ইসরায়েলের তেল আবিবের কেন্দ্রস্থলে জড়ো হয়েছিলেন প্রায় ২ হাজার মানুষ। তাদের হাতে ছিল নানান রকম ব্যঙ্গাত্মক ব্যানার। মুখে ছিল ‘ইহুদি-আরব বন্ধুত্বের’ স্লোগান। তারা বর্ণবাদকে ‘না’ ও সহযোগিতাকে ‘হ্যাঁ’ বলার আহ্বান জানান। তাদের দাবি ছিল: ‘সবার জন্য সাম্য’। ‘অধিকাংশ মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দিয়েছে’ বলেও জানান তারা।
গত ৩১ অক্টোবর সন্ধ্যায় একই দাবি ও বক্তব্য নিয়ে জেরুসালেম ও হাইফাসহ দেশটির অন্যান্য শহরেও ছোট ছোট সমাবেশ হয়। বামপন্থী সংগঠনগুলো এসব সমাবেশের আয়োজন করে।
বিপরীতে, একইদিনে তেল আবিবে এক পৃথক জায়গায় প্রায় ২০০ মানুষ জড়ো হয়েছিলেন ভিন্ন বক্তব্য নিয়ে। তাদের অভিযোগ—‘ভোট চুরি হয়েছে’। তারা নেতানিয়াহুর পক্ষে স্লোগান দেন। তাদের দাবি: ইসরায়েল হবে ইহুদি-রাষ্ট্র। তারা ফিলিস্তিনিদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যা দেন এবং কোনো ‘সন্ত্রাসী’ যেন সরকারে যোগ দিতে না পারে সেই দাবি জানান।
এই লেখা যারা পড়ছেন, তারা ইতোমধ্যে হয়ত জেনে গেছেন যে নেতানিয়াহুবিরোধী জোটের ২ প্রধান দলের নেতা নাফতালি বেনেট ও ইয়ার গোলান জোটপ্রধান গাদি আইসেনকটকে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সমর্থন দিচ্ছেন।
আগামী ৪ নভেম্বর ইসরায়েলের রাষ্ট্রপতি আইজ্যাক হারগজের সঙ্গে দেখা করে নেতানিয়াহুবিরোধী জোটের নেতারা সরকার গঠন করতে দেওয়ার আর্জি জানাবেন।
দেশটির রাষ্ট্রপতি চাচ্ছেন রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের ফল মেনে নিক। তারা ‘ঐকমত্যের সরকার’ গঠনে রাজি হোক এবং দেশ যেন আবার নতুন করে নির্বাচনের দিকে না যায়, সেই উদ্যোগ নিক।
গত ৩১ অক্টোবর ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম দ্য জেরুসালেম পোস্ট এক বিশ্লেষণে জানায়—‘নেতানিয়াহু টিকে যাওয়ার মতো ভোট পেলেও তাকে সরানোর চাবি আইসেনকটের হাতে আছে।’
একটু চোখ ফেরানো যাক পেছনের দিকে। ইতিহাস বলছে—ফিলিস্তিনিদের জমি দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে ইসরায়েল রাষ্ট্র। ১৯৪৮ সালে আচমকা সেই রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ঘোষণার পর জাতিসংঘের নিয়ম অনুসারে নবগঠিত রাষ্ট্রটির ভেতরে থাকা ফিলিস্তিনিদের নাগরিকত্ব দিতে বাধ্য হয় ইসরায়েল। ইহুদি ইসরায়েলিরা সেখানকার ফিলিস্তিনিদের ডাকে ‘আরব’ বা ‘আরব ইসরায়েলি’ বা ‘ইসরায়েলি আরব’ বলে। আর ইসরায়েলের আরবদের অনেকে নিজেদের পরিচয় দেয় ‘ফিলিস্তিনি’ হিসেবে।
ইহুদিরা তাদের দেশের ভেতরে থাকা আরবদের দেখে ‘সন্দেহের’ চোখে; গণ্য করে ‘ইসরায়েলের শত্রু’ হিসেবে। ইসরায়েলের সরকারগুলো দল-মত নির্বিশেষ আরবদের ওপর চরম বৈষম্য করে আসছে, যাতে তারা ইসরায়েল ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়।
অনেকে বলে থাকেন, ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে একমাত্র গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। বাস্তব চিত্র হচ্ছে, এই ‘গণতান্ত্রিক’ দেশটিতে বাস করা আরব নাগরিকদের দেখা হয় ‘অচ্ছুৎ’ হিসেবে। কারও কারও অভিযোগ, ইসরায়েলে আরবদের গণ্য করা হয় ‘দ্বিতীয় শ্রেণির’ নাগরিক হিসেবে। আবার অনেকের মন্তব্য: ‘দ্বিতীয় শ্রেণি’ নয়, আরও ‘অনেক অনেক’ নিচে আরবদের অবস্থান।
বাস্তবতা হচ্ছে—ইসরায়েলে আরবরা নিজেদের মাতৃভাষা আরবিতে কথা বললে বা নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পড়লে রাস্তায় হেনস্তার শিকার হতে হয়। ইসরায়েলে ইহুদি বর্ণবাদ এতটাই প্রকট যে, সেখানকার বর্ণবাদী ইহুদিরা সামান্য কারণে এমনকি, অকারণেও একজন আরবকে হত্যা করলে বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনো আরবকে আটক করলে তাদের ভাগ্যে ‘সুবিচার’ জোটে না।
পশ্চিমের ‘মুক্তমনা’ সংবাদমাধ্যমগুলো কথায় কথায় ইসরায়েলকে মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে উল্লেখ করে। তবে ইসরায়েলের বেশিরভাগ রাজনৈতিক নেতা যখন বলেন, ইসরায়েলে একজন ইহুদি ও একজন আরব সমান অধিকার পেতে পারে না। একজন আরবের সমর্থন নিয়ে কোনো ইহুদি ইসরায়েলে সরকার গঠন করতে পারে না—তখন ‘গণতান্ত্রিক’ দেশটির দৈন্যদশাই বিশ্ববাসীর সামনে প্রকট হয়ে প্রকাশ পায়।
এ কথাও অনেকের জানা—ইসরায়েলে বসবাসকারী আরবরা ইহুদিদের হাতে প্রায় ৮০ বছর ধরে রাষ্ট্রীয় নির্যাতন ও বৈষম্যের মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করছেন। তারা এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের নির্বাচনগুলো বর্জন করে আসছিলেন। আরবদের ভাবনা ছিল, ইসরায়েলের নির্বাচনে ভোট দিলে সরকারের বৈষম্যগুলোকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
তবে এ বছর ঘটেছে ভিন্ন ঘটনা।
কী এমন ঘটলো ইসরায়েলে?
দীর্ঘ ৮০ বছরের ‘বর্জন’ দূরে সরিয়ে ইসরায়েলের আরব বাসিন্দাদের প্রায় ৮০ শতাংশ এবার নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনের সশস্ত্র সংগঠন হামাস ইসরায়েলে রক্তক্ষয়ী হামলা চালালে এর প্রতিশোধ হিসেবে দেশটির উগ্র ইহুদিবাদী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গাজায় গণহত্যা চালান।
শুধু তাই নয়, ইসরায়েলের দখলকৃত পশ্চিমতীরে সরকারি বাহিনীর পাশাপাশি অবৈধ অভিবাসী ইহুদিরা সেখানকার আদিবাসী ফিলিস্তিনিদের ওপর হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। এমনকি, নিজ দেশের ভেতরে বসবাসকারী আরবদের ওপর বৈষম্যের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয় নেতানিয়াহু নেতৃত্বাধীন উগ্র জায়নবাদী সরকার।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর নেতানিয়াহু সরকার সামান্য সন্দেহের বশে হাজারো আরবকে বিনা বিচারে বছরের পর বছর ধরে কারাগারে আটকে রেখেছে। ‘গণতান্ত্রিক’ দেশটির উগ্র জায়নবাদী ইহুদিরা চায় সব আরব বাসিন্দাদের ইসরায়েল থেকে বহিষ্কার করতে।
উগ্র জায়নবাদীদের আরব-বিদ্বেষ এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, তারা ভোটের মাঠ থেকেও আরবদের দূরে সরিয়ে রাখার নানাবিধ চেষ্টা করে। প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিক সামি আবু শাহাদাহ ৭ অক্টোবরের হামাস হামলা নিয়ে বিশ্লেষণ লেখায় তাকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি।
বিপরীতে, এবার ইসরায়েলের ভেতরে বসবাসকারী প্রায় ২২ শতাংশ আরবদের রাজনৈতিকভাবে সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বোঝানো হয়, তারা যদি গণহারে নির্বাচন বর্জন অব্যাহত রাখেন তাহলে ইসরায়েল সরকারের আরব-বৈষম্যনীতি আরও প্রতিষ্ঠা পাবে।
তাই, এবার দেখা গেল এক নীরব বিপ্লব।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে—যে বেদুইন আরব নারী জীবনে কখনো ভোট দেননি, তিনিও এবার ভোট দিয়েছেন। উট-গাধা-ঘোড়ায় চেপে আন-নাকাব মরুভূমি বা বর্তমানের নেগেভের যাযাবর আরবদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার দৃশ্য দেখেছে বিশ্ববাসী।
‘ভোট দিয়ে কী লাভ? ভোটে আরবদের ভাগ্য বদলাবে না!’—দীর্ঘদিনের এই ভাবনা ভেঙে আরবরা এবার দলে দলে ভোট দিয়েছেন, গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যার পর; দখল করা পশ্চিমতীরে ফিলিস্তিনিদের নির্মূল অভিযান আরও জোরদার হওয়ার পর; ইসরায়েলের ভেতরে আরবদের ওপর জাতিগত বৈষম্য চরমে যাওয়ার পর।
নির্বাচনী প্রচারণার সময় আরবদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ও আরব রাজনৈতিক নেতারা তাদের জ্ঞাতি ভাই-বোনদের এ কথাই বুঝিয়েছেন যে—নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন উগ্র জায়নবাদী দলগুলো ইসরায়েলের ভেতরে বসবাসকারী আরবদের এমনভাবে কোণঠাসা করেছে যে, এবার আরবদের ঘুরে দাঁড়ানো ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই।
তাই যে আরব জীবনে কখনো ভোট দেননি, তিনিও এবার ভোট দিলেন। বদলে গেল ভোটের হিসাব বা রাজনীতির ‘পাটিগণিত’।
ইসরায়েলে গণতন্ত্রের ‘কুৎসিত’ চেহারা!
গত ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলের নির্বাচনে দীর্ঘ বছরের রেকর্ড ভেঙে ভোট দিয়েছেন দেশটির নাগরিকরা। নেতানিয়াহুর জোট বেশি আসন পেলেও তা সরকার গঠনের জন্য পর্যাপ্ত নয়। তার জোটের মোট আসন ৫৩।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহুবিরোধী জোটও সরকারে গঠনের জন্য পর্যাপ্ত আসন পায়নি। তাদের মোট আসন ৪৮।
কিন্তু, আরব রাজনৈতিক দলগুলো ১২০ আসনের নেসেট বা সংসদে পেয়েছে ১৯ আসন, যা অনেকের কাছে ‘কল্পনাতীত’।
এই আরব দলগুলোর সমর্থন যোগ করলে নেতানিয়াহুবিরোধীদের মোট আসন দাঁড়ায় ৬৭। যদিও সরকার গঠন করতে প্রয়োজন ৬১ আসন।
নেতানিয়াহুর ভাষায়, আরবরা ভোট ‘চুরি’ করেছে। তার দাবি, বেশি সংখ্যক আরব ভোট দেওয়ায় জায়নবাদীদের বিজয় হাতছাড়া হয়েছে।
নির্বাচনের ২ দিন পর ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েল এক প্রতিবেদনের শিরোনামে জানায়—‘নেতানিয়াহু বাজে বকছেন। নির্বাচন কর্মকর্তারা নেতানিয়াহুর ভোট চুরির দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন।’
নেতানিয়াহুর অভিযোগ, ইসরায়েলে আরবরা যাতে দলে দলে ভোট দিতে যান সেজন্য কাতার সরকার কাড়ি কাড়ি টাকা ঢেলেছে।
তার এমন অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেত মাঠে নামে ঘটনার তদন্ত করতে। এরপর তদন্তের জন্য ডাকা হয় ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদকে।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহুবিরোধী প্রধান দলগুলোর শীর্ষ নেতারা বলছেন, নির্বাচনে পরাজিত হয়ে নেতানিয়াহু ইসরায়েলের ঐতিহাসিক নির্বাচনকে ‘কলঙ্কিত’ করছেন। তিনি এই নির্বাচনকে ‘অবৈধ’ হিসেবে প্রচার চালাচ্ছেন।
গত ৩০ অক্টোবর ইসরায়েলের প্রভাবশালী দৈনিক হারেৎজ-এর সম্পাদকীয়তে বলা হয়, ‘নেতানিয়াহু আরবদের ভোট দেওয়ার অধিকারকে অপরাধ হিসেবে তুলে ধরছেন।’ এতে বলা হয়—গত ৪ বছর ধরে আরবদের ওপর নিপীড়ন, তাদের বাড়িঘর ভেঙে দেওয়া ও রাষ্ট্রীয়ভাবে বিচ্ছিন্ন করে রাখার প্রতিবাদে আরবরা ভোটের মাধ্যমে নেতানিয়াহু সরকারকে বদলানোর পক্ষে রায় দিয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, নেতানিয়াহু এখন আরবদের ভোট ‘বাতিলের চেষ্টা’ করছেন। আরবদের সমর্থন নিয়ে যাতে বিরোধীরা সরকার গঠন করতে না পারে সেই চেষ্টাও করছেন প্রায় ১৯ বছর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা তথা ইসরায়েলের ইতিহাসে দীর্ঘ সময়ের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু।
গতকাল ৩১ অক্টোবর সংবাদমাধ্যমটি অপর এক প্রতিবেদনে জানায়, ‘অধিকাংশ মানুষ নেতানিয়াহু সরকারের পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দিয়েছেন’—এই দাবি নিয়ে নেতানিয়াহুবিরোধীরা সারাদেশে সমাবেশের ডাক দিয়েছেন। তাদের ভাষ্য: ইহুদি ভোটের মতো আরবদের ভোটও মূল্যবান। দেশের ভবিষ্যৎ গড়তে আরব নাগরিকদের অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
আরব ভোট ও ‘কিং মেকার’
রাজা-শাসিত মধ্যপ্রাচ্যে এক রাজাহীন রাষ্ট্র ইসরায়েল। ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শক্তির নিয়ন্ত্রণে থাকা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে তৎকালীন বিশ্বশক্তিগুলোর সহায়তায় আরবদের শত আপত্তি সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠা করা হয় ইসরায়েল। সামরিক শক্তির জোরে সেই ভূখণ্ডে কয়েক হাজার বছর ধরে বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের উৎখাত করে মূলত ইউরোপ থেকে আসা ইহুদিদের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো।
শত অত্যাচার সহ্য করে যারা বর্তমান ইসরায়েলের মানচিত্রের ভেতর নিজেদের ভূমি আঁকড়ে ছিলেন বা এখনো আছেন, তারা ইসরায়েলের নাগরিকত্ব নিয়ে সেখানেই বসবাস করছেন। তাদেরকে ইসরায়েলের ইহুদি অধিবাসীরা ‘আরব ইসরায়েল’ বা ‘ফিলিস্তিনি ইসরায়েল’ অথবা ‘ইসরায়েলি আরব’ হিসেবে বিবেচনা করেন।
বর্তমানে ইসরায়েলের ভেতর আরব অধিবাসীদের সংখ্যা প্রায় ২২ শতাংশ হলেও, আরবদের অভিযোগ ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তাদেরকে ‘দ্বিতীয় শ্রেণির’ নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
এ কথা সবাই জানেন, ইহুদিদের একটি বড় অংশ চান ইসরায়েলকে ‘পুরোপুরি ইহুদি রাষ্ট্র’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে। তারা তাদের রাষ্ট্রের অ-ইহুদি নাগরিকদের প্রতি বৈষম্য করতে দ্বিধা করেন না। এ কারণে অনেকের চোখে ইসরায়েল একটি ‘বর্ণবাদী’ রাষ্ট্র।
আধুনিক ইসরায়েল রাষ্ট্রে বিশ্বাসী জায়নবাদী ইহুদিদের একটি অংশ মনে করেন, যেহেতু আরবরা ইসরায়েলের অস্তিত্ব স্বীকার করে না তাই তাদেরকে ইসরায়েল সরকারের কোনো সুযোগ-সুবিধা দেওয়া যাবে না।
আবার উদারপন্থি ইহুদিদের একটি অংশ মনে করেন, ইসরায়েলে বসবাসকারী ও সরকারের সুবিধাভোগী অনেক ধর্মপ্রাণ ইহুদিও ইসরায়েলের অস্তিত্ব স্বীকার করেন না; অথচ তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে উগ্র জায়নবাদী দলগুলো সরকার গঠন করে।
তারা এমন ঘটনাও সবাইকে মনে করিয়ে দেন যে, ২০১৫ সালে নির্বাচনী প্রচারণায় খোদ নেতানিয়াহু আরব ভোটারদের তার পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
যে যাই বলুক না কেন, জায়নবাদী বা ইসরায়েলপন্থি ইহুদিরা দলমত নির্বিশেষে আরবদের ‘একমাত্র শত্রু’ হিসেবে দেখেন। তারা ইসরায়েলের ভেতরে বসবাসকারী রাষ্ট্রীয় সুবিধাবঞ্চিত আরবদের বের করে দেওয়ার দাবি ক্রমাগত করে আসছেন।
গণতান্ত্রিক দেশের দাবিদার ইসরায়েল ‘সবার জন্য ভোটাধিকার’-কে মেনে নিতে বাধ্য। তবে আরবদের যথাযথ সম্মান দিতে নারাজ।
আরবদের এই দুরবস্থা চলছে ১৯৪৮ সাল থেকে। সেই বছরকে ইসরায়েলি ইহুদিরা ‘স্বাধীনতা’র বছর হিসেবে উৎযাপন করলেও আরবরা সেই বছরকে স্মরণ করে ‘নাকবা’ বা বিপর্যয় হিসেবে। তাই তাদেরকে দেখা হয় ‘ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ শত্রু’ হিসেবে।
ঘটনাচক্রে, অনেক বিশ্লেষকের বিবেচনায় ইসরায়েলের এই ‘অভ্যন্তরীণ শত্রু’ আরবরা এখন ইসরায়েলের ‘কিং মেকার’।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, ইসরায়েলের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় আরব দলগুলোকে ‘কিং মেকার’ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এখনো পর্যন্ত নেতানিয়াহুবিরোধী জোট সরকারের রূপরেখা স্পষ্ট হয়নি।
ইসরায়েলে সরকার গড়ার বাস্তবতা
ইসরায়েলে জাতীয় নির্বাচনে মোটা দাগে নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলো ৬৭ আসন পেয়েছে। সরকার গঠনে প্রয়োজন ৬১ আসন। অনেকের মনে হতে পারে, ইসরায়েলে এখন নেতানিয়াহুকে সরিয়ে বিরোধীরা সহজেই সরকার গড়তে পারবেন।
কিন্তু, এ নিয়ে দেখা যাচ্ছে আদর্শিক জটিলতা।
নেতনিয়াহুবিরোধী জোটের মধ্যে উগ্র জায়নবাদী দলগুলো চায় না অ-জায়নবাদী (ইসরায়েলবিরোধী) আরবদের সঙ্গে নিয়ে সরকার গড়তে। এমনকি, নেতানিয়াহুর প্রধান বিরোধী গাদি আইসেনকট ইহুদি ভোটারদের আকৃষ্ট করতে নির্বাচনী প্রচারণায় প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, তিনি কোনো আরব দলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সরকার গঠন করবেন না।
এদিকে, নেতানিয়াহু দিচ্ছেন এক নতুন চাল। তিনি তার বিরোধী জায়নবাদী দলগুলোকে ‘ঐকমত্যের সরকার’ গড়ার আহ্বান জানাচ্ছেন, যাতে নির্বাচিত আরব দলগুলোকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখা যায়।
বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, ইসরায়েলের সরকার ও সরকারবিরোধী সবাই যদি আরবদের এমনভাবে ‘অচ্ছুৎ’ করে রাখে, তাহলে সেখানে নতুন সরকার গড়ার পথ কঠিন হয়ে পড়বে। উগ্র জায়নবাদীরা ইসরায়েলকে আরও বর্ণবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করবে, যা আখেরে ইসরায়েলের জন্যই ক্ষতিকর। কেননা, একটি জাতির প্রায় ২২ শতাংশ মানুষকে অবজ্ঞা করে বেশি দূর এগোনো যায় না।
আন্তর্জাতিকভাবেও ইসরায়েল কট্টর বর্ণবাদী রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচিত হবে এবং নানাবিধ নিষেধাজ্ঞায় পড়বে, বলেও আশঙ্কা অনেকের।
এমন বাস্তবতায় উদার জায়নবাদী দলগুলোর নেতারা নেতানিয়াহুবিরোধী সরকার গড়তে জোর প্রচারণা ও প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের ‘ট্যাবু’ ভাঙার সংবাদগুলোও প্রচার করছে ইসরায়েলের জায়নবাদী সংবাদমাধ্যমগুলো।
গতকাল ৩১ অক্টোবর টাইমস অব ইসরায়েল এক প্রতিবেদনে জানায়, ইসরায়েলের মানুষ ‘পরিবর্তনের জন্য’ ভোট দিয়েছেন। রেকর্ড সংখ্যক অর্থাৎ প্রায় ৭৮ শতাংশ ইসরায়েলি ভোট দিয়েছেন ‘উন্নত ইসরায়েলের’ আশায়। যেহেতু নেতানিয়াহুবিরোধী জোট ৬৭ আসন পেয়েছে, সেহেতু তারা নেতানিয়াহুবিরোধী সরকার দেখতে চায়।
প্রতিবেদন অনুসারে, অনেকে বলছেন—ইহুদি-আরবদের অধিকাংশ মানুষ নেতানিয়াহুর সরকার বদলানোর পক্ষে ভোট দিয়েছেন। তারা এর প্রতিফলন পরবর্তী সরকারে দেখতে চান। তাদের মতে, ইহুদি ভোটের সমান গুরুত্ব আরব ভোটের। ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ কেমন হবে তা নির্ধারণ করতে হবে আরব নাগরিকদের সঙ্গে নিয়েই।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলো থেকে জানা যায়, নেতানিয়াহুবিরোধী নেতারা ঠান্ডা মাথায় ধীরে-সুস্থে নতুন সরকার গড়ার পথে এগোচ্ছেন। নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলোর বেশ কয়েকজন নেতা আরবদের মিত্র হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন।
টাইমস অব ইসরায়েল অপর এক প্রতিবেদনে জানায়, আগামী ১০ নভেম্বর নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলো নেসেটে বিজয়ী সদস্যদের শপথগ্রহণের পরপরই লিকুদ পার্টির সদস্য আমির ওহানাকে নেসেট স্পিকারের পদ থেকে সরাতে চায়।
যেহেতু নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলোর সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে তাই নেতানিয়াহুপন্থি স্পিকারকে এক প্রস্তাবেই সরানো সম্ভব হবে।
প্রতিবেদন অনুসারে, ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যম চ্যানেল টুয়েলভকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক বারাক সেরি বলেছেন যে, স্পিকারকে সরানোর বিষয়ে বিরোধী দলগুলো একমত হয়েছে। তবে নতুন স্পিকার কে হতে যাচ্ছেন তিনি তা জানাননি।
বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন, নেতানিয়াহু সরকারের নেসেট স্পিকারকে সরানোর পক্ষে অংশ নেওয়া দলগুলোকে দেখলেই পরিষ্কার হতে পারে ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ সরকার কাদের সমর্থন নিয়ে গড়ে উঠতে যাচ্ছে।
গতকাল ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম দ্য জেরুসালেম পোস্ট এক প্রতিবেদনে জানায়, নেসেটে ১১ আসন পাওয়া আরব দল জয়েন্ট লিস্টের সভাপতি আহমাদ তিবি বলেছেন, তার দল স্পিকার আমিরকে হটানোর পক্ষে। তবে নতুন জোট সরকারে যোগ দেবে না।
প্রতিবেদন অনুসারে, গতকাল ৩১ অক্টোবর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, তার দল জোটের বাইরে থেকে সরকারকে সমর্থন দেবে। তবে তা আরব সমাজের প্রতি নতুন সরকারের দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে।
তার অভিযোগ—জোট সরকার গড়ার প্রক্রিয়াকে ‘সহজ করার পরিবর্তে জটিল করা’ হচ্ছে।
এদিকে, নেতানিয়াহুবিরোধী জোটের প্রধান মুখ গাদি আইসেনকট যেকোনো নির্বাচিত নেসেট সদস্যকে জোট সরকারে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ৪টি শর্ত জুড়ে দিয়েছেন।
তিনি বলেন, যারা ইসরায়েলকে ইহুদিদের জন্য উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে মেনে নেবেন, সামরিক ও বেসামরিক কাজে বাধ্যতামূলক অংশগ্রহণের পক্ষে সমর্থন দেবেন, হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করবেন এবং হামাসের সামরিক শক্তি ধ্বংসের পাশাপাশি সংগঠনটির গাজা শাসনের ক্ষমতা নিশ্চিহ্ন করতে দায়বদ্ধ থাকবেন; তারা তার নতুন সরকারে আমন্ত্রিত।
মনে রাখা দরকার, নেতানিয়াহুবিরোধী উগ্র জায়নবাদী দলগুলোর একাংশ যেমন ‘জেদ’ ধরে আছে আরবদের সঙ্গে হাত মেলাবে না, তেমনি আরব দলগুলোও যে শুধু নেতানিয়াহুকে সরানোর জন্যই নেতানিয়াহুবিরোধী জোটকে সমর্থন দেবেন, তাও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। কেননা, দীর্ঘ ৮০ বছর ধরে বঞ্চিত আরবদেরও অনেক দাবি আছে। তারাও বাস্তব পরিস্থিতির পরিবর্তন চায়।
অনেকের মতে, আরবরা শুধু ‘নেতা’র পরিবর্তন চাচ্ছেন না, তারা ‘নীতি’র পরিবর্তনও চাচ্ছেন। তারা হতাশা ও ভয় থেকে রেকর্ড সংখ্যক ভোট দিয়েছেন। তারা আরব দল জয়েন্ট লিস্ট ও রা’মকে ‘কিং মেকার’-এ পরিণত করেছেন।
ইসলামপন্থি আরব দল রা’ম আরব-ইহুদিদের ঐক্যের ওপর জোর দিচ্ছে। এর প্রমাণ হিসেবে দলটি একজন ইহুদি ও সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা ইয়োয়াব সেগালোভিৎজকে দলের নেসেট প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে।
আরব ভোটারদের অনেকে বলছেন, তাদের সমাজে অপরাধ প্রবণতা ও ইসরায়েলের উগ্র ডানপন্থি মন্ত্রীদের আরববিরোধী কর্মকাণ্ড তাদেরকে ভোট দিতে ঐক্যবদ্ধ করেছে।
দেখা যাচ্ছে আরব দলগুলো ‘অকল্পনীয়’ সংখ্যক আসন পাওয়ায় তারাও দরকষাকষির পথে হাঁটছে। তারাও বুঝেছে, ইসরায়েলে পরিবর্তন আনতে চাইলে আরবদের আর অবজ্ঞা করার অবকাশ নেই।
যেহেতু রাজনীতিতে ‘শেষ’ বলে কিছু নেই, তাই আরবরা কতটা ‘কিং মেকার’ হয়ে উঠতে পারে তা ভবিষ্যতের হাতেই তোলা থাকলো।
এক নজরে ইসরায়েলে ভোটের চিত্র
ইসরায়েলের ১২০ আসনের নেসেটে সরকার গঠনে প্রয়োজন ৬১ আসন।
নেতানিয়াহুপন্থি জোট পেয়েছে ৫৩ আসন।
নেতানিয়াহুবিরোধী জোট পেয়েছে ৪৮ আসন।
আরব দলগুলো পেয়েছে ১৯ আসন।
নেতানিয়াহুবিরোধী জোটের মোট আসনের সঙ্গে আরবদের আসন যোগ করলে দাঁড়ায় ৬৭ আসন।
আগামী ১০ নভেম্বর নির্বাচিত নেসেট সদস্যদের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান।
শপথগ্রহণের পর নেসেটের নেতানিয়াহুপন্থী স্পিকারকে সরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব তোলা হতে পারে।
