‘দেশে ফেরায় উষ্ণ অভ্যর্থনা!’ প্রথমবারের মতো আয়োজিত ফিফা অনূর্ধ্ব-১৫ বিশ্বকাপ ও ফেস্টিভ্যালে অংশগ্রহণ শেষে দেশে ফেরা বাংলাদেশ দলকে স্বাগত জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন বার্তাই দিয়েছিল বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)।
সেখানে ছিল হাসিমুখ, করতালি, ছবি তোলার আয়োজন; আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, দলের ২০ সদস্যের প্রত্যেকের জন্য বরাদ্দ ছিল এক লাখ টাকা করে পুরস্কার। মঙ্গলবার বাফুফে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক খেলোয়াড়দের হাতে এই অর্থ তুলে দেন। টুর্নামেন্টের ই-টিয়ারে (পঞ্চম স্তর) রানার্সআপ হওয়া কিশোর ফুটবলারদের জন্য নিঃসন্দেহে এটি স্মরণীয় এক ঘরে ফেরা।
স্বীকৃতি ও প্রশংসা অবশ্যই প্রাপ্য এই কিশোরদের। তাদের পথচলাও ছিল ঘটনাবহুল। প্রাথমিক গ্রুপ পর্বে ছয় দলের মধ্যে পঞ্চম হওয়ার পর দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ। নকআউট পর্বে টাইব্রেকারে সেশেলস ও সিঙ্গাপুরকে হারানোর পর মন্টেনেগ্রো ও গ্যাবনের বিপক্ষে আসে দাপুটে জয়। এভাবেই ফাইনালে জায়গা করে নেয় দলটি। শেষ পর্যন্ত মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের কাছে ৪-১ গোলে হারলেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলার অভিজ্ঞতা এই কিশোরদের জন্য নিঃসন্দেহে মূল্যবান হয়ে থাকবে।
তবে এতসব উদযাপনের মধ্যেও একটি প্রশ্ন তোলা জরুরি— ফুটবলারদের দেশে ফেরার পর বরণ করে নিতে বাফুফে যতটা আগ্রহী, তাদের প্রকৃত অর্থে গড়ে তুলতেও কি ততটাই আন্তরিক?
সাফল্য উদযাপনে কোনো ভুল নেই। বরং কিশোর ফুটবলারদের এগিয়ে যাওয়ার জন্য উৎসাহ, স্বীকৃতি ও আর্থিক প্রণোদনা অত্যন্ত প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশের ফুটবলে একটি পরিচিত প্রবণতা তৈরি হয়েছে— উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য এলেই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন, বক্তৃতা, ফুলেল শুভেচ্ছা, ছবি তোলা ও পুরস্কারের ব্যবস্থা। অথচ ক্যামেরার আলো নিভে যাওয়ার পর কী ঘটে, সেখানেই থেকে যায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
নারী ফুটবলের উন্নয়নের প্রক্রিয়ার দিকে তাকালে এই উদ্বেগ আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্তরের নারী দলগুলো আঞ্চলিক পর্যায়ে ঐতিহাসিক সব সাফল্য অর্জন করেছে। কিন্তু অবকাঠামো, নিয়মিত ঘরোয়া প্রতিযোগিতা, খেলোয়াড়দের বেতন কাঠামো, প্রশিক্ষণ সুবিধা ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কর্মসূচি নিয়ে প্রশ্নের শেষ নেই। সাফের সাফল্য পেরিয়ে এশিয়ান পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সক্ষমতা অর্জন করতে হলে মাঝেমধ্যে এমন উদযাপন কিংবা অভিনন্দনবার্তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু প্রয়োজন।
একই কথা প্রযোজ্য বয়সভিত্তিক ফুটবলের ক্ষেত্রেও। এই অনূর্ধ্ব-১৫ দলের খেলোয়াড়েরা এখন তাদের ফুটবলজীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যায়ে রয়েছে। তারা দেখিয়েছে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সামর্থ্য তাদের আছে। ব্যর্থতা থেকে ঘুরে দাঁড়ানো এবং নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দেওয়ার মানসিকতাও তারা দেখিয়েছে। কিন্তু এই বয়সে প্রতিভা খুবই স্পর্শকাতর। যথাযথ দিকনির্দেশনা, নিয়মিত মানসম্মত প্রশিক্ষণ ও সুপরিকল্পিত উন্নয়নের প্রক্রিয়া না থাকলে আজকের সম্ভাবনাময় কিশোররাই আগামী দিনে হারিয়ে যেতে পারে বিস্মৃতির আড়ালে।
এই অর্জনকে যথাযথ প্রেক্ষাপটেও বিবেচনা করা জরুরি। বাংলাদেশ পুরো ফিফা অনূর্ধ্ব-১৫ বিশ্বকাপ ও ফেস্টিভ্যালের রানার্সআপ হয়নি। দলটি রানার্সআপ হয়েছে ই-টিয়ারের প্রতিযোগিতায়। অংশগ্রহণকারী দেশগুলোকে নকআউট পর্বে ছয়টি টিয়ারে ভাগ করে এই আয়োজন করা হয়েছিল।
বাংলাদেশ ই-টিয়ারের নকআউট পর্ব পেরিয়ে রানার্সআপ হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেছে। এটিও উদযাপন করার মতো সাফল্য। তবে এই পার্থক্যটি স্পষ্ট করে বলা জরুরি। এমনকি বাফুফের আমন্ত্রণপত্রে দলটিকে ‘বিশ্বকাপ ও ফেস্টিভ্যালের রানার্সআপ’ হিসেবে উল্লেখ করায় সাধারণ মানুষের মধ্যে পুরো প্রতিযোগিতার ফলাফল নিয়ে অতিরঞ্জিত ধারণা তৈরি হতে পারে।
সাফল্য উদযাপনে সত্যনিষ্ঠ থাকা খেলোয়াড়দের অর্জনকে খাটো করে না। বরং তাতে তাদের প্রকৃত কৃতিত্ব আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে। প্রকৃতপক্ষে, অংশগ্রহণকারী ১৮৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৩০তম। এই তথ্যও মনে করিয়ে দেয়, টিয়ারভিত্তিক প্রতিযোগিতায় অর্জিত সাফল্যের বিষয়টি জনসমক্ষে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা কতটা জরুরি।
খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ ও মিডিয়া বিভাগের সদস্যদের প্রত্যেকের জন্য এক লাখ টাকার পুরস্কার নিশ্চয়ই আনন্দের উপলক্ষ। কিন্তু এখন প্রয়োজন আরও বড় বিনিয়োগ। এই ফুটবলারদের উন্নত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করবে কে? মানসম্মত অনুশীলন সুবিধা, যথাযথ পুষ্টি, চিকিৎসাসেবা ও নিয়মিত আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার সুযোগ কি তারা পাবে?
এরপর অনূর্ধ্ব-১৭ ও অনূর্ধ্ব-২০ পর্যায় পেরিয়ে জাতীয় দলের মূল স্কোয়াডে জায়গা করে নেওয়ার মতো খেলোয়াড় হিসেবে তাদের গড়ে তুলতে কি কোনো সুনির্দিষ্ট উন্নয়ন পরিকল্পনা রয়েছে?
এগুলো কোনো অযৌক্তিক দাবি নয়। একটি টেকসই ফুটবল কাঠামো গড়ে তুলতে চাওয়া ফেডারেশনের কাছে এগুলোই বরং ন্যূনতম প্রত্যাশা। তবে অতীত অভিজ্ঞতা খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়।
কারণ, সংবর্ধনা অনুষ্ঠান ঘিরে যেরকম উচ্ছ্বাস ও উদ্দীপনা দেখা যায়, ফুটবলের প্রকৃত উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলোতে তার প্রতিফলন খুব কমই দৃশ্যমান হয়েছে।
