Homeসারাদেশ‘স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যম নিশ্চিতে অভিন্ন আচরণবিধি জরুরি’

‘স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যম নিশ্চিতে অভিন্ন আচরণবিধি জরুরি’

স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যম ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সাংবাদিকতা পেশার জন্য অভিন্ন আচরণবিধি প্রণয়ন জরুরি এবং এ আচরণবিধি সরকারের তরফে চাপিয়ে না দিয়ে বরং সাংবাদিকতা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগেই প্রণীত হতে হবে বলে দাবি জানিয়েছেন গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা।

তাদের মতে, সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব সম্পাদকীয় নীতিমালা, ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি এবং পাঠক-দর্শকের জন্য কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা এ ধরনের আচরণবিধির ভিত্তি হতে পারে।

তারা আরও বলেন, স্বাধীনতা ও জবাবদিহির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের পেশাগত ও নৈতিক মান নিশ্চিত করা গেলে পাঠক-দর্শকের আস্থা ফিরিয়ে আনা সহজ হবে।

আচরণবিধি প্রণয়নের পাশাপাশি গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নকেও জরুরি অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে এগিয়ে নেওয়ার তাগিদ দেন তারা।

তাদের মতে, সম্পাদকীয় স্বাধীনতা রক্ষা, সাংবাদিকদের আর্থিক ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারে দেরি না করে সামগ্রিক কাঠামোগত সংস্কার শুরু করা জরুরি।

বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের পেশাগত ও নৈতিক মানোন্নয়ন এবং কার্যকর স্ব-নিয়ন্ত্রণের একটি বাস্তবসম্মত কাঠামো যাচাইয়ের লক্ষ্যে ধারাবাহিক আলোচনার অংশ হিসেবে আজ রোববার রংপুরে মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই) আয়োজিত বিভাগীয় মতবিনিময় সভায় এসব বিষয় উঠে আসে।

খুলনা, বরিশাল, সিলেট ও চট্টগ্রামের পর এটি এমআরডিআইয়ের বিভাগীয় মতবিনিময় সভার পঞ্চম আয়োজন, যা হাইকমিশন অব কানাডা ইন বাংলাদেশের অর্থায়নে কানাডা ফান্ড ফর লোকাল ইনিশিয়েটিভসের (সিএফএলআই) আওতায় বাস্তবায়িত হচ্ছে।

এমআরডিআইয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সভায় রংপুর ও বিভাগের অন্যান্য জেলা থেকে সংবাদমাধ্যমের মালিক ও প্রকাশক, সম্পাদক, সংবাদ সিদ্ধান্তগ্রহীতা, সাংবাদিক সংগঠনের নেতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

সভায় এমআরডিআইয়ের নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান বলেন, ‘স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যত কার্যকর হবে, সংবাদমাধ্যমে বাইরের হস্তক্ষেপের সুযোগ তত কমবে।’

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সুরক্ষায় নিজস্ব জবাবদিহির ব্যবস্থা শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ‘সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা তার প্রতি পাঠক-দর্শকের আস্থার ওপর নির্ভরশীল। যতক্ষণ সংবাদমাধ্যমের ওপর পাঠক, শ্রোতা ও দর্শকের আস্থা থাকবে, ততক্ষণ সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারবে। এই আস্থা ধরে রাখতে সংবাদমাধ্যমগুলোকে নিজেদের জবাবদিহির ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।’

তিনি সাংবাদিকদের পাশাপাশি সম্পাদক ও মালিকদের জন্য পৃথক আচরণবিধি প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেন।

সংবাদমাধ্যম সংস্কারে এমআরডিআইয়ের পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কর্মপরিকল্পনার (২০২৫-২০৩০) অংশ হিসেবে স্ব-নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অ্যাডভোকেসি কার্যক্রম চলমান থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

সভায় গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে নীতিগত আলোচনা হয়। অংশগ্রহণকারীরা বলেন, সুপারিশগুলো দেশের সাংবাদিক, সম্পাদক, মালিক ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে প্রণীত হওয়ায় এগুলো বাস্তবায়নে স্বচ্ছ, সমন্বিত ও সময়োপযোগী উদ্যোগ প্রয়োজন।

অংশগ্রহণকারীরা বলেন, সংস্কার এখন আর ভবিষ্যতের কোনো বিষয় নয়, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এটিকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন। সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ও দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান নির্ধারণ করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের মাধ্যমে সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার তাগিদ দেন তারা।

তাদের মতে, আইন, নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় সামগ্রিক সংস্কারই সম্পাদকীয় স্বাধীনতা রক্ষা, সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং জনআস্থা পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখতে পারে। একইসঙ্গে সংস্কারের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে ধারাবাহিক সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তারা তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান ও দ্য ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ বলেন, ‘গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো সাংবাদিক, মালিক, সম্পাদকসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে প্রণীত হয়েছে। বিভিন্ন পক্ষের কাছ থেকেই এসব সুপারিশের প্রতি সমর্থন এসেছে। তাই এগুলো বাস্তবায়নে সরকারের দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সরকার যদি এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন না করে, তাহলে কেন করছে না এবং কোথায় বাধা রয়েছে, তা স্পষ্ট করা উচিত।’

তিনি বলেন, ‘সাংবাদিকতা পেশার জন্য একটি অভিন্ন আচরণবিধি থাকা প্রয়োজন। তবে সেটি সরকারের চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়, বরং সাংবাদিক, সম্পাদক ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগে প্রণয়ন করা উচিত। একইসঙ্গে এই আচরণবিধি কার্যকর করতে জবাবদিহি ও প্রতিকারের ব্যবস্থা থাকতে হবে। অন্যথায় শুধু আচরণবিধি প্রণয়ন করে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাবে না।’

অংশগ্রহণকারীরা একমত হন, টেকসই স্ব-নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার, মালিকপক্ষ, বিজ্ঞাপনদাতা ও রাজনৈতিক পক্ষের চাপ প্রতিরোধে সক্ষম শক্তিশালী ও স্বাধীন সম্পাদকীয় নীতিমালা এবং কার্যকর জবাবদিহির ব্যবস্থা প্রয়োজন।

গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য এবং যমুনা টিভির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিম আহমেদ সাংবাদিকতার মানোন্নয়নে সংবাদমাধ্যমগুলোর নিজস্ব দায়িত্বের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, ‘একজন ভালো সাংবাদিক সরকার কিংবা মালিক তৈরি করে দেবে না, সেটা সম্পাদক, নিউজরুমের দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও সাংবাদিকদেরই তৈরি করতে হবে। আমরা সবসময় সরকার ও মালিকের সীমাবদ্ধতা নিয়ে কথা বলি, কিন্তু নিজেদের উন্নয়নে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি কি না, সেটিও ভাবতে হবে।’

স্বনিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘সম্পাদকীয় স্বাধীনতার সুরক্ষা, ভুলের সংশোধন নিশ্চিত করা, দর্শক-পাঠকের অভিযোগের প্রতিকার করা এবং পেশাগত মান উন্নত করার দায়িত্ব সংবাদমাধ্যমগুলোকেই নিতে হবে। এসব উদ্যোগের জন্য সবসময় বাইরের কারও ওপর নির্ভর করতে হয় না।’

সাংবাদিকদের কর্মপরিবেশ নিয়েও আলোচনা হয় সভায়। অংশগ্রহণকারীরা বলেন, নৈতিক সাংবাদিকতাকে আর্থিক ও পেশাগত নিরাপত্তা থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। এ জন্য সংবাদমাধ্যমের মালিকপক্ষের প্রতি সময়মতো বেতন দেওয়া, আনুষ্ঠানিক নিয়োগপত্র, আইনানুগ সুযোগ-সুবিধা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তারা।

জাতীয় পর্যায়ে সংস্কার ও স্ব-নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনা ও নীতিগত উদ্যোগে ঢাকার বাইরের সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন অংশগ্রহণকারীরা।

তাদের মতে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সংবাদমাধ্যমের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই সংস্কার ও স্ব-নিয়ন্ত্রণের একটি কার্যকর, বাস্তবসম্মত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে।

আলোচনায় আরও অংশ নেন মমতাজ শিরীন ভরসা, প্রকাশক ও সম্পাদক, দৈনিক যুগের আলো; আব্দুল বারী তোতা, সম্পাদক, দৈনিক প্রথম খবর; খন্দকার মোস্তফা সরওয়ার, সম্পাদক, দৈনিক দাবানল; মাহবুব রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক, আমাদের প্রতিদিন; তাজিদুল ইসলাম লাল, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, দৈনিক বায়ান্নর আলো; সুশান্ত ভৌমিক, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, দৈনিক মায়াবাজার; মোনাব্বর হোসেন মনা, সম্পাদক, আগামীর সন্ধানে; লিয়াকত আলী বাদল, সম্পাদক, আরএনবি নিউজ; স্বপন চৌধুরী, সভাপতি, রংপুর সিটি প্রেসক্লাব; মাহফুজ আলম প্রিন্স, সভাপতি, রংপুর রিপোর্টার্স ইউনিটি; সালেকুজ্জামান সালেক, সভাপতি, রংপুর সাংবাদিক ইউনিয়ন; সারথী রানী সাহা, নির্বাহী পরিচালক, সীড; তাবিউর রহমান প্রধান, বিভাগীয় প্রধান, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়; ড. মো: নজরুল ইসলাম, ডিন, সমাজ বিজ্ঞান অনুষদ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়; ড. এস. এম. শফিকুল ইসলাম কানু, সম্পাদক ও প্রকাশক, লালমনিরহাট বার্তা; চিত্ত ঘোষ, সম্পাদক, আজকের দেশ বার্তা; আমিনুল হক, সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক আলাপন; মো. শীষ রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক নীলফামারী বার্তা; কে এম রেজাউল হক, সম্পাদক, দৈনিক মাধুকর; প্রবীর চক্রবর্তী, নির্বাহী পরিচালক, অবলম্বন; এবং ভুবন চন্দ্র রায়, নির্বাহী পরিচালক, উদয়াঙ্কুর সেবা সংস্থা।

RELATED ARTICLES

Most Popular