ফিলিস্তিন ও নিরাপত্তা প্রশ্নে নেতানিয়াহু আর আইসেনকট একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ—এমন কথা অনেকেই বলেন। এমন কথা বলার পেছনে যথেষ্ট যুক্তিও আছে। একজন ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। অপরজন সেই প্রধানমন্ত্রীর শাসনামলে দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল হিসেবে কাজ করেছেন। এমনকি নেতানিয়াহুর যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভাতেও যোগ দিয়েছিলেন আইসেনকট।
যার ফলে, ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পেলে দেশটির ভূরাজনৈতিক কৌশল বা আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, ফিলিস্তিনের প্রতি ইসরায়েলের নীতিতে কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে, এমন ভাবার তেমন যুক্তি নেই।
অর্থাৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন বা অন্য কোনো ইতিবাচক খবর পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। বরং বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করেছেন, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন নিয়ে তিনি বিন্দুমাত্র আগ্রহী নন।
১৯৭৮ সালে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ‘গোলানি ব্রিগেডে’ যোগ দেন গাদি আইসেনকট। ৪০ বছরের ক্যারিয়ারে ২০১৫ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত নেতানিয়াহুর সরকারে আইডিএফ প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে ২০২২ সালে রাজনীতিতে ক্যারিয়ার শুরু করেন আইসেনকট। সঙ্গে ছিলেন অপর সাবেক আইডিএফ প্রধান বেনি গ্যান্টজ।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলি ভূখণ্ডে ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাসের হামলার পর গ্যান্টজ ও আইসেনকট দুজনই নেতানিয়াহুর যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় যোগ দেন।
তবে ২০২৪ সালের জুনে দুজনই মন্ত্রিসভা ছেড়ে যান। দাবি করেন, যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ইসরায়েলের কৌশল নিয়ে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে।
তত দিনে ‘হামাসের বিরুদ্ধে’ ইসরায়েলের যুদ্ধ আইসেনকটের ব্যক্তিগত লড়াইয়ে রূপান্তরিত হয়েছে।
৭ অক্টোবর হামলার দুই মাস পর, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গাজায় নিহত হন সাবেক জেনারেলের ছোট ছেলে গাল আইসেনকট (২৫)।
অল্প সময়ের মধ্যে তার পরিবারের আরও দুই সদস্য নিহত হন। একজন তার বোনের ছেলে, অপরজন তার স্ত্রীর বোনের ছেলে। তার ভাইয়ের ছেলেও এই যুদ্ধে আহত হয়েছেন। একইসঙ্গে হারিয়েছেন কয়েকজন সহযোদ্ধা ও বন্ধুদেরও।
গত ২৮ অক্টোবর সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনীতিতে আসার আগে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ক্রমবর্ধমান ইসরায়েলি আধিপত্য নিয়ে সতর্ক করেছিলেন আইসেনকট। তিনি মত দেন, এমন বিভাজন জায়নবাদের মৌলিক ধারণার পরিপন্থি।
তবে ৭ অক্টোবর হামলার পর তিনি ভিন্ন সুরে কথা বলেন। মূলত সে সময় থেকেই তিনি ফিলিস্তিনি-ইসরায়েলিদের সহাবস্থানের ‘দুই-রাষ্ট্র’ সমাধানকে নাকচ করতে শুরু করেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যারা এখনো দুই-রাষ্ট্র সমাধানের ধারণাকে এগিয়ে নিতে চাইছেন, তাদের ‘মতিভ্রম’ হয়েছে।
তবে দুই-রাষ্ট্র সমাধানের বিকল্প হিসেবে পুরো অঞ্চলের জন্য কোনো পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক সমাধান তিনি তুলে ধরেননি।
২৫ অক্টোবর টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আইসেনকট জানান, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনে আপত্তি থাকলেও এক রাষ্ট্রভিত্তিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ বিপদের সম্ভাবনাকে তিনি উড়িয়ে দিচ্ছেন না।
তিনি মত দেন, ইসরায়েলকে সে ক্ষেত্রে লাখো ফিলিস্তিনিকে নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এতে দেশটিতে ইহুদিদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে যেতে পারে। অন্যথায় তাদের এসব অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে হবে, যা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলের দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
ইসরায়েলি কট্টর নেতা বেজালেল স্মৎরিচ ও ইতামার বেনগভির গাজায় স্থায়ী ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণের যে ধারণা বারবার সামনে নিয়ে আসতে চান, তার সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন বলে জানান আইসেনকট।
আইসেনকট মত দেন, এমন পরিণতি এড়াতে অধিকৃত পশ্চিম তীরকে ঘিরেই ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ গড়তে হবে। তার প্রস্তাব অনুযায়ী, মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বাধীন ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে ঢেলে সাজাতে হবে, যাতে ফিলিস্তিনিদের স্বশাসনের সুযোগ তৈরি হয়। তবে ওই অঞ্চলের সামরিক নিয়ন্ত্রণ ইসরায়েলের হাতেই থাকতে হবে।
গাজার ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তিনি ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনার প্রতিও সমর্থন জানিয়েছেন। ওই পরিকল্পনা অনুযায়ী, একটি টেকনোক্র্যাটিক ফিলিস্তিনি প্রশাসন গাজা শাসন করবে। সুনির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে আলাদা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রও গঠিত হতে পারে।
চলতি বছরের ১১ অক্টোবর ইসরায়েলের চ্যানেল সেভেনের পডকাস্টে আইসেনকট আবারও তার দুই-রাষ্ট্রবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।
‘দুই জনগোষ্ঠীর জন্য দুটি রাষ্ট্র—এটি ভুল সমাধান’, যোগ করেন তিনি।
‘একইসঙ্গে আমি মনে করি, পশ্চিম তীরে ২৮ লাখ ফিলিস্তিনিকে বা গাজার ২০ লাখ ফিলিস্তিনিকে ইসরায়েলের অংশ করে নেওয়া বিপর্যয় সৃষ্টি করবে। আমি সেটাও চাই না’, যোগ করেন তিনি।
তিনি নেতানিয়াহুর ‘বৃহত্তর ইসরায়েলের’ পরিকল্পনারও বিরোধিতা করেন।
তিনি বলেন, ‘আমি এমন একটি রাষ্ট্র চাই, যেটা ইহুদিদের মাতৃভূমি হবে। সেখানে ইহুদিদের স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকবে। এটি একটি শক্তিশালী ও আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র হবে।’
তবে এসব সমস্যা তুলে ধরলেও দুই-রাষ্ট্র সমাধানের কোনো বিকল্প তুলে ধরেননি আইসেনকট।
২৭ আগস্ট জেরুসালেম পোস্টে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি ফিলিস্তিনিদের স্বশাসনের ধারণাকে ‘মাইনাস স্টেট’ আখ্যা দেন। তিনি দাবি করেন, ৭ অক্টোবরের হামলার পর ফিলিস্তিনিদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র গঠনের ‘প্রশ্নই ওঠে না’।
এর আগে ২২ আগস্ট সামাজিক মাধ্যম এক্সে রা’আম পার্টির চেয়ারম্যান মনসুর আব্বাসের এক পোস্টের জবাবে তিনি জানান, ‘ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের কোনো অস্তিত্ব নেই। তিনি যদি সরকার গঠন করেন, তাহলে সে সরকারের অধীনেও ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না।’
সব মিলিয়ে ধারণা করা যায়, ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে আইসেনকট কিছু কিছু ক্ষেত্রে নেতানিয়াহু ও তার মিত্রদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করলেও সার্বিকভাবে তিনি আগের সরকারের ফিলিস্তিনি নীতিকেই সামনে এগিয়ে নেবেন—এমনটাই ধরে নেওয়া যায়।
