Homeঅন্যান্যবিশ্বকাপের আসল মজা কি মাঠে, নাকি মাঠের বাইরের তর্কে?

বিশ্বকাপের আসল মজা কি মাঠে, নাকি মাঠের বাইরের তর্কে?

খেলা রাত তিনটায়। কিন্তু রাত নয়টার পর থেকেই ফেসবুকের পরিবেশ বদলে গেছে। কেউ নিজের দলের জার্সি পরে ছবি দিয়েছেন, কেউ পুরোনো কোনো মিম শেয়ার করছেন, কেউ আবার বিপক্ষ দলের সমর্থকদের উদ্দেশে  স্ট্যাটাস দিয়েছেন। কয়েকজন ইতোমধ্যে ভবিষ্যদ্বাণীও করে ফেলেছেন—কে জিতবে, কে হারবে, আর ম্যাচ শেষে কারা চুপ মেরে যাবে। বিশ্বকাপ ভিনদেশের মাঠে হলেও, এই উত্তেজনা বাংলাদেশের ঘরে ঘরে খুব পরিচিত এক দৃশ্য।

বাংলাদেশে বিশ্বকাপ শুধু একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট নয়। এটি অনেকটা সামাজিক উৎসবের মতো। খেলা যেমন দেখা হয়, তেমনি খেলা নিয়ে আলোচনা, তর্ক, মিম, ভবিষ্যদ্বাণী আর ঠাট্টা-তামাশাও চলে সমান তালে। কখনো কখনো মনে হয়, মাঠের ৯০ মিনিটের চেয়েও মাঠের বাইরের ঘটনাগুলো কম বিনোদন দেয় না।

বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচিত দৃশ্যগুলোর একটি হলো তর্ক। ম্যাচের ফল কী হবে, কোন দল বেশি শক্তিশালী, কোন খেলোয়াড় সেরা এসব নিয়ে আলোচনা চলতেই থাকে।

চায়ের দোকান থেকে শুরু করে অফিসের ক্যান্টিন, বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডর থেকে পারিবারিক আড্ডা সব জায়গাতেই একই আলোচনা। অনেক সময় এমনও দেখা যায়, যে ব্যক্তি সারা বছর ফুটবল নিয়ে খুব একটা কথা বলেন না, তিনিও বিশ্বকাপের সময় বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বিশ্লেষণ করে যাচ্ছেন।

আর ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থকদের কথোপকথন তো আলাদা এক বিনোদন। কেউ পুরোনো পরিসংখ্যান বের করেন, কেউ পুরোনো ট্রফির সংখ্যা মনে করিয়ে দেন, কেউ আবার আগের বিশ্বকাপের কোনো মুহূর্ত টেনে আনেন। তর্কের শেষ হয় না, শুধু বিষয় বদলায়।

বিশ্বকাপের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুকলে মনে হয় আরেকটি প্রতিযোগিতা চলছে। এখানে গোল নেই, কিন্তু স্ট্যাটাস আছে। ট্রফি নেই, কিন্তু মিম আছে।

একটি দল জিতলে সমর্থকদের আনন্দ যেমন চোখে পড়ে, হারলে প্রতিপক্ষের সমর্থকদের উপস্থিতিও হঠাৎ বেড়ে যায়। অনেকের কাছে ম্যাচ শেষ হওয়ার পরের কয়েক ঘণ্টাই সবচেয়ে উপভোগ্য সময়। কারণ তখন শুরু হয় পোস্ট, মন্তব্য আর পাল্টা মন্তব্যের বন্যা। অনেকেই খেলার চেয়ে খেলা-পরবর্তী প্রতিক্রিয়াগুলো দেখতেই বেশি আগ্রহী। কে কী লিখল, কে প্রোফাইল ছবি বদলাল, কে হঠাৎ নীরব হয়ে গেল এসবও আলোচনার অংশ হয়ে যায়।

বাংলাদেশে অনেক পরিবারে দল সমর্থনও এক ধরনের ঐতিহ্য। বাবা ব্রাজিল সমর্থক ছিলেন, তাই ছেলেও ব্রাজিল সমর্থক। বড় ভাই আর্জেন্টিনার সমর্থক, তাই ছোট ভাইও সেই পথেই হেঁটেছে। ফলে বিশ্বকাপের সময় একই পরিবারের মানুষও ভাগ হয়ে যান। ড্রইংরুমে বসে খেলা দেখার সময় যে আলোচনা শুরু হয়, সেটি কখনো কখনো ম্যাচ শেষ হওয়ার পরও চলতে থাকে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই তর্কের ভেতরে থাকে আনন্দ। সবাই জানেন, শেষ পর্যন্ত এটি ফুটবল নিয়েই আলোচনা। তবু নিজেদের দলকে নিয়ে একটু বাড়তি আবেগ দেখানোর সুযোগ কেউ ছাড়তে চান না।

বিশ্বকাপের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক নাটকীয় ঘোষণা দেখা যায়। কেউ বলেন, দল হারলে তিনি আর কথা বলবেন না। কেউ বলেন, নির্দিষ্ট কিছু মানুষকে সহ্য করা যাচ্ছে না। কেউ আবার ঘোষণা দেন, ম্যাচের পর কয়েকদিন ফেসবুকে আসবেন না। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, পরদিন আবার সবাই স্বাভাবিক। নতুন কোনো ম্যাচ, নতুন কোনো তর্ক বা নতুন কোনো মিম এসে আগের হতাশা ভুলিয়ে দেয়।

সম্ভবত এটাই বিশ্বকাপের সবচেয়ে সুন্দর দিকগুলোর একটি। মানুষ নিজেদের দল নিয়ে আবেগী হন, তর্ক করেন, মজা করেন, কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেটি খেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।

এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো সবার জন্য এক নয়। কেউ বলবেন, অসাধারণ কোনো গোল দেখার মধ্যে। কেউ বলবেন, প্রিয় দলের জয় উদযাপনে। আবার কারও কাছে সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হতে পারে বন্ধুদের সঙ্গে রাত জেগে খেলা দেখা।

তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি বিষয় নিশ্চিত করে বলা যায়—বিশ্বকাপের আনন্দ শুধু মাঠে সীমাবদ্ধ নয়, এটি ছড়িয়ে থাকে চায়ের দোকানের তর্কে, বন্ধুদের খুনসুটিতে, পরিবারের আড্ডায়, ফেসবুকের মিমে আর মাঝরাতে একসঙ্গে খেলা দেখার স্মৃতিতে। হয়তো সে কারণেই বিশ্বকাপ চার বছর পরপর এলেও এর জন্য মানুষের অপেক্ষা ফুরায় না। কারণ বিশ্বকাপ শুধু ফুটবল নয়, এটি একসঙ্গে আনন্দ করার, তর্ক করার এবং কিছু স্মৃতি জমিয়ে রাখারও উপলক্ষ।

RELATED ARTICLES

Most Popular