রাজধানীর মিরপুরের কালশীতে সড়কের পাশে বসেছিলেন ৬৫ বছর বয়সী মো. শাহাবুদ্দিন। সামনে সাজানো কচু, কলমি লতা ও সেঁচি শাক। ক্রেতা পথচারীরা। দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত এভাবেই চলে তার বেচাকেনা।
গত ৩১ অক্টোবর কথা হয় শাহাবুদ্দিনের সঙ্গে। বলেন, ‘২০ বছর ধরে পল্লবীর একটি কারখানায় কাজ করেছি। দুই বছর আগে চাকরি চলে যায়। এরপর আর কোথাও চাকরি পাইনি। বয়স বেশি হওয়ায় কেউ নিতে চায় না।’
৬০ বছর বয়সী স্ত্রী আয়েশা বেগমকে নিয়ে পল্লী থানার পাশে বাউনিয়া বাঁধ এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন শাহবুদ্দিন। তার দুই ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। বিয়ে করে আলাদা হয়ে গেছে বড় ছেলেও। তাদের সঙ্গে থাকে শুধু ছোট ছেলেটা।
শাহাবুদ্দিন জানান, তার বড় ছেলে ময়লার গাড়িতে কাজ করেন দৈনিক ৩০০ টাকা মজুরিতে। এ আয় দিয়ে কোনোমতে তার সংসার চলে। তাই বাবা-মায়ের সংসারে আর কিছু দিতে পারেন না তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমার বাড়ি-ঘর নেই। কাজ না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। স্ত্রী ও ছোট ছেলেকে কী খাওয়াব, তা নিয়ে চিন্তায় ছিলাম। একদিন ক্যান্টনমেন্টের বালুঘাটে সরকারি জমিতে অনেক কচু, কলমি লতা ও সেঁচি শাক দেখতে পাই। প্রথমে সেখান থেকে শাক এনে নিজেরা খেতাম। পরে মনে হলো, এগুলো তো বিক্রিও করতে পারি!’
‘প্রতিদিন সকাল ৬টায় বৌকে নিয়ে ঘর থেকে বের হই। প্রায় এক কিলোমিটার হেঁটে বালুঘাট যাই। সেখান থেকে শাক নিয়ে বাসায় ফিরি। পরে দুপুরে দুজন মিলে শাক বিক্রি করতে বের হই। আমার বৌ মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় শাক বিক্রি করে। প্রতি মুঠো শাক ১০ টাকা। কখনো সন্ধ্যায়, আবার কখনো অনেক রাত হয়ে যায় শাক শেষ হতে। দুজন মিলে কোনোদিন ৬০০ টাকা, কোনোদিন আবার তারচেয়ে বেশিও আয় হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাসাভাড়া দিতে হয় সাড়ে ৪ হাজার টাকা। এরপর যা থাকে, তা দিয়ে তিনজনের সংসার চলে। বালুঘাটে শাক না পেলে বিরুলিয়া বা টঙ্গী যাই। সেখান থেকে শাক আনি।’
শাহাবুদ্দিন বলেন, ‘জীবন থেকে আমার আর কিছু চাওয়ার নেই। কারও সাহায্য ছাড়াই নিজের চেষ্টায় চলছি। বয়স হয়েছে, শরীরও আগের মতো চলে না। তবু বসে থাকতে চাই না। যতদিন বেঁচে আছি, কাজ করে স্ত্রী-সন্তানদের মুখে দুটো ভাত তুলে দিতে চাই। কারও কাছে হাত পাততে চাই না। নিজের পরিশ্রমের টাকায় সংসার চালাতে পারলেই আমি খুশি।’
