। তবে সারাদেশে একযোগে শুরু করার আগে এটি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা উচিত।
সাবেক এই সচিব ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আশির দশকে গ্রাম আদালতে স্থানীয় মুরুব্বিদের মাধ্যমে সালিশ পরিচালিত হতো। এটি বিচারিক কার্যক্রমের চেয়ে কোনো অংশে কম কার্যকর ছিল না।’
‘কিন্তু গত দেড় দশকে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। অনেকক্ষেত্রে টাকার বিনিময়ে সালিশের কথা শোনা যায়,’ বলেন তিনি।
‘যদি এ ধরনের লোকেরা গ্রাম সরকারে ঢোকার সুযোগ পায়, তাহলে সরকারের মূল উদ্দেশ্যই ভেস্তে যেতে পারে,’ যোগ করেন তিনি।
দেশের ৮ বিভাগের অন্তত ৫০ উপজেলায় এটি পাইলটিং করার পর জাতীয়ভাবে বাস্তবায়নের পরামর্শ দেন তিনি।
যোগাযোগ করা হলে এলজিডির সিনিয়র সচিব শাহিদুল হাসান এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এক সিনিয়র কর্মকর্তা ডেইলি স্টারকে জানান, সরকার পরীক্ষামূলক প্রক্রিয়া ছাড়াই ‘গ্রাম সরকার’ ব্যবস্থা পুনরায় চালু করতে চায়। তবে এখনো এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের মতে, ‘গ্রাম সরকার’ ব্যবস্থা পুনরায় চালুর মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে বিভিন্ন সেবা দক্ষতার সঙ্গে পৌঁছানো সম্ভব হবে।’
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন ব্যবস্থায় অসংখ্য ভুলত্রুটি ও জটিলতা তৈরি হয়। তৃণমূলে থাকা প্রতিনিধিরা যদি এসব কাজ পরিচালনা করেন, তবে এসব ভুল অনেক কমে আসবে এবং মানুষের ভোগান্তি কমবে।’
‘গ্রাম এলাকায় খাদ্যের চাহিদা, পুষ্টির প্রয়োজনীয়তা ও শিশুদের টিকাদানের সঠিক তথ্য সংগ্রহে গ্রাম সরকার সাহায্য করতে পারে, যা ডেটাবেজে ভুয়া ও দ্বৈত এন্ট্রি প্রতিরোধ করবে,’ বলেন তিনি।
