দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর লড়াই। ভারত ও পাকিস্তান মাঠে নামছে, অথচ গ্যালারিতে নেই সেই চেনা উত্তাপ। দর্শকদের চিৎকার, পতাকার দোল কিংবা মুহুর্মুহু গর্জনের বদলে চারপাশে ফাঁকা আসনের সারি। মাঠে দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের দুই পরিচিত প্রতিপক্ষের লড়াই চললেও গ্যালারির চিত্র বলছে ভিন্ন গল্প। প্রায় ২২ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার জাতীয় স্টেডিয়ামে ম্যাচ শুরুর দিকে দর্শকসংখ্যা পাঁচশও ছোঁয়নি!
অথচ এই ম্যাচের টিকিটের হিসাবেই রয়েছে পাঁচশ টাকার অঙ্ক। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের এক দিনের সাধারণ গ্যালারির টিকিটের দাম এক হাজার টাকা। সেই টিকিটে দেখা যাবে দুটি ম্যাচ। আয়োজকদের হিসাবে তাই প্রতি ম্যাচের দাম পাঁচশ টাকা। কিন্তু পাঁচশ টাকার সেই ম্যাচ দেখতে প্রথমার্ধ পর্যন্ত গ্যালারিতে পাঁচশ দর্শকও পাওয়া গেল না।শেষ দিকে দর্শকসংখ্যা কিছুটা বাড়লেও হাজার দেড়েকের বেশি হয়নি।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে এমন বিবর্ণ দৃশ্য দিয়েই শুরু হলো দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। উদ্বোধনী ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছে ভারত ও পাকিস্তান। উপমহাদেশের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর নাম শুনলেই যে উত্তাপের প্রত্যাশা থাকে, তার ছিটেফোঁটাও যেন নেই গ্যালারিতে। দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর ম্যাচেও দর্শকদের এই অনাগ্রহ প্রশ্ন তুলে দিয়েছে, স্বাগতিক বাংলাদেশের ম্যাচ ছাড়া সাফের বাকি খেলাগুলোতে কতটা দর্শক পাওয়া যাবে?
মাঠে খেলা দেখতে আসা অল্প কয়েকজনের মধ্যে ছিলেন হাজারীবাগের বাসিন্দা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী রাকিবুল হাসান। ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা থেকেই মাঠে আসার কথা জানিয়ে টিকিটের দাম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করলেন তিনি, ‘এক হাজার টাকা দিয়ে টিকিট কিনেছি। এর সঙ্গে আসা-যাওয়া আর খাওয়ার খরচও আছে। সব মিলিয়ে দেড় হাজার টাকার মতো খরচ হয়ে যাবে। কয়েকজন বন্ধু মিলে আসতে চেয়েছিলাম। কিন্তু টিকিটের দাম শুনে কেউ আসেনি। আমি খেলা ভালোবাসি বলে একাই চলে এসেছি। তিন-চারশ টাকা টিকিট হলে হয়তো ওরাও আসত।’
এক টিকিটে দুটি ম্যাচ দেখার সুযোগ থাকলেও সেটিকে খুব একটা সুবিধা মনে করছেন না মিরপুর থেকে আসা ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম। তার যুক্তি, বিকেলে ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ দেখতে এলেও রাতে বাংলাদেশের খেলা শেষ হওয়া পর্যন্ত স্টেডিয়ামে থাকা সবার পক্ষে সম্ভব নয়।
‘আয়োজকেরা বলছেন, এক হাজার টাকায় দুই ম্যাচ। কিন্তু আমার যদি একটা ম্যাচ দেখার ইচ্ছা থাকে, তাহলে কেন দুই ম্যাচের টাকা দেব? আবার বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত মাঠে থাকাও তো কঠিন। আলাদা ম্যাচের টিকিট রাখলে ভালো হতো। এমনিতে সাফ নিয়ে মানুষের আগ্রহ আগের মতো নেই, তার ওপর এত দাম রাখলে দর্শক আসবে কীভাবে?’ বলেন সাইফুল।
দর্শকদের এই প্রশ্নের উত্তর মেলানো কঠিন। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশের কাছে বিনোদনের পেছনে এক হাজার টাকা খরচ করা সহজ সিদ্ধান্ত নয়। পরিবারের তিনজনকে নিয়ে মাঠে আসতে চাইলে শুধু টিকিটেই গুনতে হবে তিন হাজার টাকা। এর সঙ্গে যাতায়াত ও খাবারের খরচ যোগ করলে অঙ্কটা আরও বাড়বে।
টিকিটের দাম নিয়ে সমালোচনা অবশ্য টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই হয়েছিল। ফুটবল সমর্থকেরা দাম কমানোর দাবি জানালেও শুরুতে তাতে সাড়া মেলেনি। শেষ মুহূর্তে এসে শিক্ষার্থীদের জন্য ৫০ শতাংশ ছাড়ের ঘোষণা দেওয়া হয়। ততক্ষণে টুর্নামেন্ট শুরু হতে বাকি এক দিনেরও কম।
সেই ছাড়ে পাঁচশ টাকার টিকিট কিনে মাঠে এসেছেন ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী তানভীর আহমেদ। কিন্তু অর্ধেক দামেও টিকিট কেনাকে ব্যয়বহুল মনে করছেন তিনি, ‘এক হাজার টাকা দিয়ে তো আমাদের মতো শিক্ষার্থীদের খেলা দেখা সম্ভব না। অর্ধেক দামে পেয়েছি বলেই এসেছি। কিন্তু পাঁচশ টাকাও অনেক বেশি। যাতায়াত আর খাওয়ার খরচ মিলিয়ে সাত-আটশ টাকা লেগে যাবে। আমরা তো চাই মাঠে এসে খেলা দেখতে। কিন্তু এত টাকা খরচ করে প্রতিদিন আসা সম্ভব নয়। আর সত্যি বলতে, বাংলাদেশ ছাড়া সাফের অন্য ম্যাচগুলো নিয়ে খুব বেশি আগ্রহও নেই। ভারতও তাদের মূল দল পাঠায়নি।’
শিক্ষার্থীর এই শেষ কথাতেই উঠে এসেছে সাফের আকর্ষণ কমে যাওয়ার আরেকটি কারণ। এবারের প্রতিযোগিতায় নিজেদের মূল শক্তির দল পাঠায়নি বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ভারত। দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে তারা বরাবরই অন্যতম বড় আকর্ষণ। সবচেয়ে বেশি নয়বারের চ্যাম্পিয়নও তারা। শুধু ভারত নয়, ফিফার নিষেধাজ্ঞার কারণে এবারের সাফে নেই নেপালও।
তবে সাফ নিয়ে দর্শকদের আগ্রহ কমে যাওয়ার পেছনে শুধু দলগুলোর শক্তিমত্তা কিংবা টিকিটের দামকে দায়ী করলে পুরো চিত্রটা পাওয়া যাবে না। আয়োজনের প্রচার-প্রচারণার ঘাটতিও চোখে পড়ার মতো। স্টেডিয়ামের বাইরে বেশ কিছু উৎসুক দর্শকদের দেখা গেল। এরমধ্যে একজন নারায়ণগঞ্জ নিবাসী মোর্শেদ হাসান যাচ্ছিলেন নিজ বাড়িতে। খেলা দেখতে আসা একজনের কাছ থেকে জানতে পেরেছেন সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ হচ্ছে ঢাকায়।
অথচ আট বছর পর ঢাকায় ফিরেছে দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা। কিন্তু রাজধানীতে সেই উৎসবের আবহ নেই বললেই চলে। নেই পর্যাপ্ত ব্যানার-ফেস্টুন, নেই দর্শক টানার বড় কোনো প্রচার। দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই যে ঢাকায় বসছে, শহরের চেহারা দেখে সেটি বোঝার উপায় খুব কম।
পল্টনের বাসিন্দা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মেহেদী হাসান ফুটবলের নিয়মিত দর্শক। কিন্তু সাফ ঘিরে প্রচারের ঘাটতি চোখে পড়েছে তারও, ‘আগে সাফ হলে একটা উৎসবের মতো লাগত। বিভিন্ন দেশের খেলা দেখতে মানুষ মাঠে আসত। এবার তো তেমন কিছুই চোখে পড়ছে না। অনেকেই ঠিকমতো জানে না কবে কার খেলা। ভারত–পাকিস্তানের ম্যাচেও যদি এত কম দর্শক থাকে, তাহলে অন্য ম্যাচগুলোতে কী হবে? টিকিটের দাম কমানোর পাশাপাশি প্রচারটাও দরকার ছিল।’
অথচ বাংলাদেশের ফুটবলে সাম্প্রতিক সময়ে দর্শকদের আগ্রহের কমতি দেখা যায়নি। হামজা চৌধুরী জাতীয় দলে যোগ দেওয়ার পর থেকে ফুটবল ঘিরে নতুন উন্মাদনা তৈরি হয়েছে। জাতীয় দলের ম্যাচে গ্যালারি ভরেছে, টিকিটের চাহিদাও বেড়েছে। সেই দর্শকদেরই সাফের উদ্বোধনী ম্যাচে খুঁজে পাওয়া গেল না।
অবশ্য বাংলাদেশের ম্যাচ ঘিরে চিত্রটা বদলে যাওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে। উদ্বোধনী দিনের দ্বিতীয় ম্যাচে রাত আটটায় ভুটানের বিপক্ষে মাঠে নামবে স্বাগতিকেরা। হামজাদের খেলা দেখতে দর্শকসংখ্যা বাড়ার সম্ভাবনাই বেশি। কিন্তু শুধু বাংলাদেশের ম্যাচেও গ্যালারী কোনো সম্ভাবনা নেই। আর শুধু স্বাগতিকদের ম্যাচে গ্যালারী ভরলেই কি একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট সফল হয়ে যায়?
মাঠে ফুটবল চলছে, দুই দলের খেলোয়াড়েরা লড়াই করছেন জয়ের জন্য। কিন্তু তাদের ঘিরে দর্শকদের চিৎকার নেই, গ্যালারির সেই চেনা গর্জনও নেই। বিশাল স্টেডিয়ামের ফাঁকা আসনগুলোই যেন হয়ে উঠেছে উদ্বোধনী ম্যাচের সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো দৃশ্য। দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরের শুরুতে এর চেয়ে বড় আক্ষেপ আর কী হতে পারে!
