Homeঅর্থনীতিব্যবসা মন্দায় বন্ধ কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি, সংকটে পুরোনো শপিং মলগুলো

ব্যবসা মন্দায় বন্ধ কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি, সংকটে পুরোনো শপিং মলগুলো

ঢাকার যে বাসিন্দাদের বয়স এখন ত্রিশের কোঠায়, তাদের অনেকেরই কাকরাইলের কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি শপিং কমপ্লেক্সে কেনাকাটার স্মৃতি আছে। একসময় নানা আয়ের মানুষের কাছে জনপ্রিয় ছিল এই বিপণিবিতান।

১৯৯৮ সালে চালু হওয়া কমপ্লেক্সটি গত ১ অক্টোবর বন্ধ হয়ে যায়। বছরের পর বছর ধরে সেখানে ব্যবসায় মন্দা চলছিল। মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, বন্ধ হওয়ার আগে ১৯৮টি দোকানের মধ্যে চালু ছিল মাত্র ২৫টি।

ক্রেতাদের কেনাকাটার অভ্যাস বদলে যাওয়া, প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়া এবং বিক্রি কমে যাওয়ায় ঢাকার পুরোনো মার্কেটগুলো সংকটে পড়েছে। কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি বন্ধ হয়ে যাওয়া সেই সংকটেরই উদাহরণ।

ক্রেতা কমে যাওয়া ও দীর্ঘস্থায়ী ব্যবসায়িক মন্দার কারণে রাজধানীর আরও অন্তত ১০টি পুরোনো শপিং কমপ্লেক্স বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে।

কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির মালিকেরা ভবনটি বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ভবিষ্যতে সেখানে হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার কিংবা অফিস করার সম্ভাবনা রয়েছে।

এ পরিস্থিতি প্রশ্ন তুলেছে, অন্য প্রতিষ্ঠিত শপিং কমপ্লেক্সগুলো পরিবর্তিত বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে টিকে থাকতে পারবে কি না।

জমজমাট বিপণিবিতান বন্ধ

কর্ণফুলী গ্রুপ নির্মিত এই কমপ্লেক্সটি ২০তলা ভবনের বেজমেন্ট ও প্রথম চারটি তলায় অবস্থিত ছিল। এর ওপরের তলাগুলোতে আবাসিক ফ্ল্যাট। কমপ্লেক্সের দোকানগুলোতে তৈরি পোশাক, জুতা, প্রসাধনী, গয়না ও অন্যান্য পণ্য বিক্রি হতো। সেখানে একটি ফুড কোর্টও ছিল।

কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি দোকান মালিক সমিতির সভাপতি এ কে এম ইকবাল দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘মালিকরা সর্বসম্মতিক্রমে এটি বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এখানে হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, টেলিভিশন সেন্টার কিংবা অন্য কোনো অফিস হতে পারে।’

মূল কমপ্লেক্সটি বন্ধ হয়ে গেলেও প্রবেশপথের কাছে হাতে গোনা কয়েকটি দোকান চালু রয়েছে। এসব দোকানের ভাড়া দিয়ে নিরাপত্তাকর্মী ও ম্যানেজারের বেতনসহ জরুরি খরচ মেটানো হচ্ছে।

অনেক সময় এসব ব্যয় বহনের জন্য মালিকদের ঋণও নিতে হচ্ছে বলে জানান ইকবাল।

কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, কমপ্লেক্সটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ওপরের তলাগুলোর আবাসিক ফ্ল্যাটগুলোতে কোনো প্রভাব পড়েনি।

এই শপিং কমপ্লেক্সের কাছেই শান্তিনগরের কনকর্ড টুইন টাওয়ারও সংকটে রয়েছে। কমপ্লেক্সটি বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে খবর প্রকাশিত হলেও পরে মালিকরা সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন।

কনকর্ড টুইন টাওয়ার মালিক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক সৈয়দ শরীফ উদ্দিন জানান, কমপ্লেক্সটি বন্ধ করার কোনো পরিকল্পনা নেই।

তিনি বলেন, ‘আমাদের ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না। কিন্তু, কমপ্লেক্স বন্ধ করার কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। আমরা ক্রেতা টানার চেষ্টা করছি।’

কেনাকাটার অভ্যাসে পরিবর্তন

ইকবাল বলেন, নতুন শপিং মল, ব্র্যান্ডের আউটলেট এবং অনলাইন কেনাকাটার কারণে ঢাকার খুচরা বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ফলে ক্রেতাদের সামনে এখন পছন্দের সুযোগও বেড়েছে।

তিনি বলেন, ‘ক্রেতারা এখন বিভিন্ন দোকান ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পণ্যের দাম ও মান তুলনা করতে পারেন। তাদের সবসময় শপিং কমপ্লেক্সে যেতে হয় না।’

তিনি আরও বলেন, ক্রেতা সমাগম কমে যাওয়ায় দোকানমালিকদের ভাড়া, সার্ভিস চার্জ, কর্মীদের বেতন ও বিদ্যুৎ বিলের মতো খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, প্রায় দুই থেকে আড়াই বছর ধরে মার্কেটগুলোতে তীব্র মন্দা চলছে। অনেক দোকানদার তিন থেকে পাঁচদিন পর্যন্ত কোনো পণ্য বিক্রি করতে না পেরে বসে থাকেন। অনেককে কর্মীদের বেতন দিতে হচ্ছে মূলধন ভেঙে। লাভ ছাড়া পণ্য বিক্রি করেও অনেকে টিকে থাকার লড়াই করছেন।

পরিস্থিতি না বদলালে আগামী দু-তিন মাসের মধ্যে আরও দু-তিনটি মার্কেট বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেন হেলাল উদ্দিন। প্রায় ৩০০টি করে দোকান রয়েছে এমন দুটি মার্কেটের প্রতিনিধিরা সম্প্রতি তাকে জানিয়েছেন, তাদের পক্ষে আর ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি বলেন, করোনা মহামারির সময়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের কাছ থেকে তেমন কোনো সহায়তা পায়নি।

এসব মার্কেট বন্ধ হয়ে গেলে শত শত কোটি টাকার বিনিয়োগ হারাতে পারে এবং হাজারো কর্মী বেকার হয়ে পড়তে পারেন। তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগও সীমিত বলে সতর্ক করেন তিনি।

কর্ণফুলী মার্কেটের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, চারতলা বাণিজ্যিক কেন্দ্রটিতে প্রায় ৩ হাজার কর্মী কাজ করতেন। কেনাকাটার পরিবেশ ও প্রতিযোগিতামূলক দামের কারণে মার্কেটটি ক্রেতা টানতে পারছে না।

সমিতি আরও জানিয়েছে, রামপুরায় টেলিভিশন সেন্টারের বিপরীতে মোল্লা টাওয়ার ও মগবাজারের বিশাল সেন্টারও সংকটে রয়েছে। ঢাকার আরও ১০ থেকে ১২টি শপিং সেন্টার বন্ধ হয়ে যাওয়ার বড় ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সমিতির ধারণা। তবে সেগুলোর নাম প্রকাশ করতে তারা রাজি হয়নি।

RELATED ARTICLES

Most Popular