Homeস্পোর্টসঔপনিবেশিক সম্পর্ক ও ফুটবলের রোমাঞ্চ নিয়ে মুখোমুখি ফ্রান্স-মরক্কো

ঔপনিবেশিক সম্পর্ক ও ফুটবলের রোমাঞ্চ নিয়ে মুখোমুখি ফ্রান্স-মরক্কো

মরক্কোর অধিনায়ক আশরাফ হাকিমি প্যারিসের বাসিন্দা। প্যারিস সেন্ট জার্মেইর (পিএসজি) রক্ষণভাগের অন্যতম ভরসা তিনি। স্পেনে জন্মানো হাকিমি প্যারিসে বাস করলেও খেলেন শেকড়ের দেশ মরক্কোর হয়ে। মরক্কো দলে আছেন ফ্রান্সে জন্মানো একাধিক ফুটবলার, মিডফিল্ডার আইয়ুব বুয়াদ্দি যেমন খেলতেন ফ্রান্সের বয়সভিত্তিক দলেও।  এক সময় মরক্কো ছিল ফ্রান্সের অধীনে। এই ম্যাচের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জড়িয়ে রয়েছে দুই দেশের উত্তর-ঔপনিবেশিক সম্পর্ক—এখনো দুই রাষ্ট্র নানাবিধ সম্পর্কে জড়িত। এমন বাস্তবতার মাঝে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছেন কিলিয়ান এমবাপে ও আশরাফ হাকিমিরা।

বোস্টনে বাংলাদেশ সময় দিবাগত রাত ২টায় সেমিফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে নামবে তারা। এটি এমন দুটি দেশের মধ্যকার সাক্ষাৎ যাদের ইতিহাস অবিচ্ছেদ্য, কিন্তু যাদের ফুটবলার এবং সমর্থকেরা প্রায়শই অভিবাসন, ভাষা, পরিবার এবং বন্ধুত্বের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত।

১৯১২ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত মরক্কো ফরাসি সুরক্ষিত রাষ্ট্র (প্রটেক্টরেট) ছিল। শিক্ষা, ব্যবসা ও অভিবাসনের মাধ্যমে দেশ দুটি একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত রয়েছে এবং ফুটবল এই সম্পর্কের অন্যতম স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ হয়ে উঠেছে।

মরক্কো দলের ছয়জন সদস্য ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করেছেন, আরও কয়েকজন ফরাসি শীর্ষ লিগে খেলেন। মরক্কোর প্রতিনিধিত্ব করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তারা অনেকেই খেলেছেন ফ্রান্সের বয়সভিত্তিক ফুটবল ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে।

তরুণ আইয়ুব বুয়াদ্দি এই ওভারল্যাপিং সম্পর্কের অন্যতম স্পষ্ট উদাহরণ। ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া এবং লিলেতে বেড়ে ওঠা বুয়াদ্দি মরক্কোকে বেছে নেওয়ার আগে ফ্রান্সের বয়সভিত্তিক দলে খেলেছেন। তিনি এমন এক দ্বৈত ফুটবলীয় পরিচয়ের প্রতীক, যা এই ম্যাচটিকে একটি বিশেষ তাৎপর্য দেয়।

দুইবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স ফুটবলের অন্যতম প্রতিষ্ঠিত পরাশক্তি। আরেকটি বিশ্বকাপের খোঁজে থাকা একটি দলের কাছ থেকে যেমন টুর্নামেন্টের অভিজ্ঞতা এবং আক্রমণভাগের প্রতিভা আশা করা হয়, তাদের সেটি রয়েছে। অন্যদিকে, মরক্কো এসেছে এমন একটি দলের আত্মবিশ্বাস নিয়ে, যারা হিসেব-নিকেশ বদলে দিতে অভ্যস্ত। চার বছর আগে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালেও খেলেছে তারা।

২০২২ সালেও নকআউটে মুখোমুখি হয়েছিল তারা। সেবার মরক্কোকে ২-০ গোলে হারিয়ে ফাইনাল নিশ্চিত করে ফ্রান্স।

পুনরায় মুখোমুখি হওয়ার এই লড়াইয়ের জন্য বোস্টন এক কৌতূহলোদ্দীপক পরিবেশ তৈরি করেছে। ফরাসি শহরগুলোর তুলনায় এখানে মরক্কোর সম্প্রদায় আকারে ছোট এবং কম দৃশ্যমান। তবে বৃহত্তর মেট্রোপলিটন এলাকায় তারা সুপ্রতিষ্ঠিত, যেখানে মরক্কো বংশোদ্ভূত বাসিন্দারা পরিবার, শিক্ষার্থী, চাকুরিজীবী ও ব্যবসায়ীদের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করেছেন।

সেই সমর্থকদের জন্য এই কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচটি কেবল একটি ঘরকে দুই ভাগে ভাগ করে দেবে না।

৫৭ বছর বয়সী ট্যাক্সি চালক মোহাম্মদ সাদি বলেন, ‘কেউ কেউ একই ভবনে বাস করেন। ফরাসি এবং মরক্কোবাসীরা একসঙ্গে খেলা দেখবেন এবং শেষে একে অপরের সঙ্গে করমর্দন করবেন।’

‘এখানে কোনো উত্তেজনা নেই। ফুটবল একটি পারিবারিক বিষয় এবং ফ্রান্স বনাম মরক্কো ম্যাচটিও এর ব্যতিক্রম হবে না। বরং এর উল্টোটিই হবে।’

বৃহস্পতিবারের ম্যাচের আগে বোস্টন কমনে এক শান্তিপূর্ণ সমাবেশে ১,০০০-এর বেশি ভক্ত সমবেত হয়ে ‘দিমা ল-মাগরিব’ (সবসময় মরক্কো) গেয়েছেন এবং পতাকা উড়িয়েছেন।

৩৬ বছর বয়সী সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ইউসেফ বেনানি বলেন, ‘আমি ফিনল্যান্ড থেকে এসেছি।’

‘আমি মরক্কোর সব ম্যাচে উপস্থিত ছিলাম এবং এখানকার পরিবেশ সবচেয়ে সেরা। আমি অনেক মরক্কোবাসীর সঙ্গে দেখা করেছি, কিছু ফরাসি মানুষের সঙ্গেও দেখা হয়েছে। আগামীকাল এখানে একটি বড় উৎসব হতে যাচ্ছে।’

মরক্কোর এই অগ্রগতি ম্যাচের ধরন বদলে দিয়েছে। তারা এখন আর কেবল ২০২২ সালের সেই চমকপ্রদ ‘আন্ডারডগ’ দল নয়; বরং এমন এক দল যাদের সুশৃঙ্খল পরিকল্পনা, খেলোয়াড় তৈরি করার ব্যবস্থা এবং ফুটবলের ঐতিহ্যবাহী পরাশক্তিদের চ্যালেঞ্জ করার মতো আত্মবিশ্বাস রয়েছে।

 

RELATED ARTICLES

Most Popular