Homeসারাদেশ‘বৃহস্পতিবার রাতে যাবে, শনিবার রাতে ফিরবে—এই কথাই তো ছিল’

‘বৃহস্পতিবার রাতে যাবে, শনিবার রাতে ফিরবে—এই কথাই তো ছিল’

বৃহস্পতিবার যে মোবাইল ফোনের ওপার থেকে ভেসে এসেছিল সাগর পাড়ে বেড়ানোর উচ্ছ্বাস, আজ সেই একই ফোনের বন্ধ স্ক্রিনেই আটকে আছে বুকফাটা কান্নার শোক।

সাতক্ষীরা শহরের কাছারিপাড়ায় শহীদ রীমু সরণির আব্দুল মতিন ও রেহানা খাতুন দম্পতির দুই মেয়ের মধ্যে আফসানা মতিন তানজি ছোট।

শনিবার সকালে কক্সবাজারের ইনানীর পাটুয়ারটেকে টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লাগে। সেখানে ছিলেন আফসানা মতিন তানজি (৩৮) ও নাহিদুর রহমান তুহিন (৪১) দম্পতি এবং তাদের দুই মেয়ে রুজাইনা ইনায়া (৭) ও সুনাইনা ইহানা (৩)।

আজ রোববার কান্নাজড়িত কণ্ঠে আব্দুল মতিন বলেন, ‘বৃহস্পতিবার ওরা কল করল। আমার জামাই তুহিন চাকরির সুবাদে কক্সবাজার যাবে। বলেছিল, “ছোট দুটো বাচ্চা নিয়ে ওদের মা আফসানা একা থাকবে কেন, আমার সঙ্গেই চলুক।” বৃহস্পতিবার রাতে যাবে, শনিবার রাতে ফিরবে—এই কথাই তো ছিল।’

শুক্রবার রাতের স্মৃতি স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘রাতে আমার মোবাইলে আফসানা কল করেছিল। বলল, “খুব ভালো জায়গা, এক দিকে সমুদ্র দেখা যাচ্ছে আরেক দিকে পাহাড়। আমরা ভালো আছি, কোনো অসুবিধা নেই।” পরদিন সকাল সাড়ে ৭টা-৮টার দিকে আমি কয়েকবার ফোন করি। ওদের কাছে দুই-তিনটি ফোন আছে, কিন্তু কোনো ফোনেই রিং হয়নি।’

এরপরই টেলিভিশনে আগুন লাগার খবর দেখতে পান মতিন। বিভিন্ন চ্যানেলের লাইভ সম্প্রচার দেখে বুঝতে পারেন, ঠিক যে রিসোর্টটির কথা তার মেয়ে ও জামাই ফোনে বলেছিল, আগুন সেটিকেই গ্রাস করে নিয়েছে।

তুহিন যশোরের মনিরামপুর উপজেলার হাসপাতাল মোড়সংলগ্ন মহনপুর এলাকার মতিয়ার রহমানের ছেলে।

রাজধানীর শ্যামলীতে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেডে চাকরি করতেন তিনি। স্ত্রী আফসানা ও দুই মেয়েকে নিয়ে থাকতেন মিরপুরে।

তুহিনের চাচাতো ভাই মনিরামপুর হাসপাতাল মোড়ের ওষুধ ব্যবসায়ী রিয়াজ উদ্দিন জানান, শুক্রবার স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে ইনানীর টুপটুপ রিসোর্টে ওঠেন তুহিন।

রিয়াজ আরও জানান, শনিবার সকালে রিসোর্টে আগুন লাগার খবর পেয়ে স্বজনরা আফসানার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু তার মোবাইলও বন্ধ পাওয়া যায়।

তুহিনের বড় ভাই জাহিদুর রহমান প্রিন্স আজ সকালে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হন। তিনি বলেন, ‘তুহিন, তার স্ত্রী ও দুই মেয়ে বেঁচে আছে কি না, তা এখনো আমরা জানি না।’

গতকাল সকাল সাড়ে ৬টার দিকে টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে ১০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে মরদেহগুলো পুড়ে যাওয়ায় এখনো তাদের পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেছিলেন, সবার নাম-পরিচয় সংগ্রহ করা হয়েছে। উদ্ধার করা মরদেহগুলোর ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। স্বজনদের নমুনার সঙ্গে মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর মরদেহগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

ফায়ার সার্ভিস জানায়, ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় চার মাস আগে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে আনুষ্ঠানিকভাবে সতর্ক করা হয়েছিল। এর অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স ছিল না।

জুন মাসে ফায়ার সার্ভিসের এক পরিদর্শক রিসোর্টটি পরিদর্শন করেন এবং ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে ১১ জুন আনুষ্ঠানিক নোটিশ দেন।

এ ঘটনায় রিসোর্ট মালিক ও ব্যবস্থাপকসহ চার জনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাত আরও ১৯ জনকে আসামি করে মামলা করেছে পুলিশ। আজ সকালে উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার দ্য ডেইলি স্টারকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

RELATED ARTICLES

Most Popular