আত্মিক জগৎ বা স্পিরিট ওয়ার্ল্ডে বিশ্বাস অনেক ধর্ম ও আধ্যাত্মিক ধারার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ২০২৩ সালে ২৬টি দেশে পরিচালিত ইপসোস জরিপে দেখা যায়, প্রায় অর্ধেক মানুষ ভূত ও প্রেতের অস্তিত্বে বিশ্বাস করেন। যুক্তরাষ্ট্রে ২০২০ সালের ইউগভ জরিপেও প্রায় অর্ধেক আমেরিকান মনে করেন, ভূত ও প্রেত বাস্তবেই আছে।
তবে ভূত আর প্রেত, এই দুটি ধারণা অনেক সময় ভয় জাগালেও এদের মধ্যে পার্থক্য নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। প্রশ্ন হলো, ভূত ও প্রেতের মধ্যে পার্থক্য কী?
ইতিহাসের নানা সময়ে বিভিন্ন সমাজ তাদের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাস অনুযায়ী অতিপ্রাকৃত জগৎকে ব্যাখ্যা করেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, চীনা লেখক পু সং লিংয়ের সপ্তদশ শতকের বই স্ট্রেঞ্জ টেলস ফ্রম আ চাইনিজ স্টুডিও-তে যে ভয়ংকর ভূতদের দেখা যায়, তারা ইংরেজ নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়রের রচনায় থাকা ভূতদের চেয়ে একেবারেই আলাদা। অথচ দুজন লেখক প্রায় সমসাময়িক।
সাহিত্যে ভূত ও প্রেতের উপস্থিতি প্রায়ই সমাজের রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক অস্থিরতার প্রতিফলন ঘটায়।
ম্যাকঅ্যালিস্টার কলেজের ইংরেজি সাহিত্যের সহযোগী অধ্যাপক পেনিলোপে গেং এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘আমি প্রারম্ভিক আধুনিক ইংরেজি সাহিত্যের একজন গবেষক। গবেষণায় দেখা যায়, ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকের ইউরোপের সাধারণ মানুষ কীভাবে গল্পের মাধ্যমে তাদের সময়ের বড় সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছিল। এই সময়কে রেনেসাঁ বলা হয়। এটি এমন এক যুগ, যখন মুদ্রণ প্রযুক্তির মাধ্যমে গণমাধ্যমের জন্ম, উপনিবেশের বিস্তার এবং আধুনিক বিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের উত্থান ঘটেছিল।
‘এই সময়ের সাহিত্য খুঁজে দেখলে বোঝা যায়, মানুষ তখন ভূত ও প্রেত সম্পর্কে কী ভাবত এবং কীভাবে দুটিকে আলাদা করে দেখত’, লেখেন তিনি।
১৫১৭ সালের ৩১ অক্টোবর, আইন বিষয়ে পড়াশোনা করা এক সাবেক শিক্ষার্থী ও সন্ন্যাসী মার্টিন লুথার তার বিখ্যাত ‘নাইনটি-ফাইভ থিসিস’ প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি ক্যাথলিক চার্চের এমন একটি ধারণার তীব্র বিরোধিতা করেন, যেখানে বলা হতো, অর্থ দান করলে মৃত আত্মার পারগেটরিতে (মৃত্যুর পর আত্মার শুদ্ধিকরণের অন্তর্বর্তী স্থান) কাটানো সময় কমে যায়।
জার্মানির উইটেনবার্গে স্থানীয় প্রতিবাদ হিসেবে শুরু হওয়া এই ঘটনা দ্রুতই পুরো ইউরোপে ভয়াবহ ধর্মীয় সংঘর্ষে রূপ নেয়। শহরগুলো অবরুদ্ধ হয়, গ্রাম পুড়ে যায় এবং মানুষ লুণ্ঠনের শিকার হয়।
এই সময়টি ‘রিফর্মেশন’ বা ধর্মসংস্কার আন্দোলন নামে পরিচিত। এর ফলে নতুন প্রোটেস্ট্যান্ট গির্জার উদ্ভব হয়। এই নতুন ধর্মমতের একটি মূল শিক্ষা ছিল, পারগেটরি বলে কিছু নেই এবং মৃত্যুর পর আত্মারা পৃথিবীতে ফিরে আসে না। মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই আত্মার বিচার হয়। সৎ আত্মারা স্বর্গে যায়, আর পাপীরা নরকে শয়তানের সঙ্গে শাস্তি ভোগ করে।
প্রোটেস্ট্যান্টদের মতে, ভূতের ধারণা ক্যাথলিক পুরোহিতদের তৈরি একটি প্রতারণা। এর মাধ্যমে তারা মানুষকে ভয় দেখিয়ে নিজেদের প্রতি অনুগত রাখত।
উদাহরণ হিসেবে, ১৫৭২ সালে লুডভিগ লাভাটারের বই অফ গোস্টস অ্যান্ড স্পিরিটস ওয়াকিং বাই নাইট-এর ইংরেজি অনুবাদক লেখেন, ভূত আসলে ‘ভিক্ষুদের বানানো মিথ্যা, শয়তানের ছলনা কিংবা উন্মাদ কল্পনা’।
তার মতে, কেউ কোনো আত্মাকে দেখতে পেলে বুঝতে হবে, সেটি আসলে ভূত নয়, বরং ছদ্মবেশী প্রেত।
ক্রিস্টোফার মার্লোর বিখ্যাত নাটক ডক্টর ফস্টাস-এও এই বিষয়গুলো উঠে এসেছে। নাটকের একটি দৃশ্যে ফস্টাস ও তার প্রেত সঙ্গী মেফিস্টোফিলিস পোপের খাবার চুরি করে তাকে বিভ্রান্ত করে। তখন এক চরিত্র বলে ওঠে, ‘এ নিশ্চয় কোনো ভূত, আপনার পাপ মোচন চাইতে এসেছে।’
কিন্তু দর্শক জানেন, এটি কোনো ভূত নয়। বরং একজন জাদুকর ও তার প্রেত সঙ্গীর কাজ।
প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মতত্ত্বে ভূতের অস্তিত্ব অস্বীকার করা হলেও সাধারণ মানুষের কল্পনায় ভূত বেঁচে ছিল।
ইতিহাসের নথিপত্রে দেখা যায়, ধর্মীয় নেতাদের নির্দেশ অমান্য করেও সাধারণ মানুষ ভূতে বিশ্বাস রাখত। উদাহরণ হিসেবে, জ্যোতিষচিকিৎসক রিচার্ড নেপিয়ারের কেসবুকে অনেক ‘আত্মিক বিরক্তি’র ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। সেখানে ক্যাথরিন ওয়েলস নামে এক তরুণীর কথা বলা হয়েছে, যিনি টানা তিন বছর ধরে এক ‘আত্মার যন্ত্রণা’ ভোগ করেছিলেন।
সেই সময়ের জনপ্রিয় নাটকগুলোতেও মানুষের এই বিশ্বাসের প্রমাণ পাওয়া যায়। শেক্সপিয়রের হ্যামলেট নাটক শুরু হয় মধ্যরাতে প্রিন্স হ্যামলেটের বাবার আত্মার আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে। সেই আত্মা জানায়, তার হত্যাকারীকে শাস্তি দেওয়া না হওয়া পর্যন্ত সে শান্তি পাবে না।
এ ধরনের ন্যায়বিচারপ্রত্যাশী আত্মার দেখা মেলে শেক্সপিয়রের ম্যাকবেথ ও রিচার্ড থার্ড নাটকেও।
সেই সময়ের সস্তা পুস্তিকাগুলোতেও ভূতের গল্প ছাপা হতো। ১৬৬২ সালের একটি পুস্তিকা আ স্ট্রেঞ্জ অ্যান্ড ওয়ান্ডারফুল ডিসকভারি অব আ হরিড অ্যান্ড ক্রুয়েল মার্ডার-এ ইসাবেল বিনিংটন নামে এক নারী জানান, এক খুন হওয়া ব্যক্তির ভূত তার সামনে এসে নিজের মৃত্যুর গল্প শোনাতে চেয়েছিল। ভূতটি বলেছিল, ‘আমি তোমার ক্ষতি করব না, শুধু আমার গল্পটা শুনে যাও।’
১৭৩০ সালের জনপ্রিয় গান দ্য সাফোক মিরাকল-এও এক মৃত প্রেমিকের আত্মা তার প্রেয়সীর কাছে ফিরে আসে। গানে বলা হয়েছে, ‘প্রিয়তমকে দেখে মেয়েটি আনন্দে ভরে ওঠে।’
প্রোটেস্ট্যান্টরা ভূতের অস্তিত্ব মানতে রাজি না হলেও প্রেতের অস্তিত্বে গভীরভাবে বিশ্বাস করত। প্রেতের আক্রমণ বা ডিমনিক পজেশনের (শয়তানি শক্তির প্রভাবে মানুষকে বশীভূত করা) কাহিনি তখন বেশ জনপ্রিয় ছিল।
ইংল্যান্ডের রাজা হওয়ার আগে স্কটল্যান্ডের রাজা ষষ্ঠ জেমস ১৫৯৭ সালে তার বিখ্যাত বই ডিমনোলজি প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি লেখেন, ‘শয়তানের আক্রমণ নিঃসন্দেহে বাস্তব, আর শয়তানের অধীন দাসেরা আমাদের মধ্যেই বাস করে।’
সপ্তদশ শতকের পিউরিটান ধর্মযাজক টমাস হল তার ডায়েরিতে লেখেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি ‘শয়তানের আঘাত’ ও ভয়াবহ স্বপ্নে আক্রান্ত হতেন। তবে তিনি বিশ্বাস করতেন, এসব পরীক্ষা তার ঈশ্বরের প্রতি অটল ভক্তির প্রমাণ।
তাহলে সাহিত্যের আলোকে মানুষ ভূত ও প্রেতকে কীভাবে আলাদা করত?
সেই সময়ের মানুষ ভূতকে দেখত দুঃখজনক ও করুণ আত্মা হিসেবে। তাদের বিশ্বাস ছিল, ভূত হলো সদ্য মৃত কোনো মানুষের অবশিষ্ট আত্মা, যে প্রিয়জন কিংবা পরিচিত স্থানের প্রতি টান থেকে পৃথিবীতে ঘুরে বেড়ায়। এসব আত্মার মধ্যে কিছুটা মানবিকতা বজায় থাকে।
অন্যদিকে, প্রেতকে দেখা হতো সম্পূর্ণ শয়তানি, ছলনাময় ও ধ্বংসাত্মক সত্তা হিসেবে। তারা নরকের বাসিন্দা। মানুষকে প্ররোচিত করা কিংবা পাপের পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য পৃথিবীতে আসে। প্রেতদের মধ্যে কোনো মানবিক অনুভূতি নেই, আছে কেবল ধ্বংসের ইচ্ছা।
অতীতের মতো আজও ভূত ও প্রেতের গল্প মানুষের মধ্যে ভয় ও বিস্ময় জাগায়। রাজা, ধর্মতত্ত্ববিদ, নাট্যকার কিংবা সাধারণ মানুষ, সবাই কোনো না কোনোভাবে এসব অতিপ্রাকৃত গল্পে মুগ্ধ হয়েছে।
এই গল্পগুলো আমাদের অন্য সংস্কৃতির বিশ্বাস ও কল্পনাকে বিনম্রভাবে বোঝার চেষ্টা করতে শেখায়। যেমন হ্যামলেট তার বন্ধু হোরেশিওকে বলেছিল, ‘স্বর্গ ও পৃথিবীতে এমন অনেক কিছু আছে, হোরেশিও, যা তোমার দর্শনে কল্পনাও করা হয়নি।’
আজ শনিবার সেই অতিপ্রাকৃত রহস্য আর কল্পনার আবহে বিশ্বব্যাপী উদ্যাপিত হচ্ছে হ্যালোইন উৎসব।
