Homeস্পোর্টসঅবিশ্বাস্য দুই ‘আত্মাহুতি’: একই হৃদয়, ভিন্ন রূপ

অবিশ্বাস্য দুই ‘আত্মাহুতি’: একই হৃদয়, ভিন্ন রূপ

গত মাসে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে বাংলাদেশ ‘এ’ দলের দ্বিতীয় আনঅফিসিয়াল টেস্টে অধিনায়ক ছিলেন তাওহিদ হৃদয়। পচেফস্ট্রুমে স্বাগতিকদের বিপক্ষে নিজের সেরাটা ঢেলে দিয়ে ইতিহাস গড়েন এই ব্যাটার। প্রথম শ্রেণিতে তো বটেই, অনবদ্য ট্রিপল সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে স্বীকৃত ক্রিকেটেই বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত ইনিংস খেলেন তিনি। ৪৮১ বল মোকাবিলায় ২৭টি চার ও ১০টি ছক্কায় অপরাজিত ছিলেন ঠিক ৩৫০ রান করে।

এই পরিসংখ্যানে ফুটে ওঠে, লম্বা সময় ব্যাট করার জন্য প্রয়োজনীয় ধৈর্য, মনঃসংযোগ ও নিবেদন দেখানোর সামর্থ্য হৃদয়ের রয়েছে। আরও একটি সংখ্যা এই ‘দাবি’কে আরও প্রতিষ্ঠিত করতে পারে— রেকর্ডময় ইনিংসটি খেলার ১৮০ ওভারের বেশি সময় ক্রিজে ছিলেন তিনি। মিরপুরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বাংলাদেশ জাতীয় দলের চলমান টেস্টের আগে লাল বলের ক্রিকেটে হৃদয়ের শেষ ইনিংস ছিল সেটি।

কিন্তু শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে ২৫ বছর বয়সী এই ব্যাটার দুই ইনিংসেই যেভাবে আউট হয়েছেন, তাতে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে দেখানো বীরত্বকে এখন সূদূর অতীতের কোনো কল্পনা মনে হতে পারে। এর পেছনে দায়ী— তিনি নিজেই।

ক্রিকেটে অনেক সময়ই ব্যাটারদের মনঃসংযোগ নড়ে যায়। তা অচেনা কিছু নয়। উইকেটে থিতু হওয়ার পর কিংবা স্বাচ্ছন্দ্যে খেলতে খেলতেও বাজে শটে আউট হয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখা যায়। তবে হৃদয় যা করেছেন, তা স্রেফ অবিশ্বাস্য ও ব্যাখ্যাতীত।

গত বুধবার প্রথম দিনে পায়ের পেশির চোটে স্ট্রেচারে করে মাঠ ছাড়ার আগে ব্যাট হাতে আস্থার পরিচয় দিয়েছিলেন হৃদয়। সাদমান ইসলামের সঙ্গে তার জুটিতে বাংলাদেশ পেয়েছিল স্বস্তি। বিশ্রাম দিয়ে পরদিন তিনি মাঠে নামেন সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে সাদমান বিদায় নেওয়ার পর।

ভালো ভিত পেয়ে যাওয়ায় প্রথম ইনিংসে তখন বড় পুঁজি পাওয়ার হাতছানি ছিল দলের। হৃদয়ের কাছে তাই ছিল আগের ধারা মেনে ব্যাটিং চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা। তবে সেটাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তিনি মুখোমুখি হওয়া দ্বিতীয় বলেই করেন ব্যর্থ স্লগ। স্টাম্প ছেড়ে এলোমেলো ব্যাট চালানোর খেসারত সাথে সাথে দিতে হয় তাকে। জশুয়া বিশপের নির্বিষ ডেলিভারিতে বোল্ড হয়ে সাজঘরে ফেরেন।

পরপর ২ উইকেট খুইয়ে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি স্বাগতিকরা। নামে ধস। ৫৯ রানে শেষ ৭ উইকেট হারিয়ে তিনশর বেশ নিচেই অলআউট হয়ে যায় তারা।

এমন ভুল থেকে একজন ব্যাটার শিক্ষা নেওয়ার পথে হাঁটবেন— এটাই থাকে চাওয়া। কিন্তু হৃদয় যেন ব্যতিক্রম হওয়ার বাসনায় মেতেছেন। দ্বিতীয় ইনিংসে একই কায়দায় তার আউট হওয়ার ধরন দেখে ভাষা খুঁজে পাওয়াই কঠিন।

শুক্রবার তৃতীয় দিনে হৃদয় যখন ফের ক্রিজে যান, তখন পরিস্থিতি ছিল আলাদা। ২৮ রানে ২ উইকেট হারানোর চাপ ছিল বাংলাদেশের ওপর। তা সামাল দেওয়ার বদলে আরও বাড়ানোর উপায় বেছে নেন তিনি। আবার স্লগ করে শূন্য হাতে উইকেট ছুড়ে দেওয়ার আগে টিকতে পারেন মোটে ২ বল।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের রোস্টন চেজের ঝুলিয়ে দেওয়া ডেলিভারিতে হৃদয়ের শটটি দেখে মনে হতে পারে— সামনে ছিল কঠিন কোনো সমীকরণ দ্রুত মেলানোর চাহিদা। এমন মানসিকতায় যেন ছক্কা মারতে গিয়ে তিনি মিড অনে ধরা পড়েন জেইডেন সিলসের হাতে।

তিন বছরের বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেললেও হৃদয়ের ক্যারিয়ারে কেবল দ্বিতীয় টেস্ট এটি। তবে অনভিজ্ঞতার দোহাই দিয়ে তার ‘আত্মাহুতি’কে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ দলের বিপক্ষে ওই স্মরণীয় ট্রিপল সেঞ্চুরিসহ প্রথম শ্রেণিতে চারটি করে সেঞ্চুরি ও ফিফটি রয়েছে তার। ১৮ ম্যাচ খেলে তার গড় ৫৬.০৪। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট ও টেস্ট ক্রিকেটের বাস্তবতা ভিন্ন হলেও হৃদয়ের এমন পারফরম্যান্স বিস্ময় জাগানিয়া।

প্রথম ইনিংসে ২৭ রানের গুরুত্বপূর্ণ লিড নিয়েও তৃতীয় দিন শেষে আশা-নিরাশার দোলাচলে বাংলাদেশ দল। শেরে বাংলা স্টেডিয়ামের ঘূর্ণি উইকেটে দ্বিতীয় ইনিংসে ৭৯ রান তুলতেই ৬ উইকেট হারিয়ে ফেলেছে তারা। সব মিলিয়ে লিড কেবল ১০৬ রানের। সেজন্য ব্যাটিং লাইনআপকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো গেলেও কাউকে এককভাবে চিহ্নিত করতে গেলে আঙুলটা হৃদয়ের দিকেই তাক করতে হবে।

টেস্টে বাংলাদেশের ভরসার নাম মুশফিকুর রহিম চোটে পড়ায় এই ম্যাচে সুযোগ মিলেছে হৃদয়ের। ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে থাকা মুশফিক অবসরে গেলে মিডল অর্ডারে যারা বিকল্প হতে পারে, সেই তালিকায় হৃদয়ের নাম রাখা হয় শুরুর দিকে। এমন প্রত্যাশা পূরণ হবে কি না তা তোলা থাকছে ভবিষ্যতের খাতায়। তবে হৃদয়ের আউট হওয়ার শট দুটি নিশ্চিতভাবেই সেই আশায় বড় ধাক্কা দিয়েছে।

RELATED ARTICLES

Most Popular