কুমিল্লা নগরীর বাসিন্দা মনোয়ারা বেগমের স্বপ্ন, প্রয়াত স্বামীর রেখে যাওয়া একখণ্ড জমিতে সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে ছোট একটি বাড়ি নির্মাণ করবেন।
এ জন্য একজন প্রকৌশলীর মাধ্যমে বাড়ির নকশা তৈরি করিয়েছেন। জমির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও নির্ধারিত ফি জমা দিয়েছেন কুমিল্লা সিটি করপোরেশনে (কুসিক)। এমনকি সিটি করপোরেশনের একজন সার্ভেয়ার দিয়ে জমি পরিদর্শনও করিয়েছেন।
কিন্তু দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও বাড়ির নকশার অনুমোদন পাননি তিনি। ফলে ব্যাংক থেকে গৃহঋণ নেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত নিজের স্বপ্নের বাড়ি নির্মাণ করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন মনোয়ারা।
শুধু মনোয়ারা নন, কুমিল্লা নগরীতে ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদন না পাওয়ায় এমন ভোগান্তিতে পড়েছেন আরও অনেকে। কুসিকের কাছে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৫০০টি নকশা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নকশা অনুমোদনের প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে ওঠে। ওই সময় থেকে কুসিকের ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদন কমিটির নিয়মিত সভা হয়নি।
কুসিক সূত্র জানায়, সর্বশেষ গত ২৩ ফেব্রুয়ারি কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় প্রায় ৩৫০টি ভবনের নকশা বিবেচনা করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ২০০টির অনুমোদন দেওয়া হয়।
এদিকে নগরীতে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত প্রায় ৭০টি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের ৩ হাজারের মতো উন্নয়ন প্রকল্প চলমান রয়েছে। নকশা অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতার কারণে এসব প্রকল্পের অনেকগুলোর কাজ এগোচ্ছে না। এতে আবাসন খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
কুমিল্লার একটি আবাসন উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক মাজারুল ইসলাম রিপন বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠানের বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক ও আবাসিক প্রকল্পের নকশা কুসিকের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। ফলে প্রকল্পগুলোর কাজ এগিয়ে নেওয়া যাচ্ছে না। এতে নগরীর হাজার হাজার মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছেন।
কুসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু সায়েম ভুইয়া বলেন, বর্তমানে ভবন নির্মাণের প্রায় ১ হাজার ৫০০টি নকশা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
তিনি জানান, ২০১৪-১৫ সালে কুসিক একটি খসড়া মহাপরিকল্পনা তৈরি করে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিল। তবে কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কুডা) প্রতিষ্ঠার পর পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
সায়েম আহমেদ আরও বলেন, চলতি বছরের আগস্ট থেকে কুসিক ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদনের নতুন আবেদন নেওয়া বন্ধ রেখেছে।
গত ১০ এপ্রিল কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার গেজেট প্রকাশিত হয়। এর ফলে গেজেটভুক্ত এলাকার মধ্যে কুসিকের আওতাধীন এলাকাসহ অন্যান্য এলাকায় ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদনের দায়িত্ব পেয়েছে কুডা।
কুডার সহকারী অথরাইজড অফিসার প্রকৌশলী শেরিফুল হক বলেন, বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) ২০২০ অনুযায়ী, নির্ধারিত এলাকার মধ্যে ভবনের নকশা অনুমোদন ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণমূলক কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব কুডার।
তিনি বলেন, কুসিকের কাছে জমা থাকা অনিষ্পন্ন নকশার আবেদনগুলো হস্তান্তরের জন্য কুডা থেকে তিনটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কুসিকের পক্ষ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
এদিকে ভবনের নকশা অনুমোদনের জন্য একটি কমিটি গঠন করেছে কুডা। গত ৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত কমিটির প্রথম সভায় ১৩টি নকশা উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে ১১টির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
কুডার চেয়ারম্যান উবাতুল বারী আবু বলেন, নগরবাসীকে ভবন নির্মাণসংক্রান্ত বিধিবিধানের আওতায় নিয়ে আসা কর্তৃপক্ষের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
