একজন নায়ক প্রেমে পড়বেন, প্রেমিকার জন্য লড়বেন। প্রয়োজনে পৃথিবী ওলটপালট করে দেবেন। কিন্তু প্রেমে হেরে গেলে কী করবেন? নিজের ভুলের মুখোমুখি হলে কেমন আচরণ করবেন? দীর্ঘদিন ভালোবাসার পর যদি প্রেমিকার সুখের জন্য নিজের আকাঙ্ক্ষা থেকে সরে আসতে হয়, তখন কী করবেন তিনি?
হিন্দি সিনেমার নায়কদের গল্পে এসব মুহূর্ত নতুন নয়। তবে নায়কের দুর্বলতাকেও দর্শকের ভালোবাসার কারণ করে তোলা, একজন ব্যর্থ মানুষ হিসেবেও তাকে গ্রহণযোগ্য করে তোলা—এই জায়গায় শাহরুখ খানের অভিনয় আমাদের নতুন করে ভাবায়।
১৯৯৪ সালের ‘কাভি হা কাভি না’ সিনেমার সুনীলের কথাই ধরা যাক। সে প্রেমে পড়ে, মিথ্যা বলে, ঈর্ষান্বিত হয়। নিজের ভালোবাসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় এমন অনেক কাজ করে, যেগুলোকে আদর্শ প্রেমিকের আচরণ বলা যায় না।
অথচ পর্দায় সুনীলকে দেখার অভিজ্ঞতা শুধু তার ভুলের হিসাব মেলানোর মধ্যে আটকে থাকে না। তার অপরিণত আচরণের আড়ালে আমরা দেখতে পাই এক অনিশ্চিত, ভুল করতে থাকা মানুষকে।
সুনীল প্রচলিত অর্থে কোনো বিজয়ী নায়ক নয়। নিজের ইচ্ছামতো তার প্রেম পূর্ণতা পায় না। তবু তার গল্পে এমন এক টান ও মায়া আছে, যা দর্শককে তার পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দেয়। সুনীলের মধ্য দিয়ে দর্শক যেন নিজেদের ভুল করারও একটা জায়গা খুঁজে পান।
শাহরুখের তারকাখ্যাতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এখানেই। তিনি শুধু প্রেম পাওয়ার আনন্দকে পর্দায় আকর্ষণীয় করে তোলেননি। প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কষ্ট, অসহায়ত্ব এবং নিজের আবেগের সঙ্গে লড়াই করার অভিজ্ঞতাকেও নায়কের গল্পের অংশ করেছেন।
কিন্তু একজন পুরুষের দুর্বলতা দর্শকের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে কীভাবে? পর্দায় এই দুর্বলতা প্রকাশের মধ্য দিয়ে পুরুষত্বের প্রচলিত ধারণায় আদৌ কোনো পরিবর্তন আসে কি?
হিন্দি সিনেমায় পুরুষ নায়কের শক্তি প্রদর্শনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। অন্যায়ের প্রতিবাদ, প্রতিশোধ, কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা কিংবা প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা—তথাকথিত নায়কোচিত পুরুষত্বের এসব বৈশিষ্ট্য বিভিন্ন সময়ে দর্শকের কাছে জনপ্রিয় হয়েছে।
অমিতাভ বচ্চনের ‘অ্যাংরি ইয়াং ম্যান’ ইমেজের সঙ্গে শাহরুখের তারকাচিত্রের তুলনা টেনে এই পার্থক্য বিশ্লেষণ করেছেন গবেষক প্রসিদা গোপীনাথ।
২০১৮ সালে ‘সেলিব্রিটি স্টাডিজ’ জার্নালে প্রকাশিত তার গবেষণাপত্রের শিরোনাম ‘আ ফিলিং ইউ ক্যাননট রেজিস্ট: শাহরুখ খান, অ্যাফেক্ট, অ্যান্ড দ্য রিস্ক্রিপ্টিং অব মেল স্টারডম ইন হিন্দি সিনেমা’। এতে শাহরুখের অভিনয়ে আবেগ, সংবেদনশীলতা এবং কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতার ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
গোপীনাথের বিশ্লেষণে শাহরুখের বিশেষত্ব শুধু তার রোমান্টিক নায়ক পরিচয়ে নয়। তার অভিনয়ের মধ্য দিয়ে পুরুষ তারকাখ্যাতির একটি নতুন ধরন তৈরি হয়েছিল। সেখানে দুর্বলতা ও সংবেদনশীলতাও পুরুষালি আকর্ষণের অংশ হয়ে ওঠে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে শাহরুখের সব চরিত্রই প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক ধারণা ভেঙে দেয়। বরং তার অভিনয়ের কিছু মুহূর্ত পুরুষত্বের প্রচলিত ধারণাকে আরও জটিল করে তোলে।
একজন পুরুষ নিজের কষ্ট প্রকাশ করতে পারেন। আবার সেই কষ্টের অজুহাতে অন্যের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টাও করতে পারেন। শাহরুখের কয়েকটি চরিত্রের দিকে তাকালে এই দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়।
১৯৯৩ সালের ‘ডর’ সিনেমার রাহুলের কথা ধরা যাক। কিরণের প্রতি তার প্রবল আকর্ষণ। কিন্তু প্রত্যাখ্যান মেনে নিতে না পেরে তার ‘ভালোবাসা’ ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ারে পরিণত হয়। একসময় তা আরও ভয়ংকর রূপ নেয়।
এখানে শাহরুখের অভিনয় আমাদের একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়: কোনো পুরুষের আবেগের তীব্রতা কি তাকে ভালোবাসার অধিকার দেয়? উত্তরটি হলো, না।
রাহুলের উদাহরণ দেখায়, দুর্বলতা নিজে থেকেই নৈতিক গুণ হয়ে ওঠে না। কান্না, আকুলতা কিংবা প্রত্যাখ্যানের কষ্ট একজন মানুষকে মানবিক করে তুলতে পারে। কিন্তু অন্যের সম্মতি অগ্রাহ্য করার অধিকার দিতে পারে না।
সুনীল ও রাহুলের মধ্যে পার্থক্যও এখানেই। দুজনেরই আকাঙ্ক্ষা প্রবল। দুজনই প্রত্যাখ্যানের মুখোমুখি হয়। কিন্তু তাদের আচরণ ও গল্পের পরিণতি আবেগের দুই ভিন্ন দিক তুলে ধরে। একজনের প্রতি তৈরি হয় মায়া, অন্যজনের প্রতি বিরক্তি। শাহরুখের অভিনয়ে এই বৈপরীত্যই ফুটে ওঠে।
শাহরুখের পর্দার পরিচয় অবশ্য এক জায়গায় স্থির থাকেনি। ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’র রাজ, ‘কাল হো না হো’র আমান মাথুর আর ‘মাই নেম ইজ খান’-এর রিজওয়ান খান—তিনটি চরিত্রের আবেগ প্রকাশের ধরন এক নয়।
রাজের ক্ষেত্রে প্রেমের পাশাপাশি পরিবারের সম্মতি ও সামাজিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। আমানের গল্পে আছে নিজের কষ্ট আড়াল করে অন্যদের সুখী করার চেষ্টা। আর রিজওয়ানের চরিত্রে রয়েছে মায়া, পরোপকার ও এক নির্ভেজাল মানবিকতা। তার আত্মপরিচয় নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
বিশেষ করে রিজওয়ানকে প্রচলিত রোমান্টিক নায়কের মাপকাঠিতে বিচার করলে তার চরিত্রের স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে যায়। বর্তমান সময়ের ‘আর্ট অব নোটিসিং’, ‘গ্রিন ফ্ল্যাগ’ কিংবা সম্পর্কে বাড়তি যত্ন নেওয়ার যে ধারণা, তার অনেক কিছুই রিজওয়ানের মধ্যে দেখা যায়।
আমান, রাজ কিংবা রিজওয়ানের ক্ষেত্রে প্রেম শুধু প্রেমিকের ব্যক্তিগত অনুভূতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা তাদের নিজেদের চরিত্রকেও ছাড়িয়ে যায়। তাই তো বেপরোয়া রাজও পরিবারের সম্মতি নিতে পাঞ্জাবে ফিরে আসে। প্রেমিকার সঙ্গে তাল মিলিয়ে উপবাসও করে। তিনটি চরিত্রেই প্রেম নারীকে জয় করার ক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
শাহরুখের দীর্ঘ অভিনয়জীবনে এই বৈশিষ্ট্য বিভিন্নভাবে ফিরে এসেছে।
শাহরুখ নিজেও তার রোমান্টিক তারকাচিত্র সম্পর্কে সচেতন। ২০১৭ সালে টেডের মঞ্চে ‘থটস অন হিউম্যানিটি, ফেইম অ্যান্ড লাভ’ শীর্ষক বক্তৃতায় তিনি মজা করে বলেছিলেন, লাখো মানুষের কাছে তিনি স্বপ্ন বিক্রি করেন, ভালোবাসার কথা পৌঁছে দেন। তার দর্শকেরা তাকে পৃথিবীর সেরা প্রেমিক মনে করেন। সেই ধারণাটিও তিনি ভাঙতে চান না।
২০২৪ সালে ‘দ্য গার্ডিয়ান’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শাহরুখ তার দীর্ঘ অভিনয়জীবন, অ্যাকশন হিরো হওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং পর্দার তারকাচিত্রের সঙ্গে ব্যক্তিগত সত্তার পার্থক্য নিয়ে কথা বলেছেন।
তার ক্যারিয়ারের এই পরিবর্তনও লক্ষণীয়। যে অভিনেতা রোমান্টিক নায়ক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন, তিনিই পরে অ্যাকশনকেন্দ্রিক চরিত্রে ফিরে এসে দর্শকের সামনে নিজের আরেকটি রূপ তুলে ধরেছেন।
শাহরুখের জন্মদিনে তার অভিনয়ের এই দিকটি নিয়ে আলোচনা তারকাখ্যাতির বাইরেও একটি প্রশ্ন সামনে আনে। আমরা পুরুষের কাছ থেকে আসলে কী প্রত্যাশা করি?
পুরুষ কি শুধু শক্ত থাকবেন, সিদ্ধান্ত নেবেন, ব্যর্থতা গোপন করবেন? অন্যের সামনে নিজের কষ্ট প্রকাশ করবেন না? নাকি তার অনিশ্চয়তা, কান্না ও ভুল করার অধিকারও থাকবে?
শাহরুখের অভিনয় এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর দেয় না। তার অনেক কালজয়ী চরিত্র প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক প্রত্যাশাকে সমর্থন করেছে। আবার কিছু চরিত্র সেই প্রত্যাশার সীমাবদ্ধতাও ভেঙেছে।
পর্দায় একজন পুরুষকে কাঁদতে দেখা মানেই সমাজে পুরুষের আবেগ প্রকাশের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাওয়া নয়। তবে কোনো জনপ্রিয় তারকার অভিনয়ে সেই আবেগ বারবার ফিরে এলে দর্শকও পুরুষত্বের প্রচলিত ধারণাকে নতুন করে দেখার সুযোগ পান।
‘লাডলা’ সিনেমায় অনিল কাপুর অভিনীত রাজু যখন শ্রীদেবী অভিনীত শীতলকে চড় মারেন, তখন ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’র রাজকে দেখা যায় তার হবু শাশুড়ির সঙ্গে বসে সবজি বাছতে। শাহরুখের চরিত্রগুলোর বিশেষত্ব এখানেই।
