যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট দিতে যাওয়ার আগে ভোটারদের সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়। মঙ্গলবারের এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হবে, মার্কিন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে থাকবে। এর ওপরই নির্ভর করছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দুই বছরে কংগ্রেসের ক্ষমতার ভারসাম্য।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইপসোসের এক জরিপে মার্কিন ভোটারদের ভাবনায় থাকা নয়টি মূল বিষয় উঠে এসেছে। গত বৃহস্পতিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ১ হাজার ৭৬৫ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর জরিপটি চালানো হয়।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি প্রচলিত বুথফেরত জরিপ (এক্সিট পোল) নয়। নিবন্ধিত ভোটারদের ক্ষেত্রে এই জরিপের ফলাফল প্রকৃত জনমতের তুলনায় ৩ শতাংশ পয়েন্ট পর্যন্ত কম বা বেশি হতে পারে।
জরিপে অংশ নেওয়া নিবন্ধিত ভোটারদের ৪৮ শতাংশই বলেছেন, কাকে ভোট দেবেন তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার ব্যয় তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। গণতান্ত্রিক রীতিনীতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন ২৬ শতাংশ ভোটার। আর ১৩ শতাংশের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অভিবাসন।
রয়টার্স জানিয়েছে, গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর পর দেশটিতে জ্বালানির দাম অনেক বেড়েছে।
নিজের দল রিপাবলিকান পার্টির সমর্থকদের ভোট দিতে উৎসাহিত করতে ট্রাম্প আহ্বান জানিয়েছেন, ব্যালটে তার নাম রয়েছে ধরে নিয়েই তারা যেন ভোট দেন।
রয়টার্স-ইপসোসের জরিপে দেখা গেছে, যারা ইতোমধ্যে ভোট দিয়েছেন বা ভোট দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাদের ৪৮ শতাংশই মনে করেন—এই ভোট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে।
অন্যদিকে ২৫ শতাংশ বলেছেন, তারা ট্রাম্পের পক্ষে ভোট দিচ্ছেন। বাকি ২৫ শতাংশের মতে, তাদের ভোটের সিদ্ধান্তে ট্রাম্প কোনো প্রভাব ফেলছেন না।
ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, সে জন্য দেশটির বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান প্রয়োজন ছিল বলে যুক্তি দিয়েছেন ট্রাম্প। তবে জরিপে অংশ নেওয়া ভোটারদের মাত্র ২৫ শতাংশ মনে করেন, এই সামরিক অভিযানের ব্যয় ও খেসারত সার্থক হয়েছে। ৫৫ শতাংশের মতে, এই ব্যয় সার্থক হয়নি। আর এ বিষয়ে নিশ্চিত নন ১৮ শতাংশ ভোটার।
সামগ্রিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর ভোটারদের আস্থা রয়েছে। জরিপে ৭৭ শতাংশ বলেছেন, তাদের দেওয়া ভোট যে সঠিকভাবে গণনা করা হবে, সে বিষয়ে তারা আত্মবিশ্বাসী। তবে ৪৫ শতাংশ মনে করেন, দেশটিতে ভোট জালিয়াতি একটি বড় সমস্যা।
ট্রাম্প প্রমাণ ছাড়াই দাবি করে আসছেন, বিপুলসংখ্যক অ-মার্কিন নাগরিক অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ভোট দেন। এদিকে নির্বাচন কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, ট্রাম্প প্রশাসন তাদের মনমতো না হলে নির্বাচনের ফলাফল বা ফলের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে। তবে হোয়াইট হাউস বলছে, নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও ভোটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের লক্ষ্য।
জরিপে অংশ নেওয়া মার্কিন নাগরিকদের ৪৯ শতাংশ মনে করেন, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে তাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়েছে। ১৩ শতাংশ বলেছেন, তাদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। আর ৩৭ শতাংশের মতে, পরিস্থিতি আগের মতোই রয়েছে।
২০২৪ সালের নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে অর্থনীতিকে দ্রুত চাঙা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার জনপ্রিয়তার হার কমে নিজের রাজনৈতিক জীবনের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে যারা তার দিকে ঝুঁকেছিলেন, সেই হিস্পানিক মার্কিন নাগরিকদের মধ্যেও তার জনপ্রিয়তা কমেছে।
রয়টার্স-ইপসোসের সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে, হিস্পানিকদের ৫৪ শতাংশ বলেছেন, তাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। মাত্র ১০ শতাংশ জানিয়েছেন, তাদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে।
নির্বাচনের আগে জরিপে অংশ নেওয়া ভোটারদের ৩৮ শতাংশ বলেছেন, ট্রান্সজেন্ডার কিশোরী ও নারীদের নারী ক্রীড়ায় অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখা তাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অন্যদিকে ২৫ শতাংশ ভোটার ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের অধিকার সুরক্ষাকে একই মাত্রার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মনে করেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত ডেটা সেন্টার নির্মাণ সীমিত করাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মনে করেন জরিপে অংশ নেওয়া নিবন্ধিত ভোটারদের ৪২ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে অতি ধনীদের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে খুব বেশি সীমাবদ্ধতা নেই। তবে দুই দলেরই অধিকাংশ নিবন্ধিত ভোটার মনে করেন, নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের জন্য ধনকুবেরদের কোটি কোটি ডলার অনুদান দেওয়া ঠিক নয়।
রয়টার্স-ইপসোসের জরিপ অনুযায়ী, এমন মত দিয়েছেন ডেমোক্র্যাট ভোটারদের ৯৩ শতাংশ এবং রিপাবলিকান ভোটারদের ৭১ শতাংশ।
এ বছরের কংগ্রেস নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের প্রতি ভোটারদের সমর্থন রিপাবলিকানদের তুলনায় সামান্য বেশি বলে জরিপে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে কোন দলের ভালো পরিকল্পনা রয়েছে, সে বিষয়ে ভোটারদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
জরিপে অংশ নেওয়া নিবন্ধিত ভোটারদের ৪৩ শতাংশ বলেছেন, ডেমোক্র্যাটদের অন্তত কিছু ভালো পরিকল্পনা রয়েছে। আর রিপাবলিকানদের ক্ষেত্রে একই কথা বলেছেন ৩৯ শতাংশ ভোটার।
