রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের উৎপাদন শুরুর চূড়ান্ত প্রস্তুতি এবং দেশের প্রথম পারমাণবিক স্থাপনা চালুর প্রাক্কালে এর জরুরি প্রস্তুতি মূল্যায়নে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ পারমাণবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়েরা) সূত্রে জানা গেছে, মার্ক ব্রেইটিঙ্গারের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের দলটি আজ রোববার থেকে রূপপুর প্রকল্পের জরুরি প্রস্তুতি পর্যালোচনা মিশন শুরু করেছে।
১০ দিনব্যাপী এই মিশনের শুরুতে আজ আইএইএর নিরাপত্তা পর্যালোচনা দলটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং জরুরি প্রস্তুতি সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সরকারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করে।
এর আগে আজ সকালে ঢাকায় বায়েরার প্রধান কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আইএইএর এই মিশনের উদ্বোধন করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সচিব বলেন, ‘পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য জরুরি প্রস্তুতি বাধ্যতামূলক। আইএইএর নির্দেশিকা অনুযায়ী রূপপুরে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা মান নিশ্চিত করতে এবং আন্তর্জাতিক মানের জরুরি সাড়াদান ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আমরা কাজ করছি।’
তিনি বলেন, ‘আইএইএর এই মিশন আমাদের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে ভবিষ্যতে সঠিক ব্যবস্থা নিতে এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান বজায় রেখে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অপারেশন নিরাপদে পরিচালনা করতে একটি বড় সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।’
উদ্বোধনী সেশনের পর আইএইএর বিশেষজ্ঞ দলটি জরুরি প্রস্তুতি ব্যবস্থা নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করে।
সচিব বলেন, ‘জরুরি প্রস্তুতি কোনো একটি বিভাগের কাজ নয়। এর সঙ্গে বিজ্ঞান, স্বাস্থ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের মতো সরকারের বিভিন্ন বিভাগ ও সংস্থা গভীরভাবে জড়িত। যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে মানুষকে রক্ষায় আন্তর্জাতিক নির্দেশিকা অনুযায়ী একটি কার্যকর কাঠামো তৈরিতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’
বায়েরা চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আইএইএর নিরাপত্তা নির্দেশিকা অনুযায়ী যেকোনো পারমাণবিক দুর্ঘটনা থেকে মানুষকে রক্ষা করতে প্রয়োজনীয় জরুরি প্রস্তুতি নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমাদের রয়েছে। আইএইএ দলটি তাদের এই মিশনের মাধ্যমে বাংলাদেশের জরুরি প্রস্তুতি ব্যবস্থা এবং এ সংক্রান্ত কাগজপত্র ও মাঠপর্যায়ের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবে।’
তিনি বলেন, ‘আইএইএ তাদের নিজস্ব প্রযুক্তির মাধ্যমে সবকিছু সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছে। তাই তাদের বিভ্রান্ত করার কোনো সুযোগ নেই। বিশেষজ্ঞ দলটি আগামীকাল বাস্তব পরিস্থিতি পরিদর্শনের জন্য রূপপুর প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে যাবেন।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর আগে জরুরি প্রস্তুতি নিশ্চিত করা প্রতিটি দেশের অবশ্য কর্তব্য। তবে এ বিষয়ে আমরা এখনো অনেকটাই পিছিয়ে আছি।’
তিনি বলেন, ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র যখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে, তখন বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশপাশের বিপুলসংখ্যক বাসিন্দা পারমাণবিক জরুরি অবস্থা বা তেজস্ক্রিয় দুর্ঘটনা দেখা দিলে কী করতে হবে সে বিষয়ে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল নন।’
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর আগে একটি সুনির্দিষ্ট জরুরি ইভাকুয়েশন প্লান, জরুরি যাতায়াতের জন্য যানবাহন, তেজস্ক্রিয় সংক্রমণ চিকিৎসার বিশেষ ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত অ্যান্টি-রেডিওঅ্যাকটিভ ওষুধ ও সেগুলো জনগণের মাঝে বিতরণের বন্দোবস্ত এবং আশ্রয়কেন্দ্র নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক বলে জানান তিনি।
পাশাপাশি, পর্যাপ্ত সুবিধাসম্পন্ন হাসপাতাল এবং স্বল্পতম সময়ে বিদ্যালয়গুলোর শিশুদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা রাখার ওপরও জোর দেন তিনি।
প্রকল্প এলাকা থেকে জরুরি যাতায়াতের পথ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘যদি আমরা এ ধরনের জরুরি প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে না পারি, তবে বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর সময় কোনো জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে তা সামাল দেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হবে।’
বায়েরা চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান স্বীকার করে বলেন, ‘অফ-সাইট জরুরি প্রস্তুতি বা সাইটের বাইরের প্রস্তুতিতে আমরা বেশ কিছুটা পিছিয়ে আছি। এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। সরকার এই ব্যবস্থাগুলো উন্নত করার বিষয়ে আমাদের আশ্বস্ত করেছে। তবে এই মুহূর্তে আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার হলো যত দ্রুত সম্ভব বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা।’
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব মো. আনোয়ার হোসেন জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্রের শ্রমিকদের জন্য রূপপুর প্রকল্পে এরই মধ্যে তিনটি অন-সাইট জরুরি নিরাপদ কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে, যেখানে কোনো জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে ২ হাজার ৪০০ শ্রমিক আশ্রয় নিতে পারবেন। এ ছাড়া, জরুরি রাস্তার জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হলেও এখনো নির্মাণকাজ শুরু হয়নি।
তিনি বলেন, ‘কেউ যেন ঝুঁকির মুখে না পড়ে, সেজন্য আমরা একটি সুসংহত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করছি। সরকারের বিভিন্ন বিভাগ একসঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। আইএইএর এই মিশনের মাধ্যমে আমরা এ বিষয়ে আরও সঠিক দিকনির্দেশনা পাবো।’
