একবার ক্যাডেট কলেজগুলোর দিকে তাকালেই বাংলাদেশের সাধারণ সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্যা বোঝা যায়।
এইচএসসির ফলাফল দিয়ে শুরু করা যাক। দেশের ১২টি ক্যাডেট কলেজের ৫৬৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৫৩৬ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে। অর্থাৎ ৯৪ শতাংশ। ১০ জন ক্যাডেট এইচএসসি পরীক্ষা দিলে তাদের মধ্যে অন্তত নয়জন জিপিএ-৫ পেয়েছে।
এসএসসি পরীক্ষার কথাই ধরা যাক। ৬১৮ জন ক্যাডেটের মধ্যে ৬০৭ জন (৯৮ দশমিক ২২ শতাংশ) জিপিএ-৫ পেয়েছে। কোনো পরীক্ষায় একজনও ফেল করেনি।
অন্যদিকে সাধারণ কলেজে মাত্র অর্ধেক শিক্ষার্থী এইচএসসি পাস করতে পেরেছে।
গত দুই দশকের বেশি সময়ের মধ্যে এবারই এইচএসসিতে পাসের হার সর্বনিম্ন, ৫১ দশমিক ৬২ শতাংশ। ফেল করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ছয় লাখ। ১৮১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি।
এবারের এসএসসিতেও এই চিত্র ছিল প্রায় একই। পাসের হার ৬৪ দশমিক ০৫ শতাংশ, যা ২০০৭ সালের পর সর্বনিম্ন। এ পরীক্ষায় কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি, এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩১২।
এ বছর এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় প্রায় ১২ লাখ শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে কয়েকজন কিংবা কয়েক হাজার শিক্ষার্থী ফেল করলে সেটিকে ব্যক্তিগত ব্যর্থতা বা চেষ্টার ঘাটতি বলে ব্যাখ্যা করা যেত। কিন্তু একটি পরীক্ষায় যখন প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীই ফেল করে; তখন সমস্যার গোড়া যে পুরো ব্যবস্থায়, তা বুঝতে বেগ পেতে হয় না।
একই দেশে দুই ধরনের প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার এ তীব্র ফারাক শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত ব্যর্থতা স্পষ্ট করে তোলে।
বাংলাদেশে একজন সাধারণ শিক্ষার্থী ও একজন ক্যাডেটের পেছনে ব্যয় করা সম্পদের তুলনা করা যাক। সাবেক শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি সংসদে জানিয়েছিলেন, একজন ক্যাডেট কলেজের শিক্ষার্থীর পেছনে সরকার বছরে প্রায় ৫ লাখ ৩৪ হাজার টাকা ব্যয় করে। যা উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীর পেছনে করা সরকারি ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ।
আর এই পার্থক্য শুধু অর্থের পরিমাণে শেষ হয়ে যায় না।
ক্যাডেট কলেজের শিক্ষার্থীরা আবাসিক পরিবেশে সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধান ও কঠোর শৃঙ্খলার মধ্যে থাকে। প্রতিদিন তারা তিন বেলা পূর্ণাঙ্গ খাবার ও দুই বেলা নাশতা পায়। ক্যাডেট কলেজগুলোতে শিক্ষকসংকট খুব কমই দেখা যায়। পাশাপাশিনে রয়েছে উন্নত সুযোগ-সুবিধা, শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা এবং স্থিতিশীল শিক্ষার পরিবেশ।
দুই ধরনের শিক্ষার্থীদের ফলাফলের এই পার্থক্য কেবল মেধার কারণে তৈরি হয়নি; বরং ভিন্ন পরিবেশ, সম্পদ বণ্টন ও অগ্রাধিকারের সুস্পষ্ট প্রতিফলন এটি।
পর্যাপ্ত অর্থায়ন, যোগ্য শিক্ষক, শক্তিশালী নেতৃত্ব, কার্যকর তদারকি এবং শিক্ষা ও ব্যক্তিগত বিকাশের সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কতটা ভালো করতে পারে, তার উদাহরণ দেশের ক্যাডেট কলেজগুলো।
কয়েক দশকের মধ্যে এসএসসি ও এইচএসসির সবচেয়ে খারাপ ফলাফল আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার গভীরে প্রোথিত দুর্বলতাগুলোই সামনে নিয়ে এসেছে।
অনেক স্কুল-কলেজে এখনো যোগ্য শিক্ষকের সংকট রয়েছে। বিজ্ঞানাগারে পর্যাপ্ত সরঞ্জাম নেই, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির সুবিধা সব প্রতিষ্ঠানে সমানভাবে পৌঁছায়নি। এমনকি কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে এসব সুবিধা একেবারেই নেই। বিজ্ঞান বিষয়ে ব্যবহারিক শিক্ষার সুযোগও অত্যন্ত সীমিত।
বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো ইংরেজি, গণিত এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বল ফল। উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং ক্রমবর্ধমান জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে অংশগ্রহণের ভিত্তি তৈরি করে এ বিষয়গুলো।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি কাঠামোগত ব্যর্থতা হলো প্রাইভেট টিউশনের ওপর নির্ভরশীলতা। এটি শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের অকার্যকারিতার একটি বড় প্রমাণ।
যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকদের সঙ্গেও শিক্ষার মান সম্পর্কিত।
বাংলাদেশে শিক্ষকদের বেতন তুলনামূলকভাবে কম। ফলে মেধাবী ও ভালো ফল করা অনেক শিক্ষার্থী পেশা হিসেবে শিক্ষকতা বেছে নিতে আগ্রহী হন না।
অনেক শিক্ষকই শিক্ষাদান পদ্ধতি বা শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়াই নিজেদের কর্মজীবন শুরু করেন। প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। তার ওপর অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ও সীমিত সম্পদের শ্রেণিকক্ষে প্রশিক্ষণে অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগ করাও শিক্ষকদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
দক্ষতা ও সম্পদের এই ঘাটতি দূর করতে প্রয়োজন বিপুল সরকারি বিনিয়োগ, যা এখনো অপর্যাপ্ত।
বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ২ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ইউনেস্কোর সুপারিশ অনুযায়ী, এ খাতে জিডিপির ৪ থেকে ৬ শতাংশ অথবা মোট সরকারি ব্যয়ের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বরাদ্দ থাকা উচিত।
তবে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা শিক্ষায় বিনিয়োগ অগ্রাধিকার দেয় না। কেননা এ বিনিয়োগের ফল পেতে বছরের পর বছর, কখনো দশক ধরে অপেক্ষা করতে হয়। তার বদলে দৃশ্যমান ভৌত অবকাঠামোয় বিনিয়োগ দ্রুত রাজনৈতিক সুফল এনে দিতে পারে।
ক্যাডেট কলেজ ও সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার ফলাফলের এই তীব্র বৈপরীত্য একটি সহজ বাস্তবতা তুলে ধরে। শিক্ষার্থীদের সাফল্য শুধু তাদের মেধার ওপর নয়, বরং শিক্ষার্থীরা কী ধরনের সুযোগ ও সহায়তা পাচ্ছে, তার ওপরও নির্ভর করে।
সবার জন্য এসব সুযোগ সমানভাবে নিশ্চিত করা না গেলে ফলাফলের এ বৈষম্যও থেকে যাবে।
