‘আমার হয়তো পড়াটা হতো না। অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে উঠে আমার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কেবল আমার মায়ের কারণে আমি আবার পড়ার সিদ্ধান্ত নেই। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই।’
কথাগুলো বলছিলেন তানিশা ইয়াসমিন চৈতি। তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমার মা এভাবে বলেছিল, “মনা, একটা কথা বলব, রাখবি? লোকে যা খুশি বলুক, লেখাপড়াটা ছাড়বি না। তুই তোর পড়াটা শেষ করবি। শেষ হলে সার্টিফিকেট আমার হাতে এনে দিবি।” নিয়মিত জিজ্ঞাসা করতো, তোর পড়াশোনার কী অবস্থা? কবে শেষ হবে? মা বলতেন, মানুষ যদি সম্মান-শ্রদ্ধা করে, সেটা শিক্ষিত হলেই করবে।’
‘ছোটবেলা থেকেই আমার লেখাপড়া করার ইচ্ছা ছিল, আমি কেবল পড়তে চেয়েছিলাম। রাজবাড়ী সরকারি কলেজে ম্যানেজমেন্টে ভর্তি হলাম। অনার্স ফার্স্ট ইয়ার শেষ হলো, তারপর ড্রপ আউট…,’ বলেন তিনি।
শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার আগেই নানা বাধা পেরিয়ে চৈতি হয়ে ওঠেন সফল উদ্যোক্তা। ২০২০ সালে জন্মভিটায় গড়ে তোলেন নিজের প্রতিষ্ঠান ‘উত্তরণ বিউটি পার্লার’। নিজে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জন্য হয়ে ওঠেন উদাহরণ।
নব্বইয়ের দশকে রাজবাড়ী জেলার শহরতলীতে একটি মফস্বল এলাকায় কৃষক পরিবারে তার জন্ম ও বেড়া ওঠা। দুই বোনের মধ্যে চৈতি ছোট।
বড় বোন নিজের সংসারে ব্যস্ত। তার বাবাও এখন আর কৃষি কাজ করতে পারেন না। সংসারের হাল ধরেছেন চৈতি। বিউটি পার্লার প্রতিষ্ঠায় তিনি মহিলা অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রশিক্ষণ নেন। নিজেকে বিউটিশিয়ান হিসেবে গড়ে তুলতে ভারতেও গেছেন প্রশিক্ষণ নিতে। তার প্রতিষ্ঠানে এখন তৃতীয় লিঙ্গের আরও তিনজন মানুষ কাজ করেন।
‘ছোট শহর, এর চেয়ে বেশি মানুষকে কাজ দেওয়ার সুযোগ আমার নেই। আমার বাবা-মায়ের বয়স হয়ে গেছে, তারা আমার ওপর নির্ভরশীল। এখান থেকে যা আয় হয়, তা দিয়ে আমার ও আমার সহকর্মীদের সংসার চলে যায়। উদ্বৃত্ত কিছু থাকে না, খেয়ে-পরে চলতে পারি।’
চৈতি জানান, বিয়ের মৌসুম ও ঈদ, পূজা, পহেলা বৈশাখের মতো উৎসবের সময় তার আয় হয় বেশি। কোনো কোনো সময় ৩০ হাজারের বেশি আয় হয়।
পুরুষ শরীরে জন্ম নিলেও চৈতি অল্প বয়সেই তার মানসিক পরিবর্তন বুঝতে পারেন। শৈশবের স্মৃতি হাতড়ে তিনি বলেন, ‘আমি তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি।’
‘আমার সৌভাগ্য, পরিবার সব সময় আমার পাশে ছিল,’ দ্য ডেইলি স্টারকে বলছিলেন চৈতি।
গত পাঁচ বছরের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সাইনবোর্ড দেখে অনেকেই আসে। এক মিনিট কথা বলার পরে অনেক কাস্টমার চলে যায়। অনেকেই নাক সিটকায়। যারা আমাকে চেনেন না, তাদের ক্ষেত্রে এটা বেশি হয়।’
‘যারা নিয়মিত আসেন, পার্লার বন্ধ থাকলে তারা অপেক্ষা করেন। হয়তো এক সপ্তাহ পার্লার বন্ধ থাকবে, তারা এক সপ্তাহ অপেক্ষা করবেন। তাদের মাধ্যম দিয়েও আমি অনেক গ্রাহক পাই,’ যোগ করেন তিনি।
কটূ কথার ভয়ে এক সময় পরিবার থেকে দূরে গিয়ে চৈতি আশ্রয় নিয়েছিলেন হিজড়া কমিউনিটির এক গুরু মায়ের বাড়িতে। তিনি বলেন, ‘আমার পথচলায় এই কমিউনিটির মানুষের সমর্থন ছিল অনেক। তারা যেমন পড়ালেখায় উৎসাহ দিয়েছে, পাশাপাশি সমাজের মূল স্রোতে মিশতে, সম্মানজনক পেশা বেছে নিতে বারবার তাগিদ দিয়েছে। আমাদের বলা হতো, যাদের যোগ্যতা আছে, সবার উচিত সম্মানজনক পেশায় চলে যাওয়ার চেষ্টা করা।’
‘চাকরির চেষ্টা যে করিনি—এমন না। কিন্তু তৃতীয় লিঙ্গের যে কারও জীবনের প্রতিবন্ধকতাগুলো একই রকম থেকে গেছে, খুব একটা পরিবর্তন হয়নি।’
সরকারি চাকরির চেষ্টা নিয়ে নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানান চৈতি।
সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া ও বৈষম্যের শিকার এই জনগোষ্ঠীর কল্যাণে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ২০১৫ সালে কোটা ভিত্তিতে নিম্ন-পর্যায়ের ১৪টি পদে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের নিয়োগের পরিকল্পনা করেছিল সরকারের সমাজসেবা অধিদপ্তর।
সে সময় চাকরির জন্য নির্বাচিতদের মধ্যে ১২ জনকে ‘পূর্ণাঙ্গ পুরুষ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। চৈতি ছিলেন নির্বাচিতদের একজন।
হিজড়া সম্প্রদায়ের মানুষ মনে করে, তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি শনাক্তকরণের সেই প্রক্রিয়াটি ছিল হয়রানিমূলক। চৈতি অভিযোগ করেন, ‘সমাজ সেবা অধিদপ্তরে আবেদন করি। আমাদের মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাকে। যখন আমাদের অফার লেটার দেওয়া হবে, তার ঠিক এক সপ্তাহ আগে বলা হলো আমরা হিজড়া কি না পরীক্ষা করা হবে।’
‘আমাকে পাবলিক প্লেসে পরীক্ষা করেছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একজন পিয়ন। অথচ একজন চিকিৎসক চেম্বারে আমাকে পরীক্ষা করতে পারতেন। আমি মানসিকভাবে নারী কি না সেটা বোঝার জন্য একজন মনোবিজ্ঞানী বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞ থাকতে পারতো,’ বলেন তিনি।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত হওয়ার পর কমিউনিটি লিডাররা তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
চাকরিটা যখন হলো না, তখন সিদ্ধান্ত নেই, আমি উদ্যোক্তা হবো। নিজে স্বাবলম্বী হবো, পাশাপাশি আমার কমিউনিটির মানুষদের এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করব। তখন ভাবতে থাকি, কী করা যায়? আসলে সৃষ্টিকর্তা কোনো মানুষের এক দিকে কমতি রাখলে অন্য এক দিক বাড়িয়ে দেন।
‘আইব্রো প্লাক, হেয়ার ড্রেসিং, নেইল পেইন্টিং, মেহেদী পড়ানোতে ছোটবেলা থেকেই আমার যেমন আগ্রহ ছিল, পাশাপাশি কিছুটা দক্ষতাও ছিল। অভাব ছিল কেবল সুযোগ আর প্রশিক্ষণের। অনেকে পরামর্শ দিয়েছেন, পথ দেখিয়েছেন। আবার অনেকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন। অনেকে যেমন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন, অনেক মানুষ ভালোবেসেছেন। এই মানুষগুলো না থাকলে আমি টিকে থাকতে পারতাম না,’ বলেন চৈতি।
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি) থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করায় গত ২৮ অক্টোবর বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে চৈতির হাতে বিশেষ সম্মাননা তুলে দেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
চৈতি ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে বাউবির এমএসএস প্রোগ্রামে ভর্তি হয়েছিলেন।
গ্রেড পয়েন্ট ৪.০০ এর মধ্যে সিজিপিএ ৩.৩০ পেয়ে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি) থেকে প্রথম তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থী হিসেবে তিনি এই সাফল্য অর্জন করেন।
