Homeআন্তর্জাতিকট্রাম্পের ভরাডুবি: ইরান, ইসরায়েল ও ইউক্রেনের জন্য বার্তা কী?

ট্রাম্পের ভরাডুবি: ইরান, ইসরায়েল ও ইউক্রেনের জন্য বার্তা কী?

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির বড় পরাজয়ের প্রভাব দেশটির সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও পড়তে পারে। প্রায় দুই বছর ধরে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছেন ট্রাম্প। এতে মিত্র ও প্রতিপক্ষ উভয় পক্ষের মধ্যেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এখন নির্বাচনে ধাক্কা খাওয়ার পর বিদেশের মাটিতে ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়, সেদিকে নজর রাখছে বিভিন্ন দেশ।

বিশেষ করে ইরান, ইসরায়েল ও ইউক্রেনের জন্য এই নির্বাচনের ফল গুরুত্বপূর্ণ। তেহরানের সঙ্গে সমঝোতা নাকি নতুন করে যুদ্ধ, ট্রাম্প কোন পথে হাঁটবেন, ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সমর্থন কতটা কমবে এবং রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে ইউক্রেনকে কতটা চাপ দেবেন, এসব প্রশ্নের উত্তর নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করতে পারে।

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ট্রাম্পের দল রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়েছে। ডেমোক্র্যাটরা এখন তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার নতুন সুযোগ পাবে। তবে আন্তর্জাতিক বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের হাতে এখনো যথেষ্ট ক্ষমতা রয়েছে।

ফলে প্রশ্ন উঠেছে, নির্বাচনে পরাজয় তাকে সমঝোতায় আগ্রহী করবে, নাকি নিজের অবস্থানে আরও অনড় করে তুলবে?

মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের পরাজয়কে স্বাগত জানিয়েছে ইরান। তবে দেশটি এখনো যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলার আশঙ্কায় রয়েছে।

ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প স্বীকার করেছেন, ইরান যুদ্ধ রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে আংশিক ভূমিকা রেখেছে। তবে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আরও স্পষ্টভাবে বলেছেন, যুদ্ধই তাদের পরাজয়ের কারণ।

যুদ্ধের বিরুদ্ধে মার্কিন ভোটারদের ক্ষুব্ধ করতে গত আট মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়ে আসছে ইরান। রিপাবলিকানদের পরাজয়কে যুদ্ধের বিরুদ্ধে জনমতের রায় হিসেবে দেখছে তেহরান। যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়াও নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে বলে স্বীকার করেছেন ট্রাম্প।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়া ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, মার্কিন সরকার যদি আন্তর্জাতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট শক্তি ও ব্ল্যাকমেইলারদের স্বার্থে জনগণের রায় উপেক্ষা করে, তাহলে তাদের কঠিন পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।

তবে ওয়াশিংটনের নীতিতে পরিবর্তন আসবে, এমনটা ধরে নিচ্ছে না তেহরান। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বলেছেন, মার্কিন নির্বাচনের ফলাফলে দেশটির নীতির পরিবর্তন হবে বলে যারা মনে করছেন, তারা ‘গুরুতর ভুল করছেন’।

ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ওপর নির্ভরশীল নয়। নতুন করে যুদ্ধের প্রস্তুতির পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতাও চালাচ্ছে তেহরান।

নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। ইরান সতর্ক করেছে, এবার পাল্টা হামলার পরিধি আগের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত হবে। এ সপ্তাহে কয়েকজন সাংবাদিককে ট্রাম্প বলেছেন, ইরানে বড় ধরনের হামলার কথা বিবেচনা করছেন। আবার অন্যদের বলেছেন, আপাতত যুদ্ধ বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা নেই তার।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের আলী ভায়েজ সিএনএনকে বলেন, ইরান যুদ্ধ ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন তার সামনে দুটি পথ—মুখরক্ষার মতো একটি সমঝোতা করে বিজয় ঘোষণা করা অথবা সামরিকভাবে আরও কঠোর অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করা। তার আশঙ্কা, নির্বাচনে দুর্বল হয়ে পড়া প্রেসিডেন্ট যুদ্ধক্ষেত্রে সাফল্য দিয়ে সেই পরাজয়ের ক্ষত মুছে ফেলার চেষ্টা করতে পারেন।

তবে কূটনীতির পথও খোলা রয়েছে। গ্রীষ্মে স্থবির হয়ে পড়া আলোচনা গত এক সপ্তাহে আবার গতি পেয়েছে। ইরান কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের কাছে কর্মকর্তা পাঠিয়েছে। কাতার ওয়াশিংটনের সঙ্গে বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করছে। নির্বাচনের আগে ট্রাম্প ইরানের সাতটি শর্ত মেনে নিলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল তেহরান।

চ্যাথাম হাউসের সানাম ভাকিল বলেন, নির্বাচনের ফল ইরানের নেতৃত্বের কাছে নিজেদের অবস্থানের পক্ষে সমর্থন হিসেবে মনে হতে পারে। তবে এতে তাদের সমস্যার সমাধান হবে না। ট্রাম্প কূটনৈতিক বিজয় চান, কিন্তু নিজেকে দুর্বল দেখাতে চান না। অন্যদিকে তেহরান তার নির্বাচনী পরাজয়কে আরও বেশি ছাড় আদায়ের সুযোগ হিসেবে দেখতে পারে। তার ধারণা, সামরিক হুমকির পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতাও বাড়বে। পূর্ণাঙ্গ চুক্তির চেয়ে হরমুজ প্রণালি নিয়ে অন্তর্বর্তী সমঝোতা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

ইসরায়েলের জন্য মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিনই প্রথম ধাক্কাটি আসে। সেদিন ট্রাম্প আকস্মিকভাবে দেশটিকে মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধের ঘোষণা দেন। এরপর কংগ্রেসের উভয় কক্ষে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়কে ইসরায়েলের জন্য বড় ধরনের সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের প্রতি দুই দলের দীর্ঘদিনের সমর্থন আগেই কমতে শুরু করেছিল। গাজা যুদ্ধে প্রাণহানির ঘটনায় ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, রিপাবলিকানদের মধ্যেও একটি অংশ মনে করছে, ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত সমর্থন দিয়ে আসছে।

যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাইকেল ওরেন সিএনএনকে বলেন, বর্তমানে ইসরায়েলের সমালোচনাই যুক্তরাষ্ট্রের দুই দলের মধ্যে একমাত্র অভিন্ন বিষয় হয়ে উঠেছে। এটি ডেমোক্রেটিক পার্টির রাজনৈতিক অবস্থানের অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠেছে এবং রিপাবলিকান পার্টির বড় একটি অংশেও একই প্রবণতা তৈরি হচ্ছে।

ওরেনের মতে, মার্কিন সহায়তা বন্ধের সিদ্ধান্ত কেবল শুরু। যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং আয়রন ডোমের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামরিক প্রযুক্তির যৌথ উন্নয়নও বন্ধ করে দিতে পারে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো দিয়ে ইসরায়েলকে সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টিও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

তিনি বলেন, ‘আমরা একটি যুগের অবসানে পৌঁছেছি।’

জেরুজালেম পোস্টের সাবেক সম্পাদক ইয়াকভ কাৎজও মনে করেন, সামনে আরও পরিবর্তন আসতে পারে। এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, সামরিক সহায়তা বন্ধের ঘোষণা আসলে পরিবর্তনের হিমশৈলের চূড়ামাত্র। অস্ত্র বিক্রি বন্ধ, নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব এবং যৌথ অর্থনৈতিক কর্মসূচির অর্থায়ন বন্ধের মতো পদক্ষেপও আসতে পারে।

ইরান যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের একাংশের মধ্যে ইসরায়েলবিরোধী মনোভাব আরও জোরালো হয়েছে। তাদের ধারণা, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে এই যুদ্ধে জড়িয়েছেন। এখনো নেতানিয়াহু ইরানে নতুন করে হামলা শুরুর জন্য চাপ দিয়ে যাচ্ছেন। অথচ এই যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, যা মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের অন্যতম কারণ।

ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও অস্থিরতা চলছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে দেশটির পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছেন নেতানিয়াহু। তবে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইসেনকটেরও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। সরকার গঠন করতে হলে তাকে রেকর্ডসংখ্যক ভোট পাওয়া আরব দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা করতে হতে পারে।

বামপন্থি ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলান সতর্ক করে বলেছেন, ইসরায়েলকে নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা থেকে বের করে আনতে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল নিয়ে ইউক্রেনের প্রতিক্রিয়া নির্বাচনের আগেই অনেকটা স্পষ্ট হয়েছিল। তবে বুধবার কিয়েভের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তেমন কোনো মন্তব্য আসেনি।

গত কয়েক সপ্তাহে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্কের ব্যাপক অবনতি হয়েছে। ট্রাম্প জেলেনস্কিকে ক্ষমতা থেকে সরানোর দাবি জানিয়েছেন, রাশিয়ার স্বার্থসংশ্লিষ্ট জ্বালানি চুক্তির উদ্যোগ নিয়েছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইউক্রেনের প্রযুক্তিগত ও গোয়েন্দা নির্ভরতা বাধাগ্রস্ত করেছেন।

এ পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের কৌশল অনেকটা আগেভাগেই নির্ধারিত হয়েছে, ট্রাম্প-পরবর্তী বিশ্বের জন্য অপেক্ষা করা।

বুধবার নির্বাচনের ফলাফল স্পষ্ট হতে শুরু করলেও কিয়েভের পক্ষ থেকে তেমন কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের উপপ্রধান সের্গেই কিসলিৎসিয়া ইউক্রেনের টেলিভিশনে বলেন, ক্ষমতায় যিনিই থাকুন না কেন, তাদের সঙ্গে প্রকৃত, স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাওয়ার চেষ্টা এবং নতুন কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার কথাও জানান তিনি।

তবে ট্রাম্পের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার সময় ফুরিয়ে আসার বিষয়টি ইউক্রেনের জন্য ইতিবাচক। ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটানো সহজ। কিন্তু রাশিয়ার শর্ত মেনে নিতে রাজি না হওয়ায় তিনি ইউক্রেনের ওপরই চাপ সৃষ্টি করেছেন। জেলেনস্কিকে কখনো অপমান করেছেন, কখনো তিরস্কার করেছেন, আবার কখনো সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেছেন। এ পরিস্থিতিতে ইউরোপের মিত্ররাও উদ্বিগ্ন।

অস্ত্র, অর্থ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের নিশ্চয়তা—এখনো ইউক্রেনের এসব সহায়তা প্রয়োজন। তবে কয়েক মাসের বৈরী আচরণের পর ওয়াশিংটনের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা যাবে না বলে মনে করছে কিয়েভ।

তবে ট্রাম্পের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব কমে আসার একটি ঝুঁকিও রয়েছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন মনে করতে পারেন, ২০২৮ সালের নির্বাচনের আগে তার হাতে প্রায় এক বছর সময় রয়েছে। এ সময়ের মধ্যে যুদ্ধের মাধ্যমে যতটা সম্ভব সুবিধা আদায় করে নিতে চাইতে পারেন তিনি। কারণ, ২০২৮ সালের নির্বাচনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান পার্টির নীতিতে আবার ইউক্রেনপন্থি অবস্থান ফিরে আসতে পারে।

এতদিন ট্রাম্পকে নিজের বড় মিত্র হিসেবে পেয়েও যুদ্ধক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করতে পারেননি পুতিন। তবে ট্রাম্পের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ক্ষয় হতে থাকার এই সময়ে সেই পরিস্থিতি বদলে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন তিনি।

RELATED ARTICLES

Most Popular