Homeসারাদেশসাইবার সুরক্ষা আইনের খসড়ায় সংশোধন, তবুও কাটছে না উদ্বেগ

সাইবার সুরক্ষা আইনের খসড়ায় সংশোধন, তবুও কাটছে না উদ্বেগ

নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা শেষে সাইবার সুরক্ষা আইনের খসড়ায় বেশ কিছু পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। মানহানির মতো কিছু অপরাধের সংজ্ঞা ও শাস্তি প্রচলিত দণ্ডবিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

আগের খসড়াটি নিয়ে সমালোচনার মুখে নতুন খসড়ায় ‘হেয় প্রতিপন্নের’ সংজ্ঞা নির্ধারণের পাশাপাশি সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের জন্য কিছু সুরক্ষার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, খসড়ায় মোট ১২টি সংশোধনী আনা হবে।

তবে সংশোধিত খসড়াটি এখনো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। এর আগে কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, সংশোধন চূড়ান্ত করার আগে আরও মতামত নেওয়ার জন্য খসড়াটি প্রকাশ করা হবে।

প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো নিয়েও কয়েকটি বিষয়ে সমালোচনা হচ্ছে। সমালোচকদের বক্তব্য, সাংবাদিকদের জন্য যে সুরক্ষার প্রস্তাব করা হয়েছে, তা সব নাগরিকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হওয়া উচিত।

কোনো ব্যক্তির অপরাধের কারণে একটি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের প্রস্তাবও অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এছাড়া মানহানি, গুজব ও ভুয়া খবর নিয়ন্ত্রণের জন্য আদৌ সাইবার আইন ব্যবহার করা উচিত নয়।

গুজব ছড়ানোর শাস্তি কমানো হয়নি। একই সঙ্গে বিনা পরোয়ানায় তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারসহ তদন্তের ক্ষমতা নিয়ে খসড়ায় আগের উদ্বেগগুলোও দূর করা হয়নি। সম্পাদক পরিষদের ১২ দফা সুপারিশ সরকারের প্রস্তাবিত সংশোধনীর চেয়ে অনেক বিস্তৃত।

গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত আগের খসড়ায় গুজবের সংজ্ঞায় বলা হয়েছিল, কোনো অসমর্থিত বা অযাচাইকৃত তথ্য, সংবাদ বা দাবি, যা জনমনে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক, উত্তেজনা বা সামাজিত অস্থিরতা সৃষ্টি করে বা করার আশঙ্কা রাখে, সেটিকে গুজব হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

সংশোধিত প্রস্তাবে বলা হয়েছে, কোনো তথ্য গুজব হিসেবে গণ্য হতে হলে সেটি মিথ্যা হতে হবে।

তবে কর্মকর্তাদের দেওয়া সংশোধনীর তথ্য থেকে বোঝা যায়, ‘গুজব’ ও ‘ভুল তথ্য’ ছড়ানোর শাস্তি আগের মতোই থাকছে। এ অপরাধে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড, ৪০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান কমানোর কোনো ইঙ্গিত নেই।

দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মানহানির সংজ্ঞা নির্ধারণ ও শাস্তির বিধান রাখারও পরিকল্পনা করছে সরকার। প্রচলিত দণ্ডবিধিতে মানহানির অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছরের সাধারণ কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

আগের খসড়ায় এ অপরাধে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, ২০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছিল।

সংশোধনীর মাধ্যমে মানহানি, হেয় প্রতিপন্ন করা ও হয়রানির বিষয়গুলোকে যৌন ব্ল্যাকমেইলিং এবং ২৫ ধারায় উল্লেখ করা যৌন নিপীড়নের অন্যান্য অপরাধ থেকে আলাদা করা হবে।

সংশোধিত খসড়ায় সংবাদ প্রকাশের কারণে সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের মালিকদের গ্রেপ্তার করতে হলে উপযুক্ত আদালতের অনুমোদন নেওয়ার বিধান রাখা হচ্ছে। কোনো সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগে প্রতিষ্ঠানটিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিতে হবে এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে।

অনলাইনে কোনো কনটেন্ট বা বিষয়বস্তু অপসারণ বা ব্লক করে দেওয়ার ক্ষেত্রেও নতুন বিধান রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে তিন দিনের মধ্যে ব্লক করার কারণ জানাতে হবে। ব্লক করা কনটেন্ট প্রকাশের অনুমতি চেয়ে আবেদন করা হলে তা ১৫ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে।

এছাড়া রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকর, এমন কনটেন্ট অনলাইনে ব্লক করে দেওয়ার সুযোগ রাখা আগের বিধানটি বাদ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। কনটেন্ট ব্লকের আবেদন করার ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের বিষয়ে ৮(২) ধারায় থাকা ‘অন্য কোনো সংস্থা’ কথাটিও বাদ দেওয়া হবে।

বর্তমান আইনে কোনো কনটেন্ট ব্লক করার তিন দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনালের অনুমোদন নিতে হয়। অনুমোদন না পেলে বা ট্রাইব্যুনাল তা প্রত্যাখ্যান করলে কনটেন্টটি আবার প্রকাশের সুযোগ দিতে হয়।

তবে সাংবাদিকদের জন্য প্রস্তাবিত সুরক্ষা সাধারণ নাগরিকদের ক্ষেত্রে না রাখায় সমালোচনা হচ্ছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের মালিকদের কিছু ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও প্রশ্ন হলো, একই সুরক্ষা অন্য সবার জন্য রাখা হবে না কেন? একই আইন কি অন্য সব নাগরিকের প্রতি বৈষম্য করবে?

তিনি বলেন, ‘এ ধরনের বিভাজন তৈরি করে এক পক্ষকে অন্য পক্ষের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর নীতি সংবাদমাধ্যমের পেশাজীবীদের নিজেদেরও আদর্শগতভাবে মেনে নেওয়া উচিত নয়।’

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী প্রিয়া আহসান চৌধুরী বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সাংবাদিক ও সাধারণ নাগরিক, সবার জন্য সমানভাবে সুরক্ষিত হওয়া উচিত। শুধু একটি শ্রেণির জন্য আলাদা সুরক্ষার ব্যবস্থা রাখার সাংবিধানিক ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

কোন ধরনের ‘ব্যবস্থা’ নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে বা প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ দিতে হবে, সে বিষয়েও স্পষ্ট ব্যাখ্যা চেয়েছেন তিনি।

আগের খসড়ার ২৯ ধারার কথা উল্লেখ করে প্রিয়া আহসান বলেন, ওই ধারায় কোনো প্রতিষ্ঠান দোষী সাব্যস্ত হলে আদালত তার নিবন্ধন বা লাইসেন্স স্থগিত, বাতিল কিংবা কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে পারবে বলে প্রস্তাব করা হয়েছিল। কোনো ব্যক্তির অপরাধের কারণে একটি প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বা লাইসেন্স বাতিল করা অসামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশেষ করে অপরাধের সংজ্ঞা যখন বিস্তৃতভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, তখন এ ধরনের বিধান আরও উদ্বেগজনক।

সম্পাদক পরিষদের ১২ দফা সুপারিশে সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার, তল্লাশি, জব্দ, নজরদারি এবং তাদের ব্যবহৃত যন্ত্রপাতিতে হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে আদালতের অনুমোদন নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। 

এছাড়া সংবাদসূত্রের গোপনীয়তা রক্ষা, জনস্বার্থে সংবাদ প্রকাশের সুরক্ষা, কোনো ব্যক্তির প্রতিবেদনের জন্য পুরো সংবাদমাধ্যমকে শাস্তি না দেওয়া এবং মানহানির অভিযোগ প্রেস কাউন্সিলের মাধ্যমে নিষ্পত্তির সুপারিশ রয়েছে।

প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ বলেন, আগাম নোটিশ দেওয়া এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তির প্রস্তাবের মাধ্যমে সরকার কিছু উদ্বেগের বিষয়ে সাড়া দিয়েছে।

তবে তিনি বলেন, ‘নতুন খসড়ায় ৩৩, ৩৪ ও ৩৫ ধারার বিষয়গুলোও সমাধান করা উচিত ছিল। এসব ধারায় বিশেষভাবে তদন্তের ক্ষমতা, তল্লাশি, জব্দ এবং বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তারের বিধান রয়েছে।’

মানহানির বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী প্রিয়া আহসান বলেন, এ অপরাধের সংজ্ঞা নতুন করে নির্ধারণের প্রয়োজন নেই। ঔপনিবেশিক আমল থেকে চলে আসা প্রচলিত ফৌজদারি মানহানির বিধানেরও অপব্যবহার হয়েছে। কারও সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার ঘটনায় কারাদণ্ড দেওয়া অসামঞ্জস্যপূর্ণ শাস্তি।

আইসিটি আইনের ৫৭ ধারাসহ সাইবার নিরাপত্তা আইনের আগের আইনগুলোতে অস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত বক্তব্যের অপব্যবহারের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি গুজব ছড়ানোকে অপরাধ হিসেবে রাখারও সমালোচনা করেন।

তবে সাইবার আইনের কিছু অপরাধের বিচার ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে করার সুযোগ বাদ দেওয়ার প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছেন তিনি।

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিষয়টি শুধু মানহানির সংজ্ঞা কী হবে, তা নিয়ে নয়। মানহানি, ভুয়া খবর ও অপতথ্য নিয়ন্ত্রণে আদৌ সাইবার নিরাপত্তা আইন বা ফৌজদারি আইন ব্যবহার করা উচিত কি না, সেটাই মূল প্রশ্ন। এ ধরনের উদ্যোগ যথাযথও নয়, কার্যকরও নয় বলে মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘সাইবার নিরাপত্তা আইনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সাইবার অবকাঠামো, তথ্যের অখণ্ডতা ও অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। হ্যাকিং বা ডিজিটাল জালিয়াতি প্রতিরোধের মতো বিষয় এ আইনের আওতায় আসতে পারে। কিন্তু তথ্য, বক্তব্য বা কারও সুনাম নিয়ন্ত্রণ করা এ আইনের কাজ নয়।’

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কারও সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়া, অপতথ্য ও ভুয়া খবরের মতো বিষয় মোকাবিলায় দেওয়ানি আদালতের আশ্রয় নেওয়াই বেশি উপযুক্ত। পুলিশ ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জবাবদিহিহীন প্রয়োগের মাধ্যমে এ আইন ব্যবহার করে মানুষের বাক্‌স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ করা উচিত নয়।

RELATED ARTICLES

Most Popular