যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয় চীনের জন্য একই সঙ্গে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। এ জয়ের ফলে মার্কিন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে দলটি।
বার্তাসংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের এই ফলাফল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একক সিদ্ধান্তে পরিচালিত পররাষ্ট্রনীতিতে লাগাম টানার ক্ষমতা দিয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টিকে। এর ফলে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের জটিল সম্পর্কে কী প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মতামত তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে।
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় চীনা পণ্যের ওপর ট্রাম্পের ইচ্ছেমতো শুল্ক আরোপের ক্ষমতা সীমিত করার সুযোগ পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের মেয়াদের বাকি দুই বছরে তারা এ উদ্যোগ নিতে পারে।
এতে বড় ধাক্কা খেতে পারেন ট্রাম্প। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে তীব্র বাণিজ্যযুদ্ধের সময় তিনি বারবার শুল্ক আরোপ করেছেন। পরে দুই দেশ একটি সমঝোতায় পৌঁছায়, যার মেয়াদ আগামী জানুয়ারিতে শেষ হওয়ার কথা।
সাংহাইয়ের ফুদান ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ডিন উ সিনবো এএফপিকে বলেন, ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের ক্ষমতা সীমিত করলে ‘চীনের সঙ্গে আলোচনায় শুল্ককে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ তার কমে যাবে’।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ট্রাম্পের শুল্কনীতির জনপ্রিয়তার বিষয়টিও ডেমোক্র্যাটদের বিবেচনায় নিতে হবে।
সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির এস রাজরত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক ড্রিউ থম্পসন বলেন, আগামী দুই বছরে কংগ্রেস ট্রাম্পের নীতিগুলো বাধাগ্রস্ত করার ‘প্রতিটি সুযোগ কাজে লাগাবে’।
তবে শুল্ক আরও সীমিত করার ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের সতর্ক থাকতে হবে বলে মনে করেন থম্পসন। কারণ, শ্রমিক ইউনিয়ন, শ্রমজীবী মানুষ এবং ছোট ব্যবসার মালিকদের মধ্যে এসব শুল্ক বেশ জনপ্রিয়। ঐতিহাসিকভাবে এই গোষ্ঠীগুলো ডেমোক্র্যাটদেরই সমর্থক।
ওয়াশিংটনের ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক গবেষক প্যাট্রিসিয়া কিম বলেন, চীনের ওপর চাপ বাড়াতে পারে এমন পদক্ষেপে কংগ্রেসের সমর্থন কম থাকতে পারে। কারণ, এতে মার্কিন ভোক্তা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের খরচ বেড়ে যেতে পারে কিংবা দুই দেশের মধ্যে সংঘাতের আশঙ্কা বাড়তে পারে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের গ্রুপ চিফ ইকোনমিস্ট নিল শিয়ারিংয়ের মতে, তাইওয়ান ইস্যু পুরো সমীকরণ বদলে দেওয়ার মতো বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বশাসিত গণতান্ত্রিক দ্বীপ তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে বেইজিং। অন্যদিকে ওয়াশিংটন হলো তাইপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সহযোগী। সম্ভাব্য চীনা হামলা ঠেকাতে তাইওয়ানকে শত শত কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
তবে গত মে মাসে ট্রাম্পের এক বক্তব্যে তাইওয়ানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। তিনি ইঙ্গিত দেন, চীনের সঙ্গে আলোচনায় তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি দর-কষাকষির হাতিয়ার হতে পারে। এরপর তার প্রশাসন ১ হাজার ৪০০ কোটি (১৪ বিলিয়ন) ডলারের অস্ত্রের একটি চালান কয়েক মাসের জন্য আটকে দেয়।
শিয়ারিং এক নোটে লিখেছেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের বাকি দুই বছরে তাইওয়ানের ওপর চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে চীন। বিশেষ করে বেইজিং যদি মনে করে, ওয়াশিংটন অন্য বিষয়ে ব্যস্ত কিংবা ট্রাম্প এমন কোনো শর্তে রাজি হবেন, যাতে তাইওয়ানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য চীনা হামলায় যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ না করে।
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে সম্প্রতি নিজের ‘দারুণ বন্ধুত্বের’ কথা বলেছেন ট্রাম্প। ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের একাংশের রাজনৈতিক চাপ সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত তিনি তাইওয়ানের জন্য অস্ত্রের চালান অনুমোদন করেননি।
উ সিনবো বলেন, ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কংগ্রেস আগামী বছর ট্রাম্পকে তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রি আবার শুরু করতে বাধ্য করতে পারে।
তিনি বলেন, ‘এমনটা হলে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্কের স্থিতিশীলতাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
অন্যদিকে লন্ডনের এসওএএস চায়না ইনস্টিটিউটের পরিচালক স্টিভ সাং বলেন, তাইওয়ানের প্রতি মার্কিন কংগ্রেস নতুন করে সমর্থন জানালে চীন দ্বীপটির বিষয়ে আরও সতর্ক অবস্থান নিতে পারে। অর্থাৎ কংগ্রেসের এমন সমর্থন তাইওয়ান ইস্যুতে বেইজিংকে ঝুঁকি এড়িয়ে পা ফেলতে উৎসাহিত করতে পারে।
তবে থম্পসন মনে করেন, অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিতে ট্রাম্পকে বাধ্য করে কংগ্রেস আইন পাস করলেও প্রেসিডেন্ট সেই আইনে ভেটো দিতে পারেন। এমনকি আইনটি উপেক্ষাও করতে পারেন তিনি।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লেও ট্রাম্পের সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে চীন নিজেদের কৌশল বদলাবে না বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
কিম বলেন, ‘সি চিন পিংয়ের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে বেইজিং সম্ভবত ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাবে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে এটিকেই তারা সবচেয়ে কম ঝুঁকির উপায় হিসেবে দেখছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বেইজিং বা ওয়াশিংটন—কোনো পক্ষই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে মৌলিক কোনো পরিবর্তন আশা করছে বলে মনে হয় না। আবার তারা এমন পরিবর্তন চায় বলেও মনে হয় না।’
অধ্যাপক সাং বলেন, ‘মেয়াদের শেষভাগে ট্রাম্পের ক্ষমতা কমে আসায় চীন তার ওপর আরও চাপ তৈরির চেষ্টা করবে।’
তবে তিনি বলেন, বেইজিং হিসাব-নিকাশ করেই পা ফেলবে। অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে ট্রাম্পকে পুরোপুরি বেপরোয়া আচরণের দিকে ঠেলে দিতে চাইবে না তারা।
