মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চলমান বিক্ষোভের মধ্যে শিল্পাঞ্চল সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, সড়ক অবরোধ ও পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
আজ বুধবার সকাল থেকেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বিভিন্ন এলাকা। বিক্ষোভ-সংঘর্ষে দুপুরের আগেই শতাধিক পোশাক কারখানা বন্ধ ঘোষণা করে মালিকপক্ষ।
আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ মমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, শ্রমিকরা সকালেই কারখানা থেকে বের হয়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। দুপুর পর্যন্ত চেষ্টা করে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
হেমায়েতপুরে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, অবরোধ
পদ্মার মোড় এলাকায় অবস্থিত কারখানার শ্রমিকরা সকালে হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক ও হেমায়েতপুর-সিংগাইর সড়ক অবরোধ এবং টায়ার ও আবর্জনা জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন। তাদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে।
এ সময় পুলিশের সঙ্গে পোশাকশ্রমিকদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়।
একদল লোক সকাল ৯টার দিকে সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলমের ওপর হামলা চালান। তার ব্যবহৃত গাড়িতেও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
সংবাদকর্মী ও পথচারী আহত
সংবাদ সংগ্রহে পদ্মার মোড় এলাকায় যান স্টার নিউজের প্রতিনিধি আহমাদ সোহান সিরাজী, একাত্তর টিভির রাইয়ান বিন আমিন ও একাত্তর টিভির ক্যামেরাপারসন মো. উজ্জ্বল হোসেন। একদল লোক তাদের ওপর হামলা চালায়।
একই এলাকায় দুপুর ১২টার দিকে লাইভ করার সময় মারধরে আহত হন সাভার প্রেসক্লাবের সভাপতি ও নিউজ টোয়েন্টিফোরের সাভার প্রতিনিধি নাজমুল হুদা।
নাজমুল দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘লাঠি হাতে তেড়ে এসে আমাকে মারধর এবং ক্যামেরা ভাঙচুর করা হয়। পরে আন্দোলনকারীদের একটি অংশের সহযোগিতায় আমি ঘটনাস্থল থেকে সরে আসি।’
হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় শ্রমিকদের সংঘর্ষ শুরু হলে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে। এ সময় এক পথচারী আহত হন।
আহত মহিকুল ঢাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালান। থাকেন সাভারের গেন্ডা এলাকায়। বিস্ফোরণে তার পায়ে ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম হয়।
মহিকুল ডেইলি স্টারকে জানান, ‘বাসে ঢাকায় গ্যারেজে যাচ্ছিলাম। আন্দোলনের কারণে উলাইল এলাকায় সব যাত্রীদের বাস থেকে নামিয়ে দেয়। এরপর ভেঙে ভেঙে রওনা হই।’
‘হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পুলিশ ও শ্রমিকদের সংঘর্ষ চলছিল। হেঁটে বাসস্ট্যান্ড এলাকা পার হওয়ার সময় বিকট শব্দ শুনতে পাই, এরপর মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। কয়েকজন পথচারী আমাকে একটি অটোরিকশায় তুলে দেয়। এরপর সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসি,’ বলেন তিনি।
জানতে চাইলে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) আলমগীর হোসেন ডেইলি স্টারকে বলেন, মহিকুল ইসলামের পায়ের দুটি আঙ্গুল গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া হাতে ও পায়ে ক্ষত হয়েছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে সেখানে সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) শামীমা পারভীন ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘সকালে পদ্মার মোড় এলাকায় একসঙ্গে ৩০-৪০ হাজার শ্রমিক দুই দিক থেকে পুলিশের ওপর হামলা করে। আমরা সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারগ্যাস ইউজ করেছি। এখন পরিস্থিতি ভালো আছে।’
তিনি জানান, ঘটনাস্থল থেকে একটি ককটেলসহ একজনকে আটক করা হয়েছে। পোশাকশ্রমিকরাই তাকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়৷
আশুলিয়ায় শ্রমিক-পুলিশ ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া
শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর, নরসিংহপুর ও ঘোষবাগ এলাকায় সকাল ১১টার দিকে অধিকাংশ কারখানা থেকে শ্রমিকরা বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর সড়কে নেমে আসেন।
আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘নিশ্চিন্তপুরে সড়ক ছেড়ে দিতে বলায় শ্রমিকেরা পুলিশের ওপর চড়াও হন। এ সময় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।’
‘তৃতীয় পক্ষের উসকানি’র অভিযোগ
শ্রমিকদের উসকানি দিয়ে তৃতীয় পক্ষের কিছু লোক পরিস্থিতি জটিল করছে বলে দাবি করেছেন ঢাকা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলাম।
এদিন দুপুরে হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ইতোমধ্যে বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্যে উঠে এসেছে কারা এসব ঘটনার মাস্টারমাইন্ড, কারা ম্যানিপুলেট করছে, তাদের একটি তালিকাও আমরা তৈরি করেছি। অনেককে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।
তিনি জানান, ৩০ জনের বেশি গ্রেপ্তার আছেন, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, সাভার ও আশুলিয়ায় আজ তিন প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
