টেনিস কোর্টে প্রায় দুই দশক রাজত্ব করেছেন রাফায়েল নাদাল। ২২টি গ্র্যান্ড স্লাম জিতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ইতিহাসের অন্যতম সেরা টেনিস খেলোয়াড় হিসেবে। এবার সেই নাদালকে দেখা যেতে যাচ্ছে নতুন ভূমিকায়। প্রিয় ফুটবল ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদের পরিচালনা পর্ষদে যোগ দিতে যাচ্ছেন স্প্যানিশ এই কিংবদন্তি। আর তাতেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে একটি প্রশ্ন, ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের পর রিয়াল মাদ্রিদের সভাপতি কি তাহলে নাদালই হতে যাচ্ছেন?
গত ৪ নভেম্বর নাদালকে পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে রিয়াল মাদ্রিদ। তবে তার নিয়োগ এখনও চূড়ান্ত হয়নি। আগামী ২১ নভেম্বর ক্লাবের সদস্য প্রতিনিধিদের সাধারণ সভায় প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য তোলা হবে। সেখানে অনুমোদন পেলেই আনুষ্ঠানিকভাবে রিয়ালের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হবেন সাবেক এই টেনিস তারকা।
নাদালের অন্তর্ভুক্তিকে রিয়াল মাদ্রিদের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও তাকে পেরেজের উত্তরসূরি হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে, এমন কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। বিষয়টি নিয়ে ক্লাব কর্তৃপক্ষ যেমন নীরব, তেমনি নাদালের ঘনিষ্ঠ মহল থেকেও কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না।
রিয়াল মাদ্রিদের সঙ্গে নাদালের সম্পর্ক অবশ্য নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই ক্লাবটির একনিষ্ঠ সমর্থক তিনি। ২০১১ সাল থেকে রিয়ালের সম্মানসূচক সদস্য হিসেবে রয়েছেন। তার সদস্য নম্বর ৬৭ হাজার ৭৭৮। ক্লাব সভাপতি পেরেজের সঙ্গেও রয়েছে সুসম্পর্ক।
টেনিসে ২২টি গ্র্যান্ড স্লাম, দুটি অলিম্পিক সোনা এবং পাঁচটি ডেভিস কাপজয়ী নাদালের আন্তর্জাতিক পরিচিতি রিয়াল মাদ্রিদের জন্যও বড় অর্জন বলে মনে করা হচ্ছে। তাকে পরিচালনা পর্ষদে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যায় ক্লাবটি জানিয়েছে, নাদালের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ মানসিকতা, আত্মত্যাগ, বিনয় এবং প্রতিপক্ষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আচরণ রিয়াল মাদ্রিদের মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
নতুন দায়িত্ব পেলে ক্লাবের পরিচালনব্যবস্থা কাছ থেকে দেখার এবং অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাবেন নাদাল। নিজেও জানিয়েছেন, নতুন কিছু শিখতে এবং সামর্থ্য অনুযায়ী ক্লাবকে সাহায্য করতে চান তিনি। তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের ধারণা, শুধুই নামমাত্র পদ অলংকৃত করার জন্য এই দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন না নাদাল। বরং ক্লাবের কাজে সক্রিয়ভাবে অবদান রাখার ইচ্ছা রয়েছে তার।
তবে রিয়াল মাদ্রিদের সভাপতি হওয়ার পথে একটি বড় বাধা রয়েছে নাদালের সামনে। সেটি ক্লাবের নিজস্ব গঠনতন্ত্র। রিয়াল মাদ্রিদের গঠনতন্ত্রের ৪০ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সভাপতি পদে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে অন্তত ২০ বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে ক্লাবের সদস্য থাকতে হবে। সহসভাপতি হওয়ার জন্য প্রয়োজন ১৫ বছরের সদস্যপদ এবং পরিচালনা পর্ষদের অন্য সদস্যদের জন্য এই সময়সীমা ১০ বছর।
নাদাল ২০১১ সাল থেকে রিয়াল মাদ্রিদের সম্মানসূচক সদস্য। সেই সময় থেকে তার সদস্যপদের মেয়াদ গণনা করা হলে ২০ বছরের শর্ত পূরণ হবে ২০৩১ সালে। অর্থাৎ প্রচলিত নিয়মে ২০৩১ সালের আগে সভাপতি পদে নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না তিনি। যদিও সহসভাপতি ও সাধারণ পরিচালক হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সদস্যপদের মেয়াদ ইতোমধ্যে পূরণ করেছেন।
এখানেই শেষ নয়। সভাপতি নির্বাচনে অংশ নিতে হলে আরেকটি কঠিন আর্থিক শর্তও পূরণ করতে হয়। প্রার্থী ও তার প্যানেলকে ক্লাবের বাজেটকৃত মোট ব্যয়ের অন্তত ১৫ শতাংশের সমপরিমাণ ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে হবে। সেই নিশ্চয়তার ভিত্তি হতে হবে প্রার্থী ও তার প্যানেলের সদস্যদের ব্যক্তিগত সম্পদ।
তবে সভাপতি হওয়ার জন্য নির্বাচনে অংশ নেওয়াই একমাত্র পথ নয়। রিয়াল মাদ্রিদের গঠনতন্ত্রে আরেকটি বিশেষ ব্যবস্থাও রয়েছে। কোনো কারণে সভাপতির পদ স্থায়ীভাবে শূন্য হলে পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা নিজেদের মধ্য থেকে নতুন সভাপতি নির্বাচন করতে পারেন। পরে সেই সিদ্ধান্ত সাধারণ সভায় অনুমোদন করাতে হয়।
অবশ্য রিয়াল মাদ্রিদের সভাপতি হওয়ার আগ্রহ কখনো পুরোপুরি আড়াল করেননি নাদাল। ২০২৪ সালে স্প্যানিশ টেলিভিশন লাসেক্সতার এল অবহেতিভো অনুষ্ঠানে আনা পাস্তোরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল তাকে। সেদিন নাদাল বলেছিলেন, ‘অবশ্যই বিষয়টি আমাকে রোমাঞ্চিত করবে। কিন্তু এটা আমার জীবনের পরিকল্পনার মধ্যে নেই।’
চলতি বছরের মে মাসেও রিয়াল মাদ্রিদের সভাপতি নির্বাচন ঘিরে আলোচনায় এসেছিল নাদালের নাম। ব্যবসায়ী এনরিকে রিকেলমের সম্ভাব্য প্রার্থিতার সঙ্গে তাঁকে জড়িয়ে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। রিকেলমের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকলেও ওই সময় এমন খবর অস্বীকার করেন নাদাল। একই সঙ্গে পেরেজের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করে জানিয়েছিলেন, আপাতত নিজের প্রকল্পগুলো নিয়েই ব্যস্ত থাকতে চান। তবে ভবিষ্যতে কী হবে, সেই সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেননি।
এদিকে, গত জুনে আবারও রিয়াল মাদ্রিদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন পেরেজ। নতুন মেয়াদে ২০৩০ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করার কথা তার। ফলে নিয়ম অনুযায়ী নাদালের সভাপতি পদে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা অর্জনের আগেই পেরেজের বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা।
