Homeআন্তর্জাতিকঅর্থনৈতিক সংকটে জ্বলছে ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্রও কি একই বিপদের মুখে?

অর্থনৈতিক সংকটে জ্বলছে ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্রও কি একই বিপদের মুখে?

রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে ফ্রান্স এখন উত্তাল। এর মূল কারণ—দেশটি তার নিজের সামর্থ্যের চেয়ে বেশি অর্থ খরচ করে ফেলেছে। বাড়ছে ঋণের বোঝা ও ঋণের সুদ পরিশোধের খরচও। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে কর বাড়ানো ও সরকারি ব্যয় কমানোর মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। কিন্তু এসব সিদ্ধান্তে জনগণের অসন্তোষ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একইসঙ্গে বিভক্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাজেট নিয়ে সমঝোতা করাও সরকারের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, ফ্রান্স কি একাই এই সংকটে রয়েছে?

মঙ্গলবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বজুড়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকা ঋণ, সেই ঋণের জন্য চড়া সুদ পরিশোধ এবং সংকট নিরসনে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব—বর্তমানে পশ্চিমাবিশ্বের অর্থনীতির গল্প অনেকটা এমন। যুক্তরাষ্ট্রও এর বাইরে নয়।

যুক্তরাজ্যের কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক নীতি বিষয়ক অধ্যাপক পিটার টেলর-গুবি সিএনএনকে বলেন, ‘ইউরোপে বন্ড মার্কেট এবং সরকারের নেওয়া ঋণের চড়া সুদ নিয়ে সাধারণ মানুষের ভয় ক্রমেই বাড়ছে। পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, একে আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এখন অবহেলা করলে বড় বিপর্যয় ঘটবে।’

ফ্রান্সের মতো ইউরোপের কয়েকটি দেশে সাম্প্রতিক সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সরকারি ব্যয় কমানোর উদ্যোগ, আবাসনসংকট এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থার অভাবের কারণে বিক্ষোভ হয়েছে।

ইতালিতে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, বেলজিয়ামে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিসহ শিক্ষা সংস্কার, স্পেন ও পর্তুগালে আবাসন সংকট নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বিক্ষোভ হয়েছে।

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউরোপের সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই এমন পথে এগোচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আর্থিকভাবে টেকসই না হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এ বিষয়ে সতর্ক করে আসছেন, একসময় এই ব্যয়ের বোঝা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠবে।

দিন দিন পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। এর ওপর সংঘাতময় বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং ইরান যুদ্ধ পশ্চিমাদের এই সংকট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) গত সপ্তাহে জানিয়েছে, গত ফেব্রুয়ারির পর থেকে জি-সেভেনভুক্ত দেশগুলোর ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের গড় মুনাফার হার এক শতাংশেরও বেশি বেড়েছে, যা বিগত প্রায় ২০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

আইএমএফ পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি দশকের শেষের দিকে এই সাতটি বড় অর্থনীতির দেশের মোট ঋণের পরিমাণ তাদের পুরো অর্থনৈতিক উৎপাদনকে (জিডিপি) ছাড়িয়ে যেতে পারে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলেও সতর্ক করেছে আইএমএফ।

বর্তমানে ফ্রান্সের সরকারি ঋণ তাদের জিডিপির প্রায় ১১৯ শতাংশ, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেঁধে দেওয়া লক্ষ্যমাত্রার প্রায় দ্বিগুণ। এছাড়া দেশটির বার্ষিক বাজেট ঘাটতিও জিডিপির ৫ দশমিক ৪ শতাংশ।

ইউরোপের আর্থিক পরিসংখ্যান ব্যুরো ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইতালির সরকারি ঋণ তার জিডিপির তুলনায় ১৪০ শতাংশ, বেলজিয়ামে ১০৭ শতাংশ, পর্তুগালে ৯০ শতাংশ ও স্পেনে ১০০ শতাংশ।

ইতালির বাজেট ঘাটতি তার জিডিপির প্রায় তিন শতাংশের সমান। বেলজিয়ামের ঘাটতি জিডিপির পাঁচ শতাংশের বেশি এবং স্পেনের এই ঘাটতি আড়াই শতাংশের বেশি। অন্যদিকে পর্তুগালে ঘাটতি নেই বরং উদ্ধৃত রয়েছে দশমিক ৭ শতাংশ।

যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক গবেষণা ও পূর্বাভাস প্রদানকারী সংস্থা ‘ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের ইউরোপ বিষয়ক প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যান্ড্রু কেনিংহাম বলেন, ‘একটি সরকার কতটা ঋণের বোঝা বহন করতে পারবে, তা বেশ কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। কোনো দেশের বাজেট ঘাটতি অনেক বেশি হলে উদ্বেগ বাড়ে। অন্যান্য পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলে, ঋণের অনুপাত বাড়তে থাকে।’

প্রতিবেদনে বলা হয়, কাগজে-কলমে যুক্তরাষ্ট্রের চিত্রও খুব একটা আলাদা নয়। দেশটির সরকারি ঋণের পরিমাণ ৩২ ট্রিলিয়ন ডলার, যা তাদের বার্ষিক জিডিপির প্রায় সমান। একইসঙ্গে বার্ষিক দুই ট্রিলিয়ন ডলারের বাজেট ঘাটতি, তাদের জিডিপির ছয় শতাংশের বেশি। 
এছাড়া ঋণ পরিশোধে যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক সুদের খরচ সম্প্রতি এক ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যা তাদের মোট ফেডারেল বাজেটের ১৪ শতাংশ।

এর অর্থ হলো, সরকারের সংগ্রহ করা প্রতি ৭ ডলার করের মধ্যে ১ ডলারই চলে যাচ্ছে ঋণের সুদ মেটাতে।

এ অবস্থায় প্রশ্ন ওঠে—ঋণ, বাজেট ঘাটতি ও সুদের খরচ বেশি হওয়া স্বত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র কেন এখনো ফ্রান্সের মতো সংকটে পড়েনি?

সিএনএন বলছে, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি একই রকম হলেও ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

যেমন, ফ্রান্সের সরকার সামাজিক নিরাপত্তা খাতে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করে।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যার কারণে দেশটি শিগগিরই ফ্রান্সের মতো সংকটে পড়বে না মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি—দেশটি বিশ্ব অর্থনীতির রিজার্ভ কারেন্সি বা প্রধান বৈশ্বিক মুদ্রা ছাপে। জ্বালানি তেলসহ বিশ্বের বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মার্কিন ডলারে পরিচালিত হয়।

গত এক দশকে বিশ্ববাজারে মার্কিন ডলারের অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন হলেও এখনও এর চাহিদা ব্যাপক এবং বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হিসেবে বিভিন্ন দেশ এখনও ডলারের ওপর ভরসা করে।

এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বন্ডের চাহিদা সবসময় বেশি থাকে এবং একে আন্তর্জাতিক বাজারে সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে ধরা হয়।

বিশ্বজুড়ে বন্ড বিক্রির ঢল নামলেও যুক্তরাষ্ট্রের বন্ডের সুদের হার অন্যান্য পশ্চিমা দেশের তুলনায় অনেক কম।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি বিশাল ও বৈচিত্র্যময়, যা যেকোনো বৈশ্বিক ধাক্কা সহ্য করার সামর্থ্য রাখে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে যুক্তরাষ্ট্রে যে পরিমাণ বিনিয়োগের জোয়ার এসেছে, তা দেশের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিকে সচল রাখছে।

আর এই প্রবৃদ্ধির কারণে বিশাল ঋণের বোঝা তুলনামূলকভাবে ছোট হিসেবে দেখা হয়।

অর্থনীতি বিষয়ক বিশ্লেষণধর্মী মার্কিন সংস্থা মুডিস অ্যানালিটিক্সের প্রধান অর্থনীতিবিদ মার্ক জান্ডি সিএনএনকে বলেন, ‘ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের পরিস্থিতি খুব কাছাকাছি। তবে যুক্তরাষ্ট্রে এআই প্রযুক্তির অবদান তাদের প্রবৃদ্ধিকে ধরে রাখতে সাহায্য করছে, ফলে তারা নিজেদের ঋণ তুলনামূলক ভালোভাবে সামলাতে পারছে।’

তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে ঋণ সংকট অবিলম্বে তৈরি হচ্ছে না মানে এই নয় যে, দেশটি দায়িত্বশীল আর্থিক নীতি মেনে চলছে।

এর অর্থ হলো, যুক্তরাষ্ট্র এই চাপ সহ্য করার ক্ষেত্রে ফ্রান্স বা যুক্তরাজ্যের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।

তবে তারা কতদিন এ অবস্থানে থাকবে—সেটাই প্রশ্ন।

RELATED ARTICLES

Most Popular