দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে সাফল্যের সংজ্ঞা কি এখনো সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপাতেই সীমাবদ্ধ? এই অঞ্চলের দেশগুলোর ফুটবল পরিকল্পনায় কি আঞ্চলিক শ্রেষ্ঠত্বের বাইরে আরও বড় কোনো লক্ষ্য জায়গা পাচ্ছে?
ভারত, শ্রীলঙ্কা ও ভুটানসহ প্রতিবেশীদের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনায় দেখা যাচ্ছে, সাফের বাইরেও আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চিন্তা করছে তারা। বিপরীতে বাংলাদেশের ফুটবলে এখনো বড় প্রত্যাশার জায়গাজুড়ে রয়েছে সাফ জয়, যে প্রতিযোগিতাটি দক্ষিণ এশিয়ার বিশ্বকাপ হিসেবে এখনও পরিচিত হলেও কালের পরিক্রমায় জৌলুস হারিয়েছে।
২০০৩ সালের পর ঘরের মাঠে দ্বিতীয়বারের মতো সাফের শিরোপা জয়ের আকাঙ্ক্ষা অবশ্যই যৌক্তিক, কিন্তু সেই স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্য পূরণের তাড়নায় দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের প্রশ্নগুলো আড়ালে থেকে যাচ্ছে কি না, সেটিই এখন ভাবনার বিষয়।
গত সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত ফিফা আসিয়ান কাপে বাংলাদেশের কোচ টমাস ডুলির বক্তব্যে এই সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন পাওয়া যায়। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়ার মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেলতে গিয়েও তার মূল লক্ষ্য ছিল বৃহস্পতিবার মাঠে গড়ানো সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য প্রস্তুত হওয়া।
ফিফার আমন্ত্রণ পেয়ে খেলতে যাওয়া আসিয়ান কাপের প্রতিপক্ষদের মান বাংলাদেশের চেয়ে অনেক উঁচু— এই বাস্তবতা মেনে নিয়েই ডুলি বলেছিলেন, এই টুর্নামেন্টে করা ভুল থেকে শেখা এবং নিজেদের বর্তমান অবস্থান বোঝাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেলার সুযোগকেও বাংলাদেশ দেখছে মূলত সাফের প্রস্তুতি হিসেবে।
অথচ একই সময়ে ভারতের সিদ্ধান্ত ছিল ভিন্ন। আসিয়ান কাপে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েও তারা সরে দাঁড়ায় পানামা, ব্রাজিল ও উরুগুয়ের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক প্রীতি খেলার জন্য। ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলা পানামার সঙ্গে ১-১ গোলে ড্রয়ের পর ব্রাজিলের কাছে ৪-০ ও উরুগুয়ের কাছে ৬-১ গোলের বড় ব্যবধানে হারলেও ভারতের কাছে এই ম্যাচগুলোর গুরুত্ব ছিল অন্য জায়গায়। তাদের কোচ খালিদ জামিল সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল ও উরুগুয়ের বিপক্ষে খেলাকে দেশটির ফুটবলের জন্য সম্ভাব্য মোড় পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবে দেখেছেন।
ভারতের এই অগ্রাধিকার শুধু ওই তিনটি ম্যাচেই সীমাবদ্ধ নয়। এবারের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপেও তারা প্রথম পছন্দের জাতীয় দল পাঠায়নি। বরং জাতীয় দলের বাইরে থাকা খেলোয়াড় ও উদীয়মানদের নিয়ে দল সাজিয়েছে। অন্যদিকে, জাতীয় দলের মূল খেলোয়াড়দের নিয়ে আসন্ন ফিফা উইন্ডোতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ খেলবে তারা।
এখানে ভারতের এমন সিদ্ধান্তের তাৎপর্য শুধু এই নয় যে, তারা নয়বারের সাফ চ্যাম্পিয়ন এবং আঞ্চলিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য নতুন করে কিছু দেখানোর প্রয়োজন কম। বরং তারা সাফকে তরুণ ও জাতীয় দলের বাইরে থাকা খেলোয়াড়দের সুযোগ দেওয়ার মঞ্চ হিসেবেও ব্যবহার করছে। এটা তাদের জন্য নতুন কিছু নয় অবশ্য। এর আগে ২০০৯ ও ২০১৮ সালের সাফে একই কৌশল নিয়েছিল তারা। প্রথমবার চ্যাম্পিয়ন ও দ্বিতীয়বার রানার্সআপ হয়েছিল দলটি।
তবে এই প্রবণতা শুধু বাংলাদেশের চেয়ে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ৪২ ধাপ এগিয়ে থাকা ভারতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। র্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে থাকা শ্রীলঙ্কা ও ভুটানের উদাহরণও উল্লেখযোগ্য।
শ্রীলঙ্কার কোচ আবদুল্লাহ আল মুতাইরি গতকাল সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, সাফ জিতলে চুক্তি অনুযায়ী বড় অঙ্কের বোনাস পাওয়ার সুযোগ রয়েছে তার। তবে তার প্রধান লক্ষ্য লঙ্কানদের প্রথমবারের মতো আগামী ২০৩২ সালের এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্বে নিয়ে যাওয়া। চার বছরের চুক্তিতে তার পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু এশিয়ান কাপ। তার দাবি, শ্রীলঙ্কা আসিয়ান কাপে খেলার আমন্ত্রণও পেয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ও প্রস্তুতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সেই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়নি তারা।
সংবাদ সম্মেলনে ভুটানও একই ধরনের চিন্তার কথা বলছে। তাদের কোচ গ্যারি মাইকেল ফিলিপসের বক্তব্যেও সেটি স্পষ্ট। তার মতে, সাফ কোনো এএফসি বা বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের টুর্নামেন্ট নয়। বরং এটি আঞ্চলিক দেশগুলোর একে অপরের বিপক্ষে খেলার একটি সুযোগ। প্রতিযোগিতাটি নিয়ে তারা রোমাঞ্চিত হলেও ফিলিপসের কাছে এর গুরুত্ব মূলত পরবর্তী এশিয়ান কাপ ও বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের প্রস্তুতি হিসেবে। এই টুর্নামেন্টে তিনিও নতুন ও উদীয়মান খেলোয়াড়দের পরখ করে দেখতে চান। অর্থাৎ, ভুটানের মতো দলও আঞ্চলিক প্রতিযোগিতাকে শুধু শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই হিসেবে নয়, ভবিষ্যতের জন্য দল গড়ে তোলার সুযোগ হিসেবে দেখছে।
এই তিনটি দেশের এমন অবস্থান পাশাপাশি রাখলে বাংলাদেশের অগ্রাধিকারের পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়। বাংলাদেশ সাফ জিততে চায়, সেটিই এখন জাতীয় দলের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতি তাবিথ আউয়ালও বাড়তি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেছেন, ২০০৩ সালের পর এবার সাফ জয়ের ব্যাপারে তারা আশাবাদী। কারণ, দলে রয়েছে হামজা চৌধুরী-শমিত সোমসহ একঝাঁক বিদেশে বেড়ে ওঠা ফুটবলার, যারা বাংলাদেশ দলের মান ও শক্তি বাড়িয়েছেন।
কিন্তু সাফের পর বাংলাদেশের লক্ষ্য কী? এশিয়ান কাপের মূল পর্বে খেলার পরিকল্পনা আছে কি বাফুফের? আগামী চার-পাঁচ বছরে ফিফা র্যাঙ্কিং, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ও খেলোয়াড় তৈরির ক্ষেত্রে ঠিক কোথায় পৌঁছাতে চায় বাংলাদেশ?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে শুধু জাতীয় দলের ফলাফলের দিকে তাকালে চলবে না। ঘরোয়া লিগের অনিয়মিত সূচি, ক্লাবগুলোর আর্থিক ও প্রশাসনিক সংকট, খেলোয়াড়দের লম্বা সময় প্রতিযোগিতার বাইরে থাকা, মানসম্পন্ন একাডেমির অভাব, বয়সভিত্তিক ফুটবলের দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় তৈরির ধারাবাহিক প্রক্রিয়া— এসব সমস্যার সমাধান ছাড়া জাতীয় দলের উন্নতি টেকসই হওয়ার সুযোগ সীমিত।
গত সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে আসিয়ান কাপে বাংলাদেশের তিক্ত অভিজ্ঞতাও সেই বাস্তবতা সামনে এনেছে। র্যাঙ্কিং ও সামর্থ্যে এগিয়ে থাকা মালয়েশিয়ার কাছে ৩-০ ও সিঙ্গাপুরের কাছে ১-০ গোলে হারের পর ইন্দোনেশিয়ার কাছে ৯-২ গোলে বিধ্বস্ত হয় তারা। এরপর কোচ ডুলি স্বীকার করেছিলেন, দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া— দুই অঞ্চলের ফুটবলের মধ্যে শারীরিক সক্ষমতা, টেকনিক, সিদ্ধান্ত নেওয়ার গতি ও ঘরোয়া লিগের মানে বড় ব্যবধান রয়েছে। অর্থাৎ, সমস্যাটা শুধু জাতীয় দলের কৌশলে নয়, দেশের সামগ্রিক ফুটবল কাঠামোতেও।
২৩ বছর পর সাফের শিরোপা জিততে পারলে তা বাংলাদেশের ফুটবলে সাময়িক উচ্ছ্বাস ও আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে পারে। কিন্তু সেটি যেন দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যাগুলো ভুলে যাওয়ার উপলক্ষ না হয়। ভারত, শ্রীলঙ্কা ও ভুটানের সাম্প্রতিক অবস্থান অন্তত দেখাচ্ছে, আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় সাফল্যের খোঁজের পাশাপাশি আরও দূরের লক্ষ্য নির্ধারণ করা সম্ভব।
বাংলাদেশের ফুটবলেরও এখন প্রয়োজন কেবল সাফ জয়ের পরিকল্পনা নয়, বরং সাফের পর তারা কোথায় পৌঁছাতে চায়, সেটার একটি বাস্তবসম্মত দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা। তা না হলে আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজেদের দীর্ঘদিনের নাজুক অবস্থান বদলানোর আশা বাস্তবে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা নেই।
