একটা সময় পাকিস্তানের ক্রিকেটে তার জায়গাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। পারফরম্যান্সের অবনতি, দল থেকে বাদ পড়া আর সমালোচনার চাপে হারিয়ে যেতে বসেছিলেন শাদাব খান। সেই শাদাবই এবার এমন এক ইনিংস খেললেন, যা শুধু তাকে নয়, নতুন করে আশা দেখাতে পারে পাকিস্তানের আরও কয়েকজন অভিজ্ঞ ক্রিকেটারকে।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১৫৪ রানে ৯ উইকেট হারানোর পরও দলকে অবিশ্বাস্য জয় এনে দিয়েছেন এই অলরাউন্ডার। তার এই ইনিংস যেন মনে করিয়ে দিল, ফুরিয়ে গেছেন বলে যাদের ধরে নেওয়া হচ্ছে, তাদেরও এখনও অনেক কিছু দেওয়ার বাকি থাকতে পারে।
রোববার লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজে ইংল্যান্ডকে ১ উইকেটে হারিয়েছে পাকিস্তান। ২৪২ রানের লক্ষ্য তাড়ায় ৩৪তম ওভারে ১৫৪ রানে নবম উইকেট হারিয়ে যখন পরাজয়ের অপেক্ষায় স্বাগতিকরা, তখনই অবিশ্বাস্য প্রতিরোধ গড়েন শাদাব ও হারিস রউফ। শেষ উইকেটে অবিচ্ছিন্ন ৮৯ রানের জুটি গড়ে ১৭ বল হাতে রেখেই দলকে জেতান তারা।
এই জুটিতে শাদাব একাই করেন ৮১ রান। শেষ পর্যন্ত ৯৬ বলে ১৩ চার ও ৫ ছক্কায় ১১৩ রানে অপরাজিত থাকেন তিনি। ওয়ানডে ক্যারিয়ারে এটিই তার প্রথম সেঞ্চুরি। অন্যদিকে ১৯ বল খেলে ৭ রানে অপরাজিত থেকে গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গ দেন রউফ।
শাদাবের ইনিংসটি রেকর্ডের পাতাতেও জায়গা করে নিয়েছে। ওয়ানডে ইতিহাসে আট নম্বর কিংবা তার নিচে ব্যাট করতে নেমে সর্বোচ্চ রানের ইনিংস এখন তার। একই সঙ্গে ওয়ানডেতে সফল রান তাড়ায় শেষ উইকেটে সর্বোচ্চ রানের জুটিও গড়েছেন শাদাব ও রউফ।
তবে পাকিস্তানের জন্য এই ইনিংসের গুরুত্ব শুধুই একটি ম্যাচ জয় কিংবা কিছু রেকর্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনার মধ্যে থাকা অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের জন্যও এটি হয়ে উঠতে পারে ঘুরে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা।
গত কয়েক বছরে পাকিস্তানের ক্রিকেটে অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের ওপর চাপ ক্রমেই বেড়েছে। বাবর আজম, মোহাম্মদ রিজওয়ান, ফখর জামান, শাহিন শাহ আফ্রিদি, হারিস রউফ কিংবা শাদাব কেউই সমালোচনার বাইরে ছিলেন না। কখনো ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স, কখনো দলের ব্যর্থতা, আবার কখনো বোর্ডের সিদ্ধান্ত তাদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে।
২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সর্বশেষ ম্যাচ পর্যন্ত ২৯ ওয়ানডেতে বাবরের ব্যাটিং গড় ৩৭.৯২। সমানসংখ্যক ম্যাচে রিজওয়ানের গড় ৪২.৪২। ফখর জামান ১৩ ম্যাচে রান করেছেন ৩০.৩৮ গড়ে। তাদের সামর্থ্যের তুলনায় এই পরিসংখ্যান প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।
বোলারদের পারফরম্যান্স অবশ্য তুলনামূলক ভালো। একই সময়ে ২৭ ওয়ানডেতে শাহিন নিয়েছেন ৪৯ উইকেট, গড় ২৫। হারিস রউফ ২৫ ম্যাচে পেয়েছেন ৪৩ উইকেট, গড় ২৪.৭২। কিন্তু ব্যক্তিগত কিছু সাফল্য দলগত পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে পারেনি।
এই সময়ে পাকিস্তান ৩৫টি ওয়ানডের মধ্যে জিতেছে ২০টি, হেরেছে ১৫টিতে। তবে জয়গুলোর অনেকগুলো এসেছে তুলনামূলক কম শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে। বড় মঞ্চে প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতা তাই সমালোচনাকে আরও বাড়িয়েছে।
পাকিস্তানের সর্বশেষ আইসিসি শিরোপা ২০১৭ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতেছিল ২০০৯ সালে, আর ওয়ানডে বিশ্বকাপের শিরোপা এসেছিল সেই ১৯৯২ সালে। এরপর বিভিন্ন সময়ে প্রতিভাবান ক্রিকেটার উঠে এলেও বড় আসরে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পায়নি দলটি।
সেই হতাশার প্রভাব পড়েছে অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের ওপর। পারফরম্যান্স খারাপ হলেই তাদের বাদ দেওয়ার দাবি উঠেছে। বোর্ডও বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তনের পথে হেঁটেছে।
চলতি বছরের শুরুতে বাংলাদেশের বিপক্ষে তিন ম্যাচের সিরিজের আগে বাদ পড়েছিলেন বাবর। ওই সিরিজের পর দল থেকে জায়গা হারান রিজওয়ানও। অন্যদিকে ২০২৩ বিশ্বকাপের পর দীর্ঘদিন ওয়ানডে দলের বাইরে থাকা শাদাবকে ফেরানো হয় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঘরের মাঠের সিরিজে।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল চলমান ত্রিদেশীয় সিরিজে শাদাবের প্রথম সুযোগ। আর সেই সুযোগেই ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা ইনিংস খেললেন তিনি।
শাদাবের ক্যারিয়ার জুড়েও সমালোচনা কম হয়নি। পাকিস্তানের সাবেক কিংবদন্তি অফ স্পিনার সাকলায়েন মুশতাকের জামাতা হওয়ায় পারফরম্যান্স খারাপ হলেই স্বজনপ্রীতির অভিযোগের মুখে পড়তে হয়েছে তাকে। একইভাবে শহীদ আফ্রিদির জামাতা শাহিনকেও নানা সময়ে এমন অভিযোগের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
অবশ্য পারিবারিক সম্পর্কের কারণে সুযোগ পেয়েছেন, এমন অভিযোগের সত্যতা শুধু সমালোচনা দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় না। কিন্তু পাকিস্তানের ক্রিকেটে এসব আলোচনা অনেক সময় ক্রিকেটারদের মাঠের পারফরম্যান্সকেও আড়াল করে দেয়।
সম্প্রতি পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের সিদ্ধান্তগুলোতেও নতুন প্রজন্মের দিকে ঝোঁকার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এশিয়ান গেমসে সাহিবজাদা ফারহানের নেতৃত্বে তুলনামূলক অনভিজ্ঞ দল পাঠানো হয়। ইংল্যান্ড সফরের টেস্ট সিরিজেও একাধিক নতুন ক্রিকেটারকে অভিষেক করানো হয়েছে।
নতুনদের সুযোগ দেওয়া অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের আর কিছু দেওয়ার নেই। শাদাবের ইনিংস যেন সেই কথাই নতুন করে মনে করিয়ে দিল।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে বাবর ও ফখর দুজনই ১০ রান করে ফিরেছেন। পাকিস্তানের ব্যাটিং বিপর্যয়ের সময় দলের অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যানরাও দায়িত্ব নিতে পারেননি। অথচ আট নম্বরে নেমে শাদাব প্রমাণ করেছেন, কঠিন পরিস্থিতিতেও ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া সম্ভব।
অন্যদিকে হারিস রউফের অবদানও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে নেমে ১৯ বল টিকে থাকার পাশাপাশি জয়সূচক চারটি এসেছে তার ব্যাট থেকেই। বোলার হিসেবে পরিচিত রউফের এই ছোট অথচ গুরুত্বপূর্ণ ইনিংসও জয়ের বড় কারণ।
এমন একটি জয় আত্মবিশ্বাস ফেরাতে পারে গোটা দলে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে যারা ফর্মহীনতা কিংবা বাদ পড়ার আশঙ্কায় ভুগছেন, তাদের জন্য শাদাবের পারফরম্যান্স একটি উদাহরণ হয়ে থাকতে পারে।
তবে একটি ইনিংস দিয়েই পাকিস্তানের সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে, এমন ভাবার সুযোগ নেই। ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্সে ধারাবাহিকতা আনার পাশাপাশি নির্বাচন ও দল পরিচালনায় স্থিতিশীলতাও প্রয়োজন।
শাদাব আপাতত নিজের কাজটা করেছেন। প্রায় হেরে যাওয়া ম্যাচ জিতিয়ে মনে করিয়ে দিয়েছেন, অভিজ্ঞতাও কখনো কখনো নতুন শুরুর পথ দেখায়। এবার দেখার বিষয়, তার এই ঘুরে দাঁড়ানো পাকিস্তানের অন্য অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের মধ্যেও নতুন আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে পারে কি না।
