চট্টগ্রামের নিউমার্কেট থেকে সিটি কলেজের দিকে চলে যাওয়া সড়কটির দুপাশে ইলেকট্রনিকস যন্ত্রাংশ বিক্রির সারি সারি দোকান। এ সড়কের শেষ মাথা গিয়ে মিলেছে স্ট্র্যান্ড রোডের সঙ্গে।
সাধারণ মানুষের কাছে সড়কটি ‘আইস ফ্যাক্টরি রোড’ নামে পরিচিত। তবে এর পোশাকি নাম ‘শহীদ রফিক আহম্মদ সড়ক’। এখন অবশ্য এই নামে সড়কটিকে কেউ চেনেন না। অথচ মুক্তিযুদ্ধে এই সড়কের সঙ্গে মিশে আছে গেরিলা যুদ্ধের আত্মত্যাগের এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস।
সেই ইতিহাসের স্মৃতিচিহ্ন বহন করছে সড়কের একপাশে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর চট্টগ্রামের স্থাপিত একটি স্মৃতিফলক। যদিও সময়ের সঙ্গে সেই ফলকটিও অনাদরে মলিন হয়ে পড়েছে।
কিন্তু কে এই রফিক আহম্মদ? কেনই-বা তার নামে সড়কটির নামকরণ করা হয়েছিল? এই শহীদ মুক্তিযোদ্ধার শেষ ঠিকানাই বা কোথায় হয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কথা হয় নগরের কয়েকজন গেরিলা মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে।
তাদের একজন মুক্তিযুদ্ধকালে চট্টগ্রাম নগরের বিস্ফোরক প্রধান ও কেসি-৩ গ্রুপের কমান্ডার ডা. মাহফুজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় চট্টগ্রাম শহরে অন্তত ৫০০ গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা চার শতাধিক অপারেশনে অংশ নিয়েছিলেন। একক কোনো নগর হিসেবে এখানেই সবচেয়ে বেশি গেরিলা অপারেশন চালিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধারা।’
একাত্তরে চট্টগ্রামের সেই দুর্ধর্ষ গেরিলাদের অন্যতম ছিলেন কমার্স কলেজের ছাত্রনেতা সৈয়দ রফিক আহম্মদ। মুক্তিযুদ্ধের ১ নভেম্বর এই আইস ফ্যাক্টরি সড়কে গেরিলা অপারেশনে শহীদ হন তিনি।
সেই অপারেশনে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছিলেন আরও চারজন গেরিলা যোদ্ধা। তাদের মধ্যে এখন কেবল ফজলুল হক ভুঁইয়া বেঁচে আছেন। রফিক আহম্মদের কথা বলতে গিয়ে তার চোখ ভিজে আসে।
ফজলুল হক ভুঁইয়ার স্মৃতিচারণা এবং জামাল উদ্দিনের লেখা ‘মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম শহর ও জয় বাংলা’ গ্রন্থ থেকে ‘অপারেশন আইস ফ্যাক্টরি’ সম্পর্কে জানা যায়।
মুক্তিযুদ্ধের নভেম্বর মাস। একের পর এক অপারেশনে তখন নিদারুণ অর্থসংকটে পড়েছেন চট্টগ্রামের গেরিলারা। অস্ত্র জোগাড় হলেও রসদের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। মুক্তিযোদ্ধারা ঠিক করলেন যে করেই হোক তাদের অর্থ জোগাড় করতে হবে।
৩০ বা ৩১ অক্টোবর মুক্তিযোদ্ধারা গোপন সূত্রে জানতে পারেন, ১ নভেম্বর সকাল ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে নিউমার্কেটের স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান থেকে চট্টগ্রাম কাস্টমসের প্রায় ২ লাখ টাকা কাস্টম হাউসে নিয়ে যাওয়া হবে।
তখন নগরের নেতৃত্বস্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা ঝটিকা অভিযান চালিয়ে টাকাগুলো সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী ঠিক করা হয়, গাড়ি ঠিক করার বাহানায় একটি গাড়ি আগে থেকেই জিওপির সামনে রাখা হবে। একজন মুক্তিযোদ্ধা গোপনে স্টেট ব্যাংকের কাছে এবং আরেকজন কোতোয়ালির মোড়ে অবস্থান নেবেন। গাড়িটি বের হওয়ার সময় সংকেত হিসেবে একজন মুক্তিযোদ্ধা ছাতা খুলবেন। যেন বাকিরা বুঝতে পারে গাড়িটি বের হচ্ছে। এরপর টাকা বহনকারী মাইক্রোবাসটি আইস ফ্যাক্টরি রোডের সামনে এলেই অপেক্ষায় থাকা গাড়িটি দিয়ে তার পথ আটকানো হবে।
সিদ্ধান্ত হয়, ডা. জাফরুল্লাহর নেতৃত্বে অপারেশনটি করবেন রফিক আহম্মদ, শফিউল বশর, ফজলুল হক ভুঁইয়া ও অমল মিত্র। গাড়ি চালাবেন ভোলানাথ।
১ নভেম্বর সকালে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পরও গাড়িটির সন্ধান না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েন মুক্তিযোদ্ধারা। একপর্যায়ে ডা. জাফরুল্লাহ গাড়ি থেকে নেমে পড়েন।
বাকি মুক্তিযোদ্ধারা গাড়িটি নিয়ে নিউমার্কেটের কাছে আসতেই পণ করেন, একটি অপারেশন করেই তারা ফিরবেন। এমন সময় নিউমার্কেটের আইডিয়াল বুক স্টলের সামনে এক পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাকে ম্যাগাজিনের পাতা উল্টাতে দেখতে পান তারা। তার কোমরে একটি পিস্তল রাখা ছিল।
অপারেশনে অংশ নেওয়া ফজলুল হক ভুঁইয়া দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমরা তখন সিদ্ধান্ত নিলাম, সেই অফিসারকে গুলি করে রিভলবার নিয়ে আমরা চলে যাব। কিন্তু কিছু দূর দূরেই দেখতে পেলাম নিউমার্কেটের একপাশে একটি গাড়িতে চারজন আর্মি বসা। তখন আমি বললাম, এই অবস্থাতে অপারেশন করা ঠিক হবে না। আমরা চলে যাই। কিন্তু রফিক আর শফিউল বশর অপারেশন করবেই বলে গাড়ি থেকে নেমে গেল। আমরা গাড়িটা আরেকটু সামনে আনতেই দেখলাম রফিক ও শফিউল বশর সরাসরি গুলি করল। সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আর্মিও ফায়ার শুরু করল।’
এমন পরিস্থিতিতে বাকি মুক্তিযোদ্ধারাও পাল্টা গুলি শুরু করেন। মুহূর্তেই দুই পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বেধে যায়। শুরুতেই গুলিবিদ্ধ হন শফিউল বশর। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটার সিদ্ধান্ত নেন। তখন পাকিস্তানি সেনাদের গাড়িটি তাদের ধাওয়া করে।
একপর্যায়ে গাড়িটি নিয়ে আইস ফ্যাক্টরির দিকে এগোতেই উল্টো দিক থেকে আসা পাকিস্তান নৌবাহিনীর আরেকটি গাড়ি থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর অবিশ্রান্ত গুলিবর্ষণ শুরু হয়। এমন দ্বিমুখী আক্রমণে মুক্তিযোদ্ধাদের গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশে হেলে পড়ে।
ফজলুল হক ভুঁইয়া বলেন, ‘গুলিবিদ্ধ হয়ে শুরুতেই সরে যায় ড্রাইভার ভোলানাথ। রফিকও এ সময় গুলি খায়। শফিউল বশর দ্বিতীয় দফায় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। তখন শফিউল বশর আর অমল মিত্রকে বললাম, “আমরা দুজন সামলাচ্ছি।”’
পাল্টা গোলাগুলিতে গাড়ির পুরো অংশ ঝাঁঝরা হয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই নিহত হয় বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি হানাদার সেনা। এ সময় ফজলুল হক ভুঁইয়া তার সাবমেশিনগান নিয়ে অবিশ্রান্তভাবে গুলি চালিয়ে যান। অন্যদিকে গুরুতর আহত অবস্থাতেও গুলি চালিয়ে যাচ্ছিলেন রফিক। প্রচণ্ড গোলাগুলির মধ্যে এক ঝাঁক গুলি এসে রফিকের বুকে ও পিঠে লাগে। বিদীর্ণ হয়ে যায় তার বুক। সড়কেই পড়ে থাকে শহীদ রফিকের নিথর দেহ।
যুদ্ধের একপর্যায়ে গুরুতর আহত অবস্থায় ধরা পড়েন শফিউল বশর। ১৬ ডিসেম্বর তাকে জীবিত অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে উদ্ধার করেন মুক্তিযোদ্ধারা।
শহীদ রফিক আহম্মদের মরদেহ পরে চৈতন্য গলির বাইশ মহল্লা কবরস্থানে দাফন করা হয়। তবে স্বাধীনতার পর আজ পর্যন্ত সেই কবরটি চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি বলে জানান চট্টগ্রামের গেরিলা মুক্তিযোদ্ধারা।
কেবল শহীদ রফিকের অসীম বীরত্বের সাক্ষ্য বহন করছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর চট্টগ্রামের সেই স্মৃতিফলকটিই।
