চার নেতাকে কারাগারে হত্যার অনুমতি আগেই দেওয়া হয়েছিল। নির্দেশ এসেছিল রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে। ঘাতকরা শুধু গুলি চালানোর অপেক্ষায় ছিলেন। উদ্দেশ্যও স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
বাংলাদেশের ইতিহাসের চার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে শেষ করাই তাদের লক্ষ্য ছিল। আর এর জন্য নির্ধারণ করা হয়েছিল রাষ্ট্রের সবচেয়ে সুরক্ষিত প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি—ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার।
ঘৃণ্য এই ষড়যন্ত্রের শিকার হন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামান।
মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে কঠিন সময়ে এই নেতারাই বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ১৯৭১ সালে প্রবাসী সরকার পরিচালনা থেকে শুরু করে স্বাধীনতাসংগ্রাম এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ভোররাতে কারাগারের ভেতরে ঘটে এই জাতীয় ট্র্যাজেডি। তবে এটি কোনো বিচ্ছিন্ন সহিংস ঘটনা ছিল না।
একই বছরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর সেনাবাহিনীর ভেতরে তীব্র ক্ষমতার লড়াই শুরু হয়েছিল। এরই মধ্যে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে।
ওই সময় সেনাবাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা বঙ্গভবন নিয়ন্ত্রণে নেওয়া বঙ্গবন্ধুর স্বঘোষিত খুনিদের চ্যালেঞ্জ জানাতে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। ঠিক তখনই কারাগারের ভেতরে চলছিল আরেক ষড়যন্ত্রের প্রস্তুতি।
সেই সময় সামরিক শাসনামলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দুর্নীতির অভিযোগে কারাবন্দি ছিলেন মুজিবনগর সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, অর্থমন্ত্রী এম মনসুর আলী এবং স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসনমন্ত্রী এ এইচ এম কামারুজ্জামান।
২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় দেওয়া হয়। সেখানে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর রাতের ঘটনাপ্রবাহের বিস্তারিত বিবরণ উঠে এসেছে।
রায় অনুযায়ী, ওই দিন রাত আনুমানিক ৩টার দিকে ঘটনার সূত্রপাত।
তৎকালীন কারা মহাপরিদর্শক নুরুজ্জামান হাওলাদার বঙ্গভবন থেকে সেনাসদস্যদের কয়েকটি ফোন পান। তাকে বলা হয়, সশস্ত্র ব্যক্তিরা কারাগারে ঢুকে কয়েকজন বন্দিকে জোর করে নিয়ে যেতে পারে। তাকে দ্রুত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে যেতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
নুরুজ্জামান বিষয়টি তৎকালীন কারা উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) কাজী আবদুল আউয়ালকে জানান এবং তাকেও দ্রুত কারাগারে যেতে বলেন। তিনিও সেখানে ছুটে যান।
কারাগারে পৌঁছে নুরুজ্জামান ও আবদুল আউয়াল ডিআইজি কার্যালয়ে বসেন। এ সময়ও কারা মহাপরিদর্শকের কাছে একের পর এক ফোন আসছিল।
রায়ে বলা হয়, কিছুক্ষণ পর ক্যাপ্টেন মোসলেম উদ্দিন আরও চারজন সশস্ত্র সেনাসদস্যকে নিয়ে কারা ফটকে আসেন। তারা নুরুজ্জামানের খোঁজ করেন। নির্দেশ অনুযায়ী চার নেতাকে আলাদা করে রাখা হয়েছে কি না, তা জানতে চান।
নুরুজ্জামান তাদের কাছে জানতে চান, চার নেতাকে আলাদা করে রাখা হয়েছে কেন।
এর কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে সশস্ত্র ব্যক্তিরা সরাসরি জানিয়ে দেন, ওই চার নেতাকে হত্যা করা হবে।
এরপর রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদের সঙ্গে কথা বলতে চান নুরুজ্জামান।
রায়ে বলা হয়, ফোনে মোশতাক নুরুজ্জামানকে নির্দেশ দেন, সেনাবাহিনীর ওই পাঁচ সদস্য যা করতে চান, তাদের যেন তা করতে দেওয়া হয়।
এরপর সশস্ত্র ব্যক্তিরা কারাগারের ভেতরে ঢুকে চার নেতাকে লক্ষ্য করে গুলি চালান।
তবে এখানেই অভিযান শেষ হয়নি।
ফজরের নামাজের পর নুরুজ্জামান জানতে পারেন, চার নেতার মৃত্যু নিশ্চিত করতে আরও একদল সশস্ত্র সেনাসদস্য কারাগারে এসেছে। তারা দেখতে পান, দুজন তখনো বেঁচে আছেন। পরে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে তাদের হত্যা করা হয়।
বহু বছর পর অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেন লেখেন, কারাগারে চার নেতার হত্যাকাণ্ড ‘রশিদ ও মোশতাকের সম্মতি নিয়েই’ ঘটানো হয়েছিল।
‘রক্তাক্ত দিনগুলো ১৯৭৫-৮১’ বইয়ে সাখাওয়াত লিখেছেন, ২ ও ৩ নভেম্বরের পাল্টা অভ্যুত্থানের সময় গভীর রাতে পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড চালানো হয়। মোসলেমের নেতৃত্বে পুরো অভিযান পরিচালিত হয়েছিল।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, মোশতাক ও রশিদ ছাড়া কারাগারে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে আরও একজন জানতেন। তিনি হলেন মেজর জেনারেল খলিলুর রহমান।
খলিলুর রহমান বিষয়টি পুলিশের তৎকালীন মহাপরিদর্শককে জানান। রাষ্ট্রপতিকে তার সচিব মাহবুবুল আলম চাষীর মাধ্যমে খবরটি পৌঁছে দিতে বলেন। মাহবুবুল রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদকে বিষয়টি জানালে তার প্রতিক্রিয়া দেখে বুঝতে পারেন, তিনি হত্যাকাণ্ডের কথা আগেই জানতেন।
কেন, তা জানা না গেলেও খলিলুর রহমান ঘটনাটি গোপন রাখেন। সেনানিবাসের কর্মকর্তাসহ অন্য কাউকেও তিনি বিষয়টি জানাননি।
সেনাবাহিনীর তৎকালীন চিফ অব জেনারেল স্টাফ খালেদ মোশাররফ এবং ঢাকা ব্রিগেডের তৎকালীন কমান্ডার শাফায়াত জামিল যখন হত্যাকাণ্ডের খবর জানতে পারেন, ততক্ষণে রশিদ, ফারুক, ডালিম ও মোসলেম ব্যাংককের উদ্দেশে দেশ ছেড়ে চলে গেছেন।
মোসলেমের বক্তব্যও উল্লেখ করেছেন সাখাওয়াত। মোসলেমের দাবি ছিল, চার নেতাকে যেখানে রাখা হয়েছিল, ডিআইজি তাকে সেই সেলগুলোতে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি নিজেই স্টেনগান দিয়ে মুহুর্মুহু গুলি ছুড়ে বন্দি নেতাদের হত্যা করেন বলে দাবি করেন।
সাখাওয়াত লিখেছেন, এভাবেই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সম্মতিতে পরিকল্পনা অনুযায়ী বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। এতে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর ইতিহাস কলঙ্কিত হয়েছে।
১৯৭৫ সালের ৪ নভেম্বর তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। সেই কমিটি অনেকের বক্তব্য টেপে ধারণ করে। সেখান থেকে পরে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তথ্য জানা যায়।
সামরিক তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তৎকালীন লেফটেন্যান্ট কর্নেল ও পরে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি পাওয়া এ জে এম আমিনুল হক বীর উত্তমকে।
সাখাওয়াত উল্লেখ করেছেন, ওই বক্তব্যগুলোর পূর্ণাঙ্গ বিবরণ কখনোই জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি।
১৯৭৫ সালের ৪ নভেম্বর তৎকালীন কারা উপমহাপরিদর্শক কাজী আবদুল আউয়াল লালবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।
তবে প্রায় ২১ বছর দায়মুক্তি অধ্যাদেশের কারণে এ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত বা বিচার করা সম্ভব হয়নি। ১৯৯৬ সালে ওই অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ার পর একই বছরের ১৮ আগস্ট পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) নতুন করে মামলার তদন্ত শুরু করে।
অবশেষে ২০০৪ সালে ঢাকার একটি আদালত এ মামলার রায় দেন। হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার দায়ে ১১ জনকে দোষী সাব্যস্ত করে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়।
পরে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পর্যবেক্ষণে বলেন, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের জড়িত থাকার মধ্য দিয়ে বৃহত্তর একটি অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছিল।
২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখেন। এতে মোসলেম উদ্দিন, মারফত আলী শাহ ও আবুল হাশেম মৃধার মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে।
এছাড়া খন্দকার আবদুর রশিদ, শরিফুল হক ডালিম, নূর চৌধুরী, রাশেদ চৌধুরী, আহমেদ শরিফুল হোসেন, আব্দুল মাজেদ, কিসমত হাশেম ও নাজমুল হোসেনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখা হয়।
