মাথায় শীতকালীন সবজির ঝাঁকা। সামনে বুকসমান পানি। উপায় না পেয়ে সেই পানির মধ্য দিয়েই নদী পার হচ্ছিলেন শুকতারা বেগম (৪২)। একটু অসতর্ক হলেই পড়ে যেতে পারেন পানিতে। তবু থেমে থাকার সুযোগ নেই। জীবিকার তাগিদে তাকে ওপারে যেতেই হবে।
শুধু শুকতারা বেগম নন, প্রতিদিন এমন ঝুঁকি নিয়েই নদী পার হচ্ছেন দুই পাড়ের কয়েক হাজার মানুষ। কারও হাতে বাজারের ব্যাগ, কারও কাঁধে কৃষিপণ্য। কেউ যাচ্ছেন কর্মস্থলে, কেউবা সন্তানকে নিয়ে স্কুলে।
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের কিশামত শিমুলবাড়ী এলাকায় বয়ে চলেছে বারোমাসিয়া নদী। এর ওপর নির্মিত বাঁশের সাঁকোটি ভেঙে যাওয়ায় এ দুর্ভোগ তৈরি হয়েছে।
প্রায় ৩০০ ফুট দীর্ঘ সাঁকোটির ৫০ ফুটের বেশি অংশ ভেঙে পড়েছে। এক মাস ধরে এ অবস্থা চললেও মেরামতের কোনো উদ্যোগ নেই। ফলে কেউ বুকসমান পানি মাড়িয়ে, কেউ সাঁতরে, আবার কেউ ভাঙা বাঁশের কাঠামো ধরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হচ্ছেন।
সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে শিশু ও শিক্ষার্থীরা। প্রতিদিন স্কুল-কলেজে যাতায়াত করতে তাদের এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। কেউ পানিতে নেমে, কেউবা ভাঙা বাঁশ ধরে পার হওয়ার চেষ্টা করছে। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকছে প্রতিনিয়ত।
নারী ও বয়স্কদের ভোগান্তিও কম নয়। কারণ নদী পারাপারে এই সাঁকো ছাড়া তাদের আর কোনো বিকল্প পথ নেই।
স্থানীয়রা জানান, সাঁকোটির দক্ষিণ পাশের মাঝামাঝি প্রায় ৫০ ফুট অংশ ভেঙে পড়েছে। কোথাও বাঁশের পাটাতন নেই, কোথাও ভাঙা কাঠামো ঝুলে আছে। ফলে স্বাভাবিকভাবে হেঁটে পার হওয়ার সুযোগ নেই। কেউ পানিতে নেমে হাঁটছেন, কেউ সাঁতরে ওপারে যাচ্ছেন। আবার কেউ ভাঙা অংশ ধরে সাবধানে পার হওয়ার চেষ্টা করছেন।
তাদের ভাষ্য, প্রায় চার দশক আগে নদী পারাপারে ডিঙি ও মাঝারি আকারের নৌকাই ছিল একমাত্র ভরসা। পরে নদীর প্রশস্ততা কমে এলে স্থানীয় উদ্যোগে বাঁশের সাঁকো নির্মাণ করা হয়। প্রায় দেড় যুগ ধরে এটিই দুই পাড়ের মানুষের চলাচলের একমাত্র অবলম্বন।
প্রতিবছর বর্ষার আগে স্থানীয়ভাবে সাঁকোটি মেরামত করা হতো। তবে চলতি বছর আর্থিক সংকটের কারণে তা করা হয়নি। ফলে দুর্বল হয়ে পড়া সাঁকোটির বিভিন্ন অংশ প্রায় এক মাস আগে ভেঙে যায়।
এতে ফুলবাড়ী উপজেলার নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের কিশামত শিমুলবাড়ী, চরগোরকমন্ডল, ঝাউকুটি, পশ্চিম ফুলমতি, নাওডাঙ্গা, শিমুলবাড়ী ও হকবাজার এবং লালমনিরহাট সদর উপজেলার কুলাঘাট ইউনিয়নের চরখারুয়া ও খারুয়া গ্রামের মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন।
ক্ষোভ প্রকাশ করে ঝাউকুটি গ্রামের শুকতারা বেগম বলেন, প্রায় এক মাস ধরে তারা কষ্ট করে নদী পার হচ্ছেন। কিন্তু তাদের খোঁজ নিতে কেউ আসেননি। ছেলেমেয়েদেরও অনেক কষ্ট করে স্কুলে যেতে হচ্ছে। দ্রুত সাঁকোটি মেরামত করা দরকার। গ্রামের অধিকাংশ মানুষের আর্থিক সামর্থ্য নেই। সরকারের সহযোগিতা ছাড়া এটি সংস্কার করা সম্ভব নয়।
পশ্চিম ফুলমতি গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, এ পথ দিয়ে প্রতিদিন এলাকার মানুষ নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের বালারহাট বাজারে যাতায়াত করেন। দুই শতাধিক শিক্ষার্থী নাওডাঙ্গা স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বালারহাট আদর্শ স্কুল, বিভিন্ন মাদ্রাসা ও ফুলবাড়ী কলেজে পড়াশোনা করে। সাঁকোটি ভেঙে যাওয়ায় তাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হতে হচ্ছে। এতে পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে।
নজরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিবছর বর্ষার আগে আমরা সাঁকোটি মেরামত করতাম। কিন্তু এ বছর আর্থিক সংকটের কারণে তা করা হয়নি। এ কারণে সাঁকোটির বিভিন্ন জায়গা ভেঙে গেছে।’
নাওডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাছেন আলী বলেন, দুই পাড়ের মানুষের চলাচলের একমাত্র ভরসা এই সাঁকো। এটি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে মানুষ চরম দুর্ভোগে রয়েছেন। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হতে হচ্ছে। দ্রুত সাঁকোটি মেরামত অথবা টেকসই নতুন সাঁকো নির্মাণ করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘সাঁকোটি পুনর্নির্মাণের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানো হয়েছে। এটি নির্মাণ করা হলে দুই পাড়ের মানুষের দুর্ভোগ কমবে।’
ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাহিদ হাসান বলেন, স্থানীয়দের দুর্ভোগের বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে। সেখানে দ্রুত একটি টেকসই বাঁশের সাঁকো নির্মাণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া বারোমাসিয়া নদীর ওপর কংক্রিটের সেতু নির্মাণ করা সম্ভব কি না, তা যাচাই করা হবে।
