শান্তিতে নোবেল পুরস্কার না পাওয়ার আক্ষেপ যেন কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের। এবার সেই ক্ষোভ গিয়ে পড়েছে নরওয়ের ওপর। দেশটিকে ‘শিটহাউস কান্ট্রি’ বলে কটাক্ষ করেছেন তিনি। কিন্তু ট্রাম্পের এমন মন্তব্যে চুপ করে থাকেনি নরওয়েও। বরং পাল্টা জবাব দিতে গিয়ে এমন এক পথ বেছে নিয়েছে দেশটির পর্যটন সংস্থা, যা দেখে হাসি চেপে রাখা কঠিন।
শৌচাগার নিয়ে শুরু হয়েছে তাদের অভিনব প্রচার। শুধু তা-ই নয়, ট্রাম্পের বহুল ব্যবহৃত রাজনৈতিক স্লোগান ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’-এর আদলে নরওয়ের পর্যটন সংস্থা বলছে, ‘মেক শিটহাউস গ্রেট এগেইন!’।
সিএনএন, দ্য গার্ডিয়ান, ফোর্বস ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ট্রাম্পের কটাক্ষের জবাবে নরওয়ের এই প্রচার এখন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
ঘটনার শুরু যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের পোর্ট হিউরনে ট্রাম্পের এক নির্বাচনী সমাবেশে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে গত রোববারের ওই সমাবেশে নরওয়ে থেকে অভিবাসী নিতে চান না বলে জানান তিনি। কারণ হিসেবে বলেন, তিনি নোবেল পুরস্কার পাননি।
ট্রাম্পের ভাষায়, ‘আমি নোবেল পুরস্কার পাইনি। তাই নরওয়ে থেকে কাউকে চাই না।’ এরপর ক্ষোভের মাত্রা আরও বাড়িয়ে তিনি বলেন, ‘সত্যি বলতে, নরওয়ে এখন একটি শিটহাউস কান্ট্রিতে পরিণত হয়েছে।’
দ্য গার্ডিয়ান ও এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ার ক্ষোভ থেকেই নরওয়েকে নিয়ে এমন মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প। এ বছর নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার মানবাধিকারকর্মী ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সাবেক বিচারক নাভি পিল্লাই। এই সিদ্ধান্তে অসন্তোষ প্রকাশ করে এর আগে নরওয়েকে দায়ী করেছিলেন ট্রাম্প।
অথচ নোবেল শান্তি পুরস্কার নরওয়ে সরকার দেয় না। পুরস্কারটি দেয় দেশটির পার্লামেন্ট মনোনীত একটি স্বাধীন নোবেল কমিটি। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নরওয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসপেন বার্থ এইডে ট্রাম্পকে বিষয়টি বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন। তার ভাষ্য, ট্রাম্প বিষয়টি ভালোভাবেই জানেন।
ট্রাম্পের কটাক্ষকে প্রচারের সুযোগ হিসেবে নিলো নরওয়ে
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের মন্তব্যের পর ভিজিট নরওয়ে তাদের ওয়েবসাইটে ‘বিশ্বের সেরা শৌচাগার’ শিরোনামে একটি বিশেষ আয়োজন প্রকাশ করে। সেখানে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলের দৃষ্টিনন্দন গণশৌচাগারের ছবি ও ভিডিও তুলে ধরা হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারটি তুলে ধরে সংস্থাটি লিখেছে, ‘আমরা “শিটহাউস কান্ট্রি” নিয়ে কিছু কথাবার্তা শুনেছি। কী আর বলব, আমাদের কাছে বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দন শৌচাগারগুলোর কয়েকটি রয়েছে।’
একটি প্রচারবার্তায় আরও বলা হয়েছে, ‘মেক শিটহাউস গ্রেট এগেইন! এসব শৌচাগার ঘুরে দেখার মতো—আপনার সত্যিই প্রয়োজন হোক কিংবা না হোক।’
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নরওয়ের নির্ধারিত ১৮টি প্রাকৃতিক পর্যটনপথে স্থপতি, শিল্পী ও নকশাবিদদের দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ব্যতিক্রমী সব গণশৌচাগার। এসব স্থাপনার কয়েকটি ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক স্থাপত্য পুরস্কারও পেয়েছে।
শৌচাগারগুলোর অবস্থানও বেশ চমকপ্রদ। কোথাও সামনে বিশাল ফিয়র্ড বা সমুদ্রখাত, কোথাও পাহাড়ি নদী ও জলপ্রপাত, আবার কোথাও চোখজুড়ানো প্রাকৃতিক দৃশ্য। প্রায় ২ হাজার ২৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ এসব পর্যটনপথে রয়েছে স্থাপত্যের নানা ধরনের নিদর্শন।
এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত স্টেগাস্টেইন ভিউপয়েন্টের শৌচাগার। পশ্চিম নরওয়ের সোগনেফিয়র্ড অঞ্চলে পাহাড়ের খাদের কিনারায় তৈরি এই স্থাপনা থেকে দেখা যায় আউরল্যান্ডসফিয়র্ডের বিস্তৃত দৃশ্য।
শৌচাগারটির বড় কালো কাচের জানালা দিয়ে ভেতরে বসেই বাইরের প্রকৃতি দেখা যায়। তবে বাইরে থেকে ভেতরের কাউকে দেখা যায় না। নকশা ও স্থাপত্যবিষয়ক সাময়িকী ডিজাইনকিউরিয়ালের ২০১৫ সালের তালিকায় এটি বিশ্বের সেরা ১০টি গণশৌচাগারের মধ্যে প্রথম স্থান পেয়েছিল বলে জানিয়েছে এপি।
এ ছাড়া, হেলগেল্যান্ড উপকূলে ঢেউয়ের আদলে তৈরি উরেডপ্লাসেনের শৌচাগারটিও বেশ বিখ্যাত। দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রকাশনায় এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে মনোরম শৌচাগারগুলোর একটি বলা হয়েছে।
প্রচারে রয়েছে সোগনেফিয়র্ড অঞ্চলের সৌরবিদ্যুৎচালিত আধুনিক শৌচাগার, টুঙ্গেনেসেটের নর্দার্ন লাইটস বা মেরুজ্যোতির নিচে ছবি তোলার উপযোগী স্থাপনা এবং সেনজা দ্বীপের ত্রিভুজাকৃতির বিখ্যাত ‘গোল্ডেন টয়লেট’।
২০১৪ সালে নির্মিত সেনজার এই সোনালি শৌচাগারটি পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় বিরতিস্থলে পরিণত হয়েছে বলে জানিয়েছে এপি।
‘বিশ্বের এখন একটু হাসির প্রয়োজন’
নরওয়ের এই পাল্টা প্রচার নিয়ে দেশটির ভেতরেও বেশ আলোচনা হচ্ছে। বার্গেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অলংকারশাস্ত্রের অধ্যাপক ইয়েন্স কিয়েলডসেন মনে করেন, এই পরিস্থিতিতে ভিজিট নরওয়ের প্রতিক্রিয়া যথার্থ হয়েছে।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নরওয়ের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম এনআরকেকে কিয়েলডসেন বলেন, ‘এটা অনেকটা কিন্ডারগার্টেনের দাপুটে শিশুর মতো। আপনি যদি খুব বেশি সিরিয়াস হয়ে যান, তাহলে সেই দাপুটে শিশুটিই জিতে যায়।’
ভিজিট নরওয়ের জ্যেষ্ঠ পরামর্শক এভজেনিয়া এগোরোভাও জানিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের এই প্রচারের প্রতিক্রিয়া ছিল ব্যাপক। এনআরকেকে তিনি বলেন, ‘বিশ্বের এখন একটু হাসির প্রয়োজন। আমরা ভেবেছি, এর জবাব দিই সদয় আচরণ আর সামান্য রসিকতা দিয়ে।’
অন্যদিকে, এপিকে এগোরোভা জানিয়েছেন, কয়েক বছর আগে বিশ্ব শৌচাগার দিবস উপলক্ষে একই ধরনের কিছু প্রচারসামগ্রী তৈরি করেছিল তাদের দল। এবার ট্রাম্পের মন্তব্যের পর সেগুলো নতুন করে ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে তারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারটি ব্যাপক ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে।
এপি জানায়, ভিজিট নরওয়ে ভবিষ্যতে আরও আকর্ষণীয় শৌচাগার তৈরির পরিকল্পনা করছে। এর মধ্যে ৬০টির বেশি গাছের শুকনো কাঠ ব্যবহার করে বনভিত্তিক নকশার একটি শৌচাগারও রয়েছে। নতুন স্থাপনাটির প্রচারে সংস্থাটি লিখেছে, ‘জীবনের সেরা বিরতির জন্য প্রস্তুত হন।’
ট্রাম্পের সঙ্গে সোনালি শৌচাগারের যোগসূত্র
ট্রাম্পের সঙ্গে শৌচাগার নিয়ে বিতর্কের ইতিহাসও কম নয়। ফোর্বস ও এপির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, চলতি বছরের শুরুর দিকে ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল মলে একটি শিল্পীগোষ্ঠী প্রতিবাদ হিসেবে সোনালি রঙের একটি শৌচাগার স্থাপন করেছিল। ট্রাম্পের হোয়াইট হাউস সংস্কারকাজের প্রতিবাদে ওই শিল্পকর্ম স্থাপন করা হয়।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেও এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল। হোয়াইট হাউসের ব্যক্তিগত আবাসিক অংশে প্রদর্শনের জন্য নিউইয়র্কের গুগেনহাইম জাদুঘর থেকে ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের একটি চিত্রকর্ম ধার চেয়েছিল হোয়াইট হাউস। কিন্তু জাদুঘরের প্রধান কিউরেটর উল্টো ১৮ ক্যারেট সোনার তৈরি একটি কার্যকর শৌচাগার ধার দেওয়ার প্রস্তাব দেন।
‘আমেরিকা’ নামের ওই শিল্পকর্মটি তৈরি করেছিলেন ইতালীয় শিল্পী মাউরিজিও ক্যাটেলান। অতিরিক্ত সম্পদ ও বিলাসিতাকে ব্যঙ্গ করে তৈরি করা হয়েছিল এটি।
পরে যুক্তরাজ্যের ব্লেনহেইম প্রাসাদে প্রদর্শনের সময় ২০১৯ সালে শৌচাগারটি চুরি হয়। এ ঘটনায় দুজনকে দোষী সাব্যস্ত করা হলেও শৌচাগারটির সন্ধান এখনো পাওয়া যায়নি।
