নতুন ফোন কেনার সময় পুরোনো ফোনটি বিক্রি করতে গেলে বেশিরভাগ মানুষের প্রথম চিন্তা আসে ‘ফ্যাক্টরি রিসেট দিলেই সব মুছে যাবে’। কথাটা পুরোপুরি ভুল নয়, কিন্তু অসম্পূর্ণ।
ফ্যাক্টরি রিসেট ফোনের ভেতরের তথ্য মুছে দিতে পারে, কিন্তু তার আগে কয়েকটি কাজ না করলে ঝামেলা থেকেই যেতে পারে। যেমন: প্রয়োজনীয় ছবি-ভিডিও হারিয়ে যেতে পারে, পুরোনো গুগল বা অ্যাপল অ্যাকাউন্টের কারণে নতুন মালিক ফোন চালু করতে সমস্যায় পড়তে পারেন, ই-সিম বা মেমোরি কার্ডে তথ্য থেকে যেতে পারে। এমনকি ব্যাংকিং বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সেবা নতুন ফোনে ঠিকমতো স্থানান্তর হয়েছে কি না, সেটিও নিশ্চিত হওয়া দরকার।
তাই, ফ্যাক্টরি রিসেট শেষ ধাপ, একমাত্র নয়।
১. আগে প্রয়োজনীয় সব তথ্যের ব্যাকআপ নিন
ফোন বিক্রির আগে প্রথম কাজ হলো প্রয়োজনীয় তথ্য নিরাপদে রেখে দেওয়া। ছবি, ভিডিও, যোগাযোগের তালিকা, গুরুত্বপূর্ণ নথি, নোট, হোয়াটসঅ্যাপের আলাপ—যা কিছু দরকার, সবকিছুর ব্যাকআপ নিন।
অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীরা গুগল অ্যাকাউন্ট ও গুগল ফটোস ব্যবহার করতে পারেন। আইফোন ব্যবহারকারীরা আইক্লাউড বা কম্পিউটারে ব্যাকআপ রাখতে পারেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—ফ্যাক্টরি রিসেট দেওয়ার আগে নিশ্চিত হওয়া যে, প্রয়োজনীয় কিছু বাদ যায়নি।
২. নতুন ফোনে প্রয়োজনীয় সবকিছু ঠিকমতো এসেছে কি না দেখে নিন
পুরোনো ফোন থেকে মুছে ফেলার আগে নতুন ফোনে আপনার প্রয়োজনীয় সবকিছু ঠিকঠাক এসেছে কি না, নিশ্চিত হয়ে নিন। ছবি আছে কি না, যোগাযোগের নম্বর এসেছে কি না, হোয়াটসঅ্যাপের ডেটা ফিরে এসেছে কি না, ব্যাংকিং অ্যাপ ঠিকমতো চালু হচ্ছে কি না—এসব আগে দেখে নেওয়া ভালো।
কারণ, পুরোনো ফোন একবার ফ্যাক্টরি রিসেট করে ফেললে পরে কোনো তথ্য বাদ পড়ে গেলেও ফেরত পাওয়া কঠিন হতে পারে।
৩. ব্যাংকিং ও গুরুত্বপূর্ণ অ্যাপ থেকে বের হয়ে আসুন
ফোনে ব্যাংকের অ্যাপ, মোবাইল আর্থিক সেবা, ই-মেইল, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ সেবা চালু থাকলে সেগুলো থেকে সাইন আউট নিশ্চিত করে নিতে হবে। বিশেষ করে ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবার ক্ষেত্রে পুরোনো ফোনটি আর কোনো সক্রিয় ডিভাইস হিসেবে যুক্ত আছে কি না দেখে নিন।
এতে করে নতুন ফোনে প্রবেশের সময় জটিলতা কমবে এবং পুরোনো ডিভাইসের সঙ্গে আপনার হিসাবের সম্পর্কও পরিষ্কার থাকবে।
৪. গুগল বা অ্যাপল অ্যাকাউন্ট সরিয়ে ফেলুন
এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। অ্যান্ড্রয়েড ফোন বিক্রির আগে ফোন থেকে নিজের গুগল অ্যাকাউন্ট সরিয়ে ফেলুন। আর আইফোন হলে অ্যাপল অ্যাকাউন্ট থেকে সাইন আউট করুন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ‘ফাইন্ড মি’ বন্ধ করুন।
এটি না করলে নতুন মালিক ফোন চালু করার সময় আগের মালিকের গুগল বা অ্যাপল অ্যাকাউন্টের তথ্য চাইতে পারে।
অ্যান্ড্রয়েডে এই সুরক্ষা ব্যবস্থাকে ‘ফ্যাক্টরি রিসেট প্রটেকশন’ বলা হয়, আর আইফোনে ‘অ্যাক্টিভেশন লক’ নামে পরিচিত। অর্থাৎ ফ্যাক্টরি রিসেট দিলেও অ্যাকাউন্ট ঠিকভাবে সরানো না হলে ফোনটি নতুন মালিকের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত না-ও হতে পারে।
৫. সিম, ই-সিম ও মেমোরি কার্ড সরিয়ে নিন
ফোন থেকে সিম কার্ডটি অবশ্যই খুলে নিন। ই-সিম ব্যবহার করলে সেটিও মুছে ফেলুন বা নতুন ফোনে স্থানান্তর করুন। মেমোরি কার্ড থাকলে বের করে নিন। কারণ, সেখানে ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও বা নথি থেকে যেতে পারে।
অনেকেই ফ্যাক্টরি রিসেট দিয়েই নিশ্চিন্ত হন। কিন্তু সিম বা মেমোরি কার্ড ফোনে রেখেই বিক্রি করে ফেলেন। এটি বড় ভুল।
৬. স্মার্টওয়াচ বা অন্য সংযুক্ত ডিভাইস বিচ্ছিন্ন করুন
ফোনের সঙ্গে স্মার্টওয়াচ, ইয়ারফোন, গাড়ির ব্যবস্থা বা অন্য কোনো ডিভাইস যুক্ত থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী সেগুলোর সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দিন। বিশেষ করে আইফোন ব্যবহারকারীদের অ্যাপল ওয়াচ থাকলে আগে সেটি আনপেয়ার করা ভালো। এতে পরে নতুন ফোনে সংযোগ দিতে সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি কমে।
৭. সবশেষে ফ্যাক্টরি রিসেট দিন
সব ব্যাকআপ নেওয়া, অ্যাকাউন্ট সরানো, সিম-মেমোরি কার্ড খুলে রাখা এবং প্রয়োজনীয় সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর এবার ফ্যাক্টরি রিসেট দিন।
অ্যান্ড্রয়েডে সেটিংস→সিস্টেম/জেনারেল ম্যানেজমেন্ট→রিসেট→ফ্যাক্টরি ডেটা রিসেট এবং আইফোনে সেটিংস→জেনারেল→ট্রান্সফার অর রিসেট আইফোন→ইরেজ অল কনট্যাক্ট অ্যান্ড সেটিংস পাওয়া যাবে।
ফোনের ব্র্যান্ড ও সংস্করণভেদে মেন্যুর নাম কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।
শুধু গ্যালারি থেকে ছবি বা ফাইল মুছে ফেললেই ফোন পুরোপুরি পরিষ্কার হয়ে যায় না। তাই বিক্রির আগে ফ্যাক্টরি রিসেট দেওয়াই নিরাপদ।
ফ্যাক্টরি রিসেট শেষ হলে ফোনটি আবার চালু করুন। যদি নতুন ফোন চালুর মতো ওয়েলকাম স্ক্রিন দেখা যায়, তাহলে সাধারণত বুঝতে পারবেন রিসেট সম্পন্ন হয়েছে। তবে নতুন করে সেটআপ করবেন না।
যদি পুরোনো গুগল বা অ্যাপল অ্যাকাউন্টের তথ্য চাইতে থাকে, তাহলে বুঝতে হবে ফোনটি এখনো পুরোপুরি আগের মালিকের হিসাব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি। সেক্ষেত্রে বিক্রি করার আগে বিষয়টি ঠিক করে নিন।
আধুনিক অ্যান্ড্রয়েড ও আইফোনে তথ্য সাধারণত এনক্রিপ্ট করা থাকে। তাই সঠিকভাবে ফ্যাক্টরি রিসেট দেওয়ার পর আগের তথ্য সাধারণভাবে উদ্ধার করা কঠিন হয়ে যায়। কিন্তু সমস্যা হলো—ফ্যাক্টরি রিসেট আপনার হয়ে ব্যাকআপ নেয় না, সিম খুলে দেয় না, সবসময় ই-সিম বা মেমোরি কার্ডের বিষয় সামলায় না, আর আপনার গুগল বা অ্যাপল অ্যাকাউন্ট নতুন মালিকের জন্য ঠিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়েছে কি না সেটিও নিশ্চিত করে না।
তাই শুধু ‘সব মুছে গেল কি না’ নয়, ‘ফোনটি নতুন মালিকের জন্য ঠিকভাবে প্রস্তুত হলো কি না’ সেটা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
