যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটগ্রহণ চলছে। নির্বাচনের ফল ওয়াশিংটনে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারে। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এ নির্বাচনে লড়ছে মূলত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি ও বিরোধী ডেমোক্র্যাটিক পার্টি।
ভোটগ্রহণ বন্ধ হওয়ার পর চূড়ান্ত ফল পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে। এমনকি ফলাফল নিয়ে প্রাথমিক ধারণা পেতেও কয়েক ঘণ্টা, কয়েক দিন, এমনকি কয়েক সপ্তাহ লেগে যেতে পারে।
আজ মঙ্গলবার বিবিসির প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।
ফল কখন আসতে শুরু করবে?
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আইনসভার নাম কংগ্রেস। এটি দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। নিম্নকক্ষের নাম হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস বা প্রতিনিধি পরিষদ এবং উচ্চকক্ষের নাম সিনেট।
প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে কোনো দলকে ২১৮টি আসন পেতে হবে। সিনেটে সরাসরি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে প্রয়োজন ৫১টি আসন। তবে উচ্চকক্ষে দুই দলের আসনসংখ্যা ৫০-৫০ হলে ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্ণায়ক ভোট দিতে পারেন। এর ফলে ভাইস প্রেসিডেন্ট যে দলের, সেই দল সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইস্টার্ন স্ট্যান্ডার্ড টাইম (ইএসটি) সন্ধ্যা ৬টার (বাংলাদেশ সময় বুধবার ভোর ৫টা) পর প্রাথমিক ফল আসতে শুরু করবে। তবে এসব ফল থেকে সামগ্রিক চিত্র সম্পর্কে খুব বেশি ধারণা পাওয়া যাবে না। কারণ, প্রথম দিকে ফল আসবে এমন কিছু রাজ্য থেকে, যেগুলো রিপাবলিকানদের (কেন্টাকি ও ইন্ডিয়ানা) অথবা ডেমোক্র্যাটদের (ভারমন্ট) শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমগুলো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আসনের ফল নিয়ে আগাম পূর্বাভাস দিতে শুরু করতে পারে। পূর্ণাঙ্গ ভোট গণনা শেষ হওয়ার আগেই কোনো রাজ্যে কোন দল জয়ী হয়েছে, তা অনুমান করতে তারা বিভিন্ন মডেল ব্যবহার করে।
কোনো দল বা প্রার্থী সুস্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে গেলে সংবাদমাধ্যমগুলো ওই আসনের বিজয়ীর নাম ঘোষণা করে। তবে যেসব রাজ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা খুব কাছাকাছি, সেসব রাজ্যের ফল নিয়ে পূর্বাভাস দিতে সংবাদমাধ্যমগুলোর অনেক সময় লাগতে পারে।
সামগ্রিক ফল কখন জানা যাবে, তা নির্ভর করবে আসনগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কতটা তীব্র এবং কোন আসনগুলোর ফল শেষ পর্যন্ত নির্ণায়ক হয়ে ওঠে, তার ওপর।
ভোটকেন্দ্র কখন বন্ধ হবে?
যুক্তরাষ্ট্রের ইস্টার্ন স্ট্যান্ডার্ড টাইম বিকেল ৫টায় (বাংলাদেশ সময় বুধবার ভোর ৪টা) বুথফেরত জরিপের ফল প্রকাশ করা হবে। এতে ভোটারদের কাছে কোন বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে।
বাংলাদেশ সময় বুধবার ভোর ৫টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকায় পর্যায়ক্রমে ভোটগ্রহণ শেষ হবে।
ইস্টার্ন স্ট্যান্ডার্ড টাইম সন্ধ্যা ৬টায় (বাংলাদেশ সময় বুধবার ভোর ৫টা) কেনটাকি ও ইন্ডিয়ানার কিছু এলাকায় প্রথম ভোটকেন্দ্র বন্ধ হবে। এরপর সবার নজর থাকবে গুরুত্বপূর্ণ সাতটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজ্যের দিকে।
সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় বুধবার সকাল ৬টা ৩০ মিনিট) ওহাইওতে ভোটগ্রহণ শেষ হবে। গুরুত্বপূর্ণ এ রাজ্যের ফল থেকে নির্বাচনের সামগ্রিক গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
রাত ৮টায় (বাংলাদেশ সময় বুধবার সকাল ৭টা) মেইন, মিশিগান, কানসাস ও টেক্সাসের অধিকাংশ এলাকায় ভোটগ্রহণ শেষ হবে।
রাত ৯টায় (বাংলাদেশ সময় বুধবার সকাল ৮টা) আইওয়া এবং ইস্টার্ন স্ট্যান্ডার্ড টাইম জোনের আওতায় থাকা মিশিগানের বাকি অংশে ভোটগ্রহণ শেষ হবে। একই সময়ে কানসাস ও টেক্সাসের বাকি ভোটকেন্দ্রগুলোও বন্ধ হবে।
এরপরের কয়েক ঘণ্টায় রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাটদের জন্য নির্বাচনের পরিস্থিতি পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোচ্ছে কি না, তার চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
রাত ১টায় (বাংলাদেশ সময় বুধবার দুপুর ১২টা) আলাস্কার শেষ ভোটকেন্দ্রগুলোতে ভোটগ্রহণ শেষ হবে।
ভোট গণনা কীভাবে হয়?
প্রতিটি রাজ্য নিজস্বভাবে নির্বাচন পরিচালনা করে। রাজ্যভিত্তিক ভোট গণনা ও বিশ্লেষণের নিয়মও আলাদা।
কোন ভোটগুলো আগে গণনা করা হবে, তা একেক রাজ্যে একেক রকম। ফ্লোরিডার মতো কিছু রাজ্যে নির্বাচনের দিন আসার আগেই আগাম ও ডাকযোগে পাঠানো ব্যালটের হিসাব নেওয়া হয়। অন্য কয়েকটি রাজ্যে ৩ নভেম্বরের আগে ব্যালট গণনা শুরুই হবে না।
স্থানীয় নির্বাচন কর্মকর্তারা প্রতিটি ভোট যাচাই, প্রক্রিয়াকরণ ও গণনা করেন।
অধিকাংশ রাজ্যে নির্বাচনের পর আনুষ্ঠানিক অডিট বাধ্যতামূলক। এ প্রক্রিয়ায় ব্যালটের নমুনা হাতে গুনে বা অন্য পদ্ধতিতে ভোট গণনার যন্ত্রের ফলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। তবে এ বিষয়ে রাজ্যভেদে নিয়ম আলাদা। সাধারণত পুনর্গণনার প্রয়োজন হলেই কেবল সব ব্যালট হাতে গোনা হয়।
প্রতিটি রাজ্য ও স্থানীয় প্রশাসনের এ বিষয়ে বিস্তারিত নিয়ম রয়েছে।
কোন কারণে ফল প্রকাশে দেরি হতে পারে?
প্রতিদ্বন্দ্বিতা খুব কাছাকাছি হলে ভোট গণনায় বেশি সময় লাগবে। এ ক্ষেত্রে পুনর্গণনা এবং আইনি চ্যালেঞ্জের সম্ভাবনাও তৈরি হয়। ডাকযোগে পাঠানো ব্যালট গণনা করতে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি সময় লাগে। কারণ, কর্মকর্তাদের খাম থেকে ব্যালট বের করে ভোটারের স্বাক্ষর যাচাই করতে হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ৩০টির বেশি রাজ্যে নির্বাচনের দিন আসার আগেই ব্যালট নিয়ে কাজ শুরু হয়। তবে অন্য রাজ্যগুলোতে এ সুযোগ নেই। ফলে সেখানে ফল পেতে কয়েক দিন লেগে যেতে পারে।
এ ছাড়া নির্বাচনের ফল নিয়ে আনুষ্ঠানিক আপত্তি আসতে পারে। পাশাপাশি, কোনো প্রার্থী চাইলে নির্বাচনের ফলের বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জ জানাতে পারেন। এ ধরনের কোনো ঘটনায় ফল প্রকাশে আরও দেরি হতে পারে।
বিজয়ীরা কখন দায়িত্ব গ্রহণ করবেন?
কংগ্রেসের বিদায়ী সদস্যদের মেয়াদ ২০২৭ সালের ৩ জানুয়ারি শেষ হবে। দিনটি সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পড়ায় কংগ্রেস আইন করে অন্য কোনো তারিখ নির্ধারণ না করলে নতুন সদস্যদের মেয়াদও একই দিন শুরু হবে।
ট্রাম্প ও তার দলের ওপর নির্বাচনের প্রভাব
মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পদ বা মেয়াদের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে না।
রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদ বা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারালেও প্রেসিডেন্ট পদ হারাবেন না ট্রাম্প। কারণ, এ নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয় না; তার চার বছরের মেয়াদ শেষ হবে ২০২৯ সালের জানুয়ারিতে।
তবে রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কংগ্রেসের এক বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে ট্রাম্পের ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে বড় বাধা তৈরি হতে পারে। প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেলে ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত, শুনানি ও তলবের ক্ষমতা পাবেন। আর সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেলে মন্ত্রিসভার সদস্য ও বিচারক নিয়োগসহ প্রেসিডেন্টের গুরুত্বপূর্ণ মনোনয়ন আটকে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। বাজেট ও সরকারি ব্যয় নিয়েও দুই পক্ষের সংঘাত বাড়তে পারে।
তবে ট্রাম্পের নির্বাহী ক্ষমতা ও কোনো আইনে ভেটো দেওয়ার অধিকার বহাল থাকবে। অর্থাৎ, মধ্যবর্তী নির্বাচনে হারলেও ট্রাম্প ক্ষমতায় থাকবেন, কিন্তু তার বাকি মেয়াদে নীতি বাস্তবায়ন ও প্রশাসন পরিচালনা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
