চলতি সপ্তাহটা খুব একটা ভালো যাচ্ছে না ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর। প্রথমে ঘোষণা এলো, দীর্ঘদিনের মিত্র ও ঘনিষ্ঠ ‘বন্ধু’ ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দেশকে আর বার্ষিক নিরাপত্তা সহায়তা বাবদ অর্থ দেবেন না। পরের দিনই জানলেন তার বন্ধুর দলের ভরাডুবি হয়েছে মধ্যবর্তী নির্বাচনে। কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে রিপাবলিকান পার্টি।
রিপাবলিকানদের শোচনীয় পরাজয়ের খবর পুরনো হওয়ার আগেই নেতানিয়াহু নিজের দেশে পেলেন আরেক বড় দুঃসংবাদ। দীর্ঘদিনের এক মিত্র তাকে সমর্থন জানাতে অস্বীকার করেছে।
এএফপির খবরে বলা হয়, নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত অতি-রক্ষণশীল ইহুদি দল ইউটিজে বৃহস্পতিবার তাকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বহাল রাখার সুপারিশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ফলে, নেতানিয়াহুর প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক আইডিএফ প্রধান গাদি আইসেনকটের সরকার গঠনের সম্ভাবনা আরও উজ্জ্বল হলো।
২৭ অক্টোবরের নির্বাচনের পর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দ্বিতীয় দিনের মতো আলোচনা করছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ।
ওই নির্বাচনে নেতানিয়াহু কিংবা আইসেনকট কেউই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাননি।
যে কারণে নেতানিয়াহু থেকে দূরে সরেছে ইউটিজে
আগের পাঁচ নির্বাচনে নেতানিয়াহুকে সমর্থন দেওয়া দল ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম (ইউটিজে) প্রেসিডেন্ট হারজগের সঙ্গে বৈঠকে এবার তাকে আবারও প্রধানমন্ত্রী করার সুপারিশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
তবে দলটি আইসেনকটের পক্ষেও অবস্থান নেয়নি।
দলটি হারজগকে জানিয়েছে, ‘সরকার গঠনের জন্য নেসেটের কোনো সদস্যকেই সুপারিশ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা।’
প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের বিবৃতিতে এই তথ্য জানা গেছে।
১২০ সদস্যের ইসরায়েলি পার্লামেন্টে ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম ৭টি আসন পেয়েছে।
ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম মূলত ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত বা ইউরোপের সঙ্গে শিকড়ের সম্পর্ক থাকা আশকেনাজি অতি-রক্ষণশীল ইহুদিদের প্রতিনিধিত্ব করে। অন্যদিকে, একই সম্প্রদায়ের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকীয় বংশোদ্ভূত সেফারদি ইহুদিদের প্রতিনিধিত্ব করে শাস পার্টি। হারেদি ইহুদি ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক সামরিক চাকরি থেকে অব্যাহতি বহাল রাখার দাবিতে দুই দলকে সমর্থন দিয়ে আসছেন নেতানিয়াহু।
গাজা, লেবানন ও ইরানের যুদ্ধের কারণে রিজার্ভ সেনাদের বারবার সামরিক দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এ নিয়ে ইসরায়েলি নাগরিকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ থাকলেও নেতানিয়াহু হারেদি ইহুদি ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের জন্য ওই ছাড় বহাল রেখেছেন।
আইসেনকটের সম্ভাবনা বাড়ল যেভাবে
সাবেক সেনাপ্রধান আইসেনকট মধ্যপন্থি ও মধ্য-ডানপন্থি দলগুলোকে এক করার চেষ্টা করছেন। তিনি বাধ্যতামূলক সামরিক চাকরি থেকে অব্যাহতির সুযোগ বন্ধ করার বিষয়ে অনড়।
বৃহস্পতিবার প্রধান দলগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক শেষ করবেন হারজগ। এরপর একজন আইনপ্রণেতাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন তিনি।
সাধারণত কোন ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক দলের সুপারিশ পেয়েছেন, তার ভিত্তিতেই প্রেসিডেন্ট এই সিদ্ধান্ত নেন।
ফলে আইসেনকটকেই সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
হারজগ সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট আইনপ্রণেতা এ জন্য ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজনে সময় আরও ১৪ দিন বাড়ানো যাবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ওই আইনপ্রণেতা ব্যর্থ হলে হারজগ অন্য কাউকে দায়িত্ব দেবেন।
পরিবর্তিত সমীকরণ
ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমসহ নেতানিয়াহুর জোট নতুন পার্লামেন্টে ৫৩টি আসন পেয়েছে। অন্যদিকে, আইসেনকটের জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। সরকার গঠনের জন্য লাগবে ৬১টি আসন।
এই নির্বাচনে ইসরায়েলের আরব দলগুলোর শক্তি বেড়েছে। দলগুলো মোট ১৯টি আসন পেয়েছে।
আইসেনকট আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করতে পারেন। তবে এতে বিরোধী জোটের কয়েকটি দলের সমর্থন হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। সে ক্ষেত্রে আবারও বদলাবে সমীকরণ।
আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, আরব দল রা’ম আইসেনকটকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার সুপারিশ করার কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে, জয়েন্ট লিস্টের অবস্থান তখনও চূড়ান্ত হয়নি।
অপরদিকে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহুর জোট আরও দুর্বল হয়েছে। ইউটিজের ৭ আসন ছুটে যাওয়ায় দলটির হাতে এখন মাত্র ৪৬ আসন।
আরব দলই ‘কিংমেকার’
জায়নবাদী বা ইসরায়েলপন্থি ইহুদিরা দলমত নির্বিশেষে আরবদের ‘একমাত্র শত্রু’ হিসেবে দেখেন। তারা ইসরায়েলের ভেতরে বসবাসকারী রাষ্ট্রীয় সুবিধাবঞ্চিত আরবদের বের করে দেওয়ার দাবি ক্রমাগত করে আসছেন।
তা সত্ত্বেও, সার্বিকভাবে আরব দল জয়েন্ট লিস্ট ও রা’ম ‘কিং মেকারে’ পরিণত হয়েছে। সব হিসাবের সারকথা—আরব দলগুলোর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন ছাড়া কেউই এবার সরকার গঠন করতে পারছে না।
