স্কুল আছে তো শিক্ষক নেই। শিক্ষক আছে তো শ্রেণিকক্ষে চেয়ার-টেবিল নেই। শ্রেণিকক্ষে চেয়ার-টেবিল আছে তো পাখা নেই; এসি ‘দূর-কা-বাত’। আবার কোনো স্কুলের শ্রেণিকক্ষে পাখা আছে তো ছাদ ফুটো, বৃষ্টি হলে পানি পড়ে!—এ হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম সামরিক পরাশক্তি, উন্নত ও ইউরোপের তৃতীয় এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ফ্রান্সের শিক্ষাঙ্গনের চিত্র।
এসব দেখে দেশটির শিক্ষার্থীরা ক্ষেপে যায়। গত সেপ্টেম্বরে তারা রাস্তায় নেমে প্রথমে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করেছিল। শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছিল। সরকার প্রথমে নীরব থাকে। ফলে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে ফ্রান্সের শহরগুলোয়।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে পর্যায়ক্রমে যোগ দেয় দেশটির বেকার-গৃহহীন মানুষ। গতি পায় আন্দোলন। পুলিশ হস্তক্ষেপ করে সেসব অনুমোদনহীন আন্দোলন দমাতে। এক পর্যায়ে অহিংস আন্দোলন সহিংস হয়ে উঠে। এতটাই সহিংস হয় যে দৃষ্টি পড়ে বিশ্বমিডিয়ার।
পরে মুখ খোলেন দেশটির রাষ্ট্রপতি এমানুয়েল মাখোঁ। বলেন, ফ্রান্সে ‘সহিংসতার কোনো স্থান নেই’। কঠোর ব্যবস্থা হিসেবে কোথাও কোথাও সেনা নামে, কারফিউ জারি হয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যে কারণে এমন সহিংস আন্দোলন সেসব কারণ দূর করতে প্রকাশ্যে কোনো দিক নির্দেশনা দিতে শোনা যাচ্ছে না ফরাসি রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীকে।
এরই মধ্যে, বিক্ষোভকারীরা মধ্য ফ্রান্সের দৃষ্টিনন্দন লিমোজ শহরের ঐতিহাসিক ‘টাউন হল’ পুড়িয়ে দিলে সেই আগুনের ‘উত্তাপ’ নিয়ে আলোচনা শুরু হয় দেশে দেশে।
সাংস্কৃতিক দিক থেকে লিমোজ শহরটি ইউনেস্কোর ‘সৃজনশীল’ শহরের তালিকাভুক্ত। ১৮৮৩ সালে তৈরি এই শহরের ‘নব্য রেনেসাঁ’ শৈলীর টাউন হল ভবনটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মান নাৎসিদের হাত থেকে রক্ষা পেলেও, এবারের বিক্ষোভকারীদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। ক্ষোভের আগুনে পুড়ে যায় শহরের ঐতিহাসিক ভবনটি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রান্সে রাষ্ট্রপতির তুলনায় বেশি গুরুত্ব রাখেন শহরের মেয়ররা। নির্বাচিত মেয়রদের হাতে প্রচুর ক্ষমতা থাকে। সেই দেশে টাউন হলগুলোকে দেখা হয় গণতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে। এই টাউন হলগুলো ফ্রান্সকে ‘ফ্রান্স’ করে তুলেছে। তাই ফরাসি দেশে একটি টাউন হল পুড়িয়ে দেওয়ার মানে দাঁড়ায় গণতন্ত্রের ওপর সরাসরি আক্রমণ।
সবাই জানেন যে, বিপ্লবের দেশ হিসেবে ফ্রান্সের খ্যাতি জগৎ-জোড়া। যে ফরাসি বিপ্লবের বাণীতে উজ্জীবিত বিশ্ববাসী, সেই ফরাসি দেশে বিপ্লব শেখানো হয় হাইস্কুল থেকেই।
অর্থাৎ, ফরাসিদের জীবনে বিক্ষোভ জড়িয়ে আছে ওতপ্রোতভাবে। দেশটির হাইস্কুলেই পাওয়া যায় বিক্ষোভ-সমাবেশের শিক্ষা। এসব কথা অন্য দেশের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অনেক শিক্ষার্থীর জানা।
ফ্রান্স মানেই গণআন্দোলন। ফরাসিরা জানেন, দাবি আদায় করতে হয় রাজপথে নেমেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফরাসিদের রাজনৈতিকভাবে সচেতন রাখতে রাষ্ট্রযন্ত্রই সহায়তা করে। তবে আন্দোলন সহিংস হলেই সমস্যা।
কিন্তু, সব সময় তো আর রাগ-ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে থাকে না। তাই ‘বিপ্লবী’ ফরাসিদের অহিংস আন্দোলন সহিংস হয়ে উঠলে তা বিশ্ববাসীর নজর কাড়বে সেটাই স্বাভাবিক।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, প্রায় ৬ লাখ মানুষ দেশটির আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল। যদিও আয়োজকদের দাবি, ৮ লাখের মতো মানুষ আন্দোলনে নেমেছিলেন।
ফ্রান্সের এই বিক্ষোভ-সমাবেশ থেকে গ্রেপ্তার ২ হাজারের বেশি। আন্দোলন দমনে অন্তত ১৫০ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। এত বড় আন্দোলনে এত কম সংখ্যক মানুষের আহত হওয়ার ঘটনাকে সে দেশের প্রধানমন্ত্রী ‘অলৌকিক’ বলে মন্তব্য করেছেন।
প্রায় প্রতি গ্রীষ্মেই ইউরোপ থেকে দাবানলের সংবাদ আসে। এবার শরতে এলো এক ‘দাবানলের’ খবর। এই দাবানল প্রাকৃতিক নয়, রাজনৈতিক। গত ২০ অক্টোবর জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়—‘জনরোষে পুড়ছে ইউরোপ!’
সহিংস আন্দোলনের শুরু ফ্রান্সে হলেও সেখানকার আন্দোলনের ‘আগুন’ ইউরোপের অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগেনি। গত ১৮ সেপ্টেম্বর ফ্রান্সে আন্দোলন শুরু হলেও তা দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য প্রতিবেশী ও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোয়।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে—ফ্রান্সের পাশাপাশি বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে বেলজিয়াম, স্পেন, ইতালি, পর্তুগাল ও আলবেনিয়ায়। গত ১৭ অক্টোবর আল জাজিরা জানায়—গ্রিস, জার্মানি ও অস্ট্রিয়াতে বিক্ষোভ প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। আসন্ন দিনগুলোয় সেসব দেশে আন্দোলন আরও বেগবান হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর আগে গত ৪ অক্টোবর স্পেনে আবাসন সংকট নিয়ে বিক্ষোভ-সমাবেশের সংবাদ দেয় ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি। প্রতিবেদনে জানানো হয়, ‘রাজপথে ক্ষোভের’ কথা।
রাজধানী মাদ্রিদ ও গুরুত্বপূর্ণ শহর বার্সেলোনাসহ দেশটির অন্যান্য ছোট-বড় শহরে গণবিক্ষোভ হয়। দেশটিতে বাড়ি ভাড়া অনেক বেড়ে যাওয়ায় এবং তা দিতে না পারায় ৮৭ বছর বয়সী এক নারীকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। সেই ঘটনার পর সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়েন দেশবাসী।
অবস্থা বেগতিক দেখে স্পেনের বামপন্থি সরকার আগামী গ্রীষ্মে আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেয়।
স্পেনের প্রতিবেশী পর্তুগাল এবং ফ্রান্সের প্রতিবেশী বেলজিয়াম ও ইতালিতে বিক্ষোভ শুরু হয় একই দাবিতে অর্থাৎ, ‘দ্রব্যমূল্যের দাম কমাও’, ‘বাড়ি ভাড়া কমাও’, ‘শিক্ষাখাতে খরচ বাড়াও’।
বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলস ও পর্তুগালের রাজধানী লিসবনের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর সামনে তাঁবু খাটিয়ে প্রতিবাদ করছেন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। অন্যদিকে, ইতালির উত্তর থেকে দক্ষিণাঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে গণবিক্ষোভ। দেশটির বড় শহর মিলানে বিক্ষোভকারীদের সহিংস হয়ে উঠার চিত্র দেখতে পান বিশ্ববাসী। বিক্ষোভ দমনে ইতালির উগ্র-ডানপন্থি সরকারও শহরে শহরে সেনা নামায়।
এসব দেশের সঙ্গে এবার যুক্ত হতে যাচ্ছে ইউরোপের শীর্ষ অর্থনীতির দেশ জার্মানি।
আজ ২২ অক্টোবর জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়—জার্মানির তরুণরা ফ্রান্সের মতো গণবিক্ষোভের আয়োজন করতে যাচ্ছে। আয়োজক ‘জেন জি রিগেল্ট’ আগামী ৩১ অক্টোবর দেশটির বড় বড় শহরগুলোয় বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। তারা শান্তিপূর্ণ সমাবেশের কথা বলছে।
জার্মানির বিক্ষোভকারীরাও দেশটির শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের দাবি জানানোর পাশাপাশি জীবনযাত্রার খরচ কমানো, সামাজিক ন্যায়বিচার, জলবায়ু পরিবর্তন রোধ ও সবার জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ বন্ধের দাবি জানাবে, বলে প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়।
একই দিনে ফরাসি দৈনিক লো মোঁদ এক সংবাদের শিরোনাম করে—ফ্রান্স থেকে প্রেরণা পেয়ে গ্রিসের যুবকরা জীবনযাত্রা ও সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মান নিয়ে প্রতিবাদ করছে।
গত ২১ অক্টোবর গ্রিসের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা দেশজুড়ে বিক্ষোভ করেছে বলেও প্রতিবেদনটিতে জানানো হয়। তারা শিক্ষাখাতে কর্মী সংকট, পুরোনো অবকাঠামো ও বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
এখন ইউরোপের মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যাবে, মহাদেশটির পশ্চিম উপকূল থেকে উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ উপকূল এবং মধ্যাঞ্চলে তরুণদের ‘বিক্ষোভের আগুন’ ছড়িয়ে পড়েছে।
ইউরোপের যেসব দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে সেসব দেশের মধ্যে ফ্রান্স, পর্তুগাল, গ্রিসে আছে মধ্যপন্থি সরকার। অস্ট্রিয়া ও জার্মানিতে জোট গড়েছে মধ্য-ডান ও বামপন্থি দলগুলো। স্পেন ও আলবেনিয়ায় আছে বামপন্থি সরকার।
বেলজিয়াম শাসন করছে জাতীয়তাবাদীরা এবং ইতালিতে আছে উগ্র-ডানপন্থি দল।
অর্থাৎ, দেশে দেশে নানান রাজনৈতিক মতাদর্শের দল ক্ষমতায় থাকলেও বিক্ষোভের কারণ একই—নিত্যপণ্যের ক্রমবর্ধমান মূল্য বৃদ্ধি। ইউরোপের উন্নত দেশগুলোর মানুষ প্রতিদিনের খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
তারা বাড়ি ভাড়া, যাতায়াত ও শিক্ষার বাড়তি খরচও নিয়েও ক্ষিপ্ত।
বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন—২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে প্রতিবেশী রাশিয়ার আগ্রাসনের পর ইউরোপে শুরু হওয়া জ্বালানি সংকট চলতি বছর ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধের কারণে অনেক তীব্র হয়েছে।
গত ২০ অক্টোবর ফ্রান্স টুয়েন্টিফোরের এক প্রতিবেদনটিতে বলা হয়—ইউরোপীয় কমিশনের হিসাবে ইরান সংঘাতের কারণে ইউরোপের অন্তত ১১২ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়েছে। এর কারণে ব্যবসা ও জ্বালানি বাজার বিপর্যস্ত হয়েছে। গ্যাসের দাম প্রায় ১৪০ শতাংশ বেড়েছে। ডিজেলের দাম বেড়ে হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ।
জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় বাড়ি ভাড়া ও ব্যবসা-বাণিজ্যে বাড়তি চাপ পড়েছে। সেই চাপ পড়েছে ইউরোপের সরকারগুলোর ওপর।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রগতিবাদী সংবাদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণধর্মী অনুষ্ঠানের চ্যানেল ‘দ্য ইয়াং টার্ক’ (টিওয়াইটি) এর এক পডকাস্টে বলা হয়—ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ইইউভুক্ত দেশগুলো রাশিয়ার জ্বালানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলে ইউরোপে রুশ গ্যাসের আনুষ্ঠানিক প্রবেশ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সমস্যায় পড়ে ইউরোপের জনগণ।
এতে আরও বলা হয়, এমন নাজুক পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের প্ররোচনায় যুক্তরাষ্ট্র গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর আচমকা হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপের দেশগুলোয় তেল-গ্যাসের সরবরাহ ব্যাপকহারে কমে যায়।
এতে ইউরোপবাসীর দুর্দশা এতটাই বেড়ে যায় যে, সেখানকার মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করতে বাধ্য হচ্ছে।
বিক্ষোভে জর্জরিত দেশগুলোর সরকার যে মতাদর্শেরই হোক না কেন তারা এই বাস্তবতা মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হচ্ছে, বলেও পডকাস্টটিতে মন্তব্য করা হয়।
‘ইউরোপের মানুষ কেন প্রতিবাদ করছেন?’—এমন প্রশ্নের পাশাপাশি এর জবাবও পাঠকের কাছে তুলে ধরেছে ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান। গত ১৯ অক্টোবর সংবাদমাধ্যমটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়—শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর করুণ অবস্থা, চরম আবাসন সংকট ও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচের প্রতিবাদ করতে ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশের মানুষদের রাস্তায় নেমেছে।
এসব দেশের তালিকায় ফ্রান্স, পর্তুগাল ও স্পেন আছে, উল্লেখ করে প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়—মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জারেড কুশনারের বিলাসবহুল অবকাঠামো নির্মাণের প্রতিবাদে আলবেনিয়ায় গত গ্রীষ্ম থেকে আন্দোলন চলছে।
সম্প্রতি, ফ্রান্সে যখন বিক্ষোভ শুরু হয় তখন বেলজিয়াম, পর্তুগাল ও ইতালিতেও বিক্ষোভ-সমাবেশ দেখা যায়।
গত ২১ অক্টোবর দ্য গার্ডিয়ানের অপর এক প্রতিবেদনের শিরোনামে ইউরোপের বিক্ষোভকে ‘অ্যা পাওয়ারফুল ওয়ার্নিং’ হিসেবে উল্লেখ করে প্রশ্ন রাখা হয়—‘ইউরোপের বিক্ষুব্ধ প্রতিবাদকারীরা কি প্রকৃত রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যেতে পারবেন?’
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, গত ১০ বছরে পর্তুগালে বাড়ি ভাড়া ৩ গুণ ও স্পেনে বাড়ি ভাড়া দ্বিগুণ বেড়েছে। গত ৬ বছরে ফ্রান্সের সরকারি ঋণ জিডিপির ১০০ শতাংশের ওপরে পৌঁছেছে। গত ১০ বছরে বেলজিয়াম, স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি ও পর্তুগালে দ্রব্যমূল্য ও সেবার খরচ বিভিন্ন মাত্রায় বেড়েছে।
চলমান আন্দোলনে যোগ দেওয়া প্যারিসের এক ১৯ বছর বয়সী শিক্ষার্থী লোলা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘আমরা লড়াই করছি এ কারণে যে এখানে জীবনযাত্রার খরচ খুব বেশি। গ্যাসের দাম অনেক।’ তার মতে, সারাদেশে হাইস্কুলের শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের আরও শিক্ষক দরকার। ‘আরও ভালো’ পরিবেশে লেখাপড়ার সুযোগ দরকার।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইউরোশিয়া গ্রুপের ইউরোপ শাখার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজতাবা রহমান গণমাধ্যমটিকে বলেন, মনে হচ্ছে ইউরোপে ‘সমন্বয়’ করে বিক্ষোভ-সমাবেশ হচ্ছে।
স্পেনের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরানচা গঞ্জালেজ মনে করেন, ইউরোপে সমাজব্যবস্থা ‘ভেঙে’ পড়েছে।
তিনি ইতালীয় সংবাদমাধ্যম ‘কোরিয়েরে দেল্লা সেরা’-কে বলেন, ‘ফ্রান্সের তরুণরা বিক্ষোভ করছে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে এবং স্পেনের তরুণরা বিক্ষোভ করছে আবাসনের জন্য। কিন্তু, ইউরোপে জনকল্যাণ ও সামাজিক সাম্যের যে ধারণা ছিল তা জোর ধাক্কা খেয়েছে।’
গত ২০ অক্টোবর ফরাসি সংবাদমাধ্যম ফ্রান্স টুয়েন্টিফোর এক প্রতিবেদনের শিরোনামে জানানো হয়—ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সহিংস বিক্ষোভের জন্য চরম বামপন্থিদের দায়ী করেছেন। তিনি নিরাপত্তা বাহিনী নামানোসহ আরও কঠোর ব্যবস্থার আশ্বাস দিয়েছেন।
অন্যদিকে, ২৪ বছর বয়সী ডানা সাংবাদিকদের জানান—শিক্ষকের অভাবে তার ছোট বোনের ফ্রেঞ্চ ক্লাস গত বছর থেকে বন্ধ।
তিনি বলেন, ‘অবস্থা ভালো না। জীবনযাত্রার খরচ অনেক। একটু ভালো থাকার জন্য অনেক হিসেব কষে চলতে হয়। এসবের প্রতিবাদ করতে সমাবেশে এসেছি।’
ফরাসি সংবাদমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে—জ্বালানির দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। এর সঙ্গে চলছে আবাসন সংকট। এসব সামাজিক কারণে ইতালি, স্পেন, বেলজিয়াম ও পর্তুগালে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রতিবেদনগুলো বলা হচ্ছে, গণবিক্ষোভ শুধু ফ্রান্সেই হচ্ছে না। কিছু কিছু বিক্ষোভ বেশ সহিংস। ইউরোপজুড়ে এসব বিক্ষোভ ‘দাবানলের’ মতো ছড়িয়ে পড়ছে। আগামী ১১ নভেম্বর স্পেন ও পর্তুগালে ধর্মঘট ডাকা হয়েছে। আগামী ২০ নভেম্বর ইতালিতে ডাকা হয়েছে ধর্মঘট।
আরও বলা হয়, ইইউ সদস্য দেশগুলো যখন জ্বলছে তখন ইউনিয়নের রাজধানী ব্রাসেলসের মুখে ‘কুলুপ’। বিপরীতে, সদস্য দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ নীতি নিয়ে সাধারণত চুপ থাকা ইউরোপীয় কমিশন বলেছে, বিক্ষোভকারীদের লুটপাট ‘গ্রহণযোগ্য’ নয়।
প্রতিবেদন অনুসারে—উত্তরপূর্ব ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে মধ্য-ডানপন্থি ইউরোপিয়ান পিপলস পার্টি ও ডানপন্থি দলগুলো এই বিক্ষোভকে ‘রাজনৈতিকভাবে’ কাজে লাগাতে সরব হয়েছে। ‘ফ্রান্স, ইতালি ও বেলজিয়ামের আন্দোলনকে গণতন্ত্রবিরোধী সন্ত্রাস ও এসব ধ্বংসযজ্ঞের জন্য উগ্র-বামপন্থিদের দায়ী’ করে দলগুলো বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
গত ১৯ অক্টোবর ব্রিটেনের প্রভাবশালী টাইমস রেডিওর এক পডকাস্টে জানানো হয়, ফ্রান্সে প্রায় প্রতি প্রজন্মেই বড় বিক্ষোভ হয়। ফ্রান্সের রাষ্ট্রীয়-নীতির জন্ম হয় রাজপথেই। ফরাসি দেশের রাজনীতিতে এটি একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
২০১৮ সালেও ফ্রান্সে বিধ্বংসী গণবিক্ষোভ দেখেছিল বিশ্ববাসী।
বিশ্লেষক অ্যান্ড্রু নিলের ভাষ্য: এবার প্রথমদিকে সমাবেশগুলো শান্তিপূর্ণ ছিল। কিন্তু, পরে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। অর্থাৎ বিশৃঙ্খল হয়ে উঠে। চরম দুর্দশায় থাকা অভিবাসীরা সেই বিক্ষোভে যোগ দেন। শুরু হয় লুটতরাজ। যুক্ত হন উগ্র বামপন্থিরা। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে বিক্ষোভ শুরু হলেও ভাঙচুরের ঘটনায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল না।
তিনি মনে করেন—ফ্রান্সে ‘ক্ষোভ’ ও ‘লজ্জা’র রাজত্ব চলছে। রাষ্ট্রপতি মাখোঁ বিষয়টি তার ভাষণে তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘বার্নি স্যান্ডার্স’ বা ব্রিটেনের ‘জেরেমি করবিন’-এর মতো ফ্রান্সের উগ্র বামপন্থি নেতৃত্বের ওপর এই সহিংসতার দায় পড়ছে, বলেও মনে করেন তিনি।
তার মতে, ফ্রান্সের অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর মতো ফ্রান্স নিজ দেশের জনগণের সামাজিক সুরক্ষার জন্য প্রচুর অর্থ খরচ করতে গিয়ে অর্থনৈতিকভাবে ‘পঙ্গু’ হয়ে পড়ছে। এখন জনগণকে আর্থিক স্বস্তি দিতে গেলে ফ্রান্সকে সম্পদ বাড়াতে হবে। বর্তমানে ফ্রান্সে বেকারত্ব দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে। তা করতে না পারলে সহিংসতা বাড়বে বৈ কমবে না।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস জানিয়েছে—শুধু ফ্রান্স নয়, প্রতিবেশী বেলজিয়ামেও সহিংস বিক্ষোভের কথা জানাচ্ছে সংবাদমাধ্যমগুলো। সেখানে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়েছে।
ইতালির গুরুত্বপূর্ণ শহর মিলানেও শতাধিক দোকানে ভাঙচুর হয়েছে। সেখানেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে বিক্ষোভকারীরা পাথর ছুড়েছে। পুলিশও বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করেছে।
এতে জানানো হয়—তবে ফ্রান্সে সহিংসতা বেশি ছড়িয়েছে। সেখানে অন্তত ৩ হাজার দোকান ক্ষতিগ্রস্ত বা লুট হয়েছে।
সংবাদমাধ্যমটির এক প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়—ফ্রান্সে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলন গণ-সহিংসতার কারণে যেন ‘হাত ছাড়া’ হয়ে গেছে।
প্রায় ৬ মাস পরে ফ্রান্সে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। এমন বাস্তবতায় সেখানে উগ্র-ডান ও উগ্র-বামপন্থি দলগুলো বেশ আলোচনায়। ফরাসি রাষ্ট্রপতি ও দেশটির চরম ডানপন্থি নেতা মারি লো পেন এমন সংঘাতের জন্য চরম বামপন্থি দলগুলোর ওপর দোষ চাপিয়েছেন।
গত ১৯ অক্টোবর ফ্রান্স টুয়েন্টিফোর এক প্রতিবেদনে জানায়—শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতের পাশাপাশি জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে ইতালিতে বিক্ষোভ প্রথমে শান্তিপূর্ণ থাকলেও পরে তা সহিংস হয়ে পড়ে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে শিশুদেরও দেখা গেছে।
দেশটির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি বলেছেন, জনগণের বিক্ষোভ-সমাবেশের অধিকার আছে। যারা সহিংসতা করছে তারা গুন্ডা। তিনি সহিংসতা ঠেকাতে সেনা নামানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
ইউরোপের দেশে দেশে জাতীয় নির্বাচনের আগে যখন ডানপন্থি দলগুলো জনমনে উগ্রবাদী ধারণা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে, তখন এসব সহিংস বিক্ষোভ ডান-ধারার দলগুলোর ‘পালে বাড়তি হাওয়া’ দেবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ।
সামনে ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি, পোল্যান্ড ও গ্রিসে নির্বাচন আছে বলেও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা।
ফ্রান্সের এই সহিংস গণবিক্ষোভের কারণে দেশটির উগ্র ডানপন্থি নেতা লো পেনের দল লাভবান হবে।
গত ২০ অক্টোবর ফ্রান্স টুয়েন্টিফোরের এক প্রতিবেদনের শিরোনাম: ‘জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ক্ষোভ ইউরোপের উগ্র-ডানপন্থিদের শক্তিশালী করে তুলছে।’
এর আগের দিন আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে ফ্রান্সের চলমান আন্দোলনকে দেশটির এই চরম ডানপন্থি নেতার জন্য ‘বড়দিনের উপহার’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, আগামী এপ্রিলে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে লো পেনের দল ন্যাশনাল র্যালি প্রতিদ্বন্দ্বী মধ্য ও বামপন্থিদের তুলনায় এগিয়ে আছে। এই বিক্ষোভ থেকে লো পেন সুবিধা তোলার চেষ্টা করবেন বলেও মনে করছেন অনেকে।
মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এমিরিটাস পিটার ম্যাকফি সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, ‘যেহেতু বিক্ষোভে ফিলিস্তিন ও আলজেরিয়ার পতাকা ছিল তাই লো পেন এটা সবাইকে বোঝাতে পারবেন যে এই সহিংসতার সঙ্গে আফ্রিকার অভিবাসীদের সংযোগ আছে।’
ম্যাকফির মতে, এই বিক্ষুব্ধ আন্দোলন লো পেনের জন্য ‘বড়দিনের উপহার’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে জানানো হয়, ইতিহাস বলছে ফ্রান্সে যখনই সহিংস বিক্ষোভ হয় তখনই এর সুফল পায় ডান ও মধ্যপন্থিরা।
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েঁ ল্যোকর্ন্যু বলছেন, উগ্র বামপন্থিরা আগামী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ব্যাঘাত ঘটাতে চায়। তিনি প্রয়োজনে দেশটিতে ‘জরুরি অবস্থা’ ঘোষণার কথাও বলছেন।
ডানপন্থি নেতা লো পেন বামপন্থিদের সমালোচনার পাশাপাশি দেশটির ‘অভিবাসননীতি’র বিরোধিতা করছেন। জনমত জরিপে তিনি দেশটির পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হওয়ার দৌড়ে বেশ এগিয়ে আছেন।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, রাষ্ট্রপতি এমানুয়েল মাখোঁর মধ্যপন্থি দল জনগণের বিশ্বাস হারিয়েছে। অন্যদিকে, বামপন্থিদের ‘উগ্র-সহিংস’ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
ফ্রান্স টুয়েন্টিফোরের এক প্রতিবেদন অনুসারে—আগামী বছর ফ্রান্স, ইতালি ও পোল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতীয় নির্বাচনের আগে এই বিক্ষোভ-সমাবেশ ডানপন্থিদের হাত শক্তিশালী করবে। কেননা, অনেক ডানপন্থি দল রাশিয়া থেকে জ্বালানি কেনার পক্ষে কথা বলছে।
সংবাদমাধ্যমটি জানায়, ইতালির সিসিলির দক্ষিণে এক কৃষক ডিজেলের দামের প্রভাব তার ব্যানারে তুলে ধরেছেন এভাবে—‘জমি চাষ করে ঘরে তুলছি ঋণ’। অপর এক কৃষক সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘ডিজেলের দাম দ্বিগুণ হওয়ায় আমরা স্থবির হয়ে গেছি।’
দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকরা রাস্তায় ট্রাক্টর রেখে যান চলাচল বন্ধ করে প্রতিবাদ করেছেন।
এসব প্রতিবাদ-সমাবেশ সেখানকার উগ্র-ডানপন্থি জর্জিয়া মেলোনির সরকারকে বাড়তি চাপে ফেলছে বলেও মনে করছেন কেউ কেউ।
গত ২১ সেপ্টেম্বর প্যারিসে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দ্রুত সারা ফ্রান্সে ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাক্রমে সেসময় দেশটিতে সরকারের ব্যয় সংকোচননীতির প্রতিবাদে সরকারি কর্মীদের ধর্মঘট চলছিল।
ফ্রান্সের বিক্ষোভ-সমাবেশে তরুণদের বামপন্থিরা উসকে দিচ্ছেন, এমন মন্তব্যের সঙ্গে অনেকে মনে করছেন এর সঙ্গে মুসলিমরাও জড়িত। অনেক বিক্ষোভকারীর হাতে ‘বিসমিল্লাহ’ লেখা স্লোগান দেখে বহির্বিশ্বের অনেকে চলমান ফরাসি বিক্ষোভের সঙ্গে ইসলামের যোগসূত্র খুঁজছেন। কেউ কেউ সরাসরি বিক্ষোভকারীদের ‘ইসলামপন্থি’ বলেও আখ্যা দিচ্ছেন।
ইউরোপের বিক্ষোভ-সমাবেশের নিন্দা করে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, তিনি ফরাসি রাষ্ট্রপতিকে ‘অনেক আগেই’ বলেছিলেন যে পৃথিবীর সবদেশ থেকে নিজ দেশে মানুষে এনে ফ্রান্স ‘ভুল’ করছে।
হোয়াইট হাউসে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্যারিস দ্রুত মুসলিম শহরে পরিণত হচ্ছে।’
ট্রাম্প ‘৮/৯ বছর আগে ফ্রান্সের সীমানা বন্ধ করে দেওয়ার’ আহ্বান জানিয়েছিলেন উল্লেখ করে আরও বলেন, ‘আমরা আমাদের সীমানা বন্ধ করে দিয়েছি। মাখোঁ করেননি।’
এ দিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আরও এক ধাপ এগিয়ে ফ্রান্সের চলমান বিক্ষোভ-সহিংসতাকে ‘উগ্র ইসলামপন্থিদের আগ্রাসন’ বলে মন্তব্য করেছেন।
ফরাসি সংবাদমাধ্যম আই টুয়েন্টিফোরকে তিনি বলেন, ফ্রান্সের নেতারা ‘উগ্র ইসলামপন্থিদের’ সহিংসতা দমনে ব্যর্থ হয়েছেন।
ফ্রান্সের চলমান সহিংস বিক্ষোভের জন্য ‘উগ্র-বামপন্থি ও অভিবাসীরা’ দায়ী বলে মন্তব্য করেছেন জার্মানির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেক্সান্দার দবরিনদৎ। জার্মানির ট্যাবলয়েড ‘বিল্ড’-কে তিনি বলেন, যারা এটি মানেন না তারা পরিস্থিতি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন।
ফরাসি সরকার বিক্ষোভের জন্য বামপন্থিদের দায়ী করছে। সমালোচকরা একে বলছেন ‘লাল ফ্যাসিবাদ’।
তবে ফ্রান্সের চরম বামপন্থি ‘ফ্রান্স আনবাউড’ দলের নেতা জাঁ ল্যুক মেলেঁশঁ এভাবে বামপন্থিদের ওপর ঢালাও অভিযোগের প্রতিবাদ করেছেন। তিনি দেশটির প্রধানমন্ত্রীর কাছে সহিংসতায় বামপন্থিদের জড়িত থাকার প্রমাণ চেয়েছেন।
মেলেঁশঁ বলেছেন, বামপন্থিরা যে ফ্রান্সকে অরাজকতার দিকে ঠেলে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে এর প্রমাণ দেখানো হোক। তা না হলে তার উচিত ক্ষমা চাওয়া। পরিস্থিতিকে জটিল না করা।
টিওয়াইটির বিশ্লেষক জানক উইঘুর মনে করেন, এটা সত্যিই পরিহাসের বিষয় যে ইসরায়েলের প্ররোচনায় শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধের কারণে ইউরোপসহ পুরো বিশ্ব আজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অথচ, জায়নবাদী প্রচারণা যন্ত্রগুলো ক্রমাগত প্রচার করে যাচ্ছে যে ইউরোপের এই বিক্ষোভের জন্য মুসলমানরা দায়ী।
তবে ফরাসি রাষ্ট্রপতি মাখোঁ তার দেশের বিক্ষোভ নিয়ে বিশ্বনেতাদের ‘নির্বোধের মতো’ মন্তব্যের নিন্দা করেছেন।
ইউরোপের অস্থিরতা নিয়ে ‘নানা মুনির নানা মত’ থাকলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষায়, আশ্চর্যজনকভাবে প্রতিটি দেশের জনগণের দাবি একই রকম। সবাই ভালোমানের শিক্ষাব্যবস্থার দাবি করছেন। সবাই জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচ নিয়ে ক্ষিপ্ত।
তাদের মতে, বাস্তবতা হচ্ছে—ইউরোপজুড়ে চলছে হতাশার ঢেউ। ইউরোপবাসী তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার দেখছে। সরকারগুলো শিক্ষাখাতে কম বরাদ্দ দিচ্ছে। সবকিছুর দাম দিনকে দিন বেড়েই চলছে।
বিভিন্ন সূত্রে বর্তমানে ফ্রান্সে অভিবাসীর সংখ্যা প্রায় ১৮ শতাংশ বলা হলেও, ১৯৬০ এর দশকে যখন ঐতিহাসিক আন্দোলন-ধর্মঘট হয়েছিল তখন দেশটিতে অভিবাসীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৬ শতাংশ। তাই ফ্রান্সে আন্দোলনের জন্য অভিবাসীদের প্রয়োজন হয় না বলেও রসিকতা করেছেন অনেকে।
তাদের ভাষ্য: রাজনৈতিক হতাশা থেকে লোকজন পথে নামছেন। ফ্রান্সে করের হার বেশি। জনগণের সামাজিক নিরাপত্তার জন্য জিডিপির প্রায় ৫৭ শতাংশ খরচ করা হয়। কিন্তু, এ থেকে সুবিধা আসে কম। আবার সরকারের ঋণও অনেক বেড়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলবের্তো আলেমান্নো বলেন, ‘আন্দোলনে যে যুবকরা যোগ দিচ্ছেন তারা মনে করছেন, তাদের ওপর সরকারের মনোযোগ কম। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবা হচ্ছে না।’
তাই নিজেদের ভবিষ্যতের ভাবনা থেকেই ইউরোপের দেশে দেশে তরুণদের এমন বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। এটি আরবের ‘বসন্ত’ নয়, এটি ইউরোপের ‘শরৎ’। এখানে সরকার পতনের ডাক নেই; আছে জীবনযাত্রার মান উন্নত করার দাবি।a
