ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে টানা কয়েকদিনের বিক্ষোভ-আন্দোলনের পর বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিরপুরের পোশাক শিল্পাঞ্চলে কিছুটা ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে।
সকালের দিকে পরিস্থিতি বিবেচনায় মিরপুর ও পল্লবী এলাকার কারখানাগুলো বন্ধ থাকলেও দুপুরে সেগুলো পুনরায় খুলে দেওয়া হয়। এসময় অনেক শ্রমিককে কাজে ফিরতে দেখা যায়।
মজুরি বাড়ানোর আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকার মিরপুরসহ গাজীপুরের কালিয়াকৈর, সাভার, আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি গত কয়েকদিন ধরেই ছিল উত্তাল।
আন্দোলন চলাকালে বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের দফায় দফায় সংঘর্ষ, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া এবং পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। এসব ঘটনায় মামলাও দায়ের হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে পোশাকশ্রমিকদের জন্য গঠিত ন্যূনতম মজুরি বোর্ড নতুন মজুরিকাঠামো চূড়ান্ত করতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, নতুন এই মজুরিকাঠামো আগামী ডিসেম্বর থেকে কার্যকর করা হবে।
সরেজমিন দেখা যায়, আজ সকাল থেকেই মিরপুর এলাকায় পুলিশের কড়া নজরদারি ও সতর্ক অবস্থান ছিল। নিয়মিত সময়ে (সকাল ৮টা) কাজে গিয়ে অনেক শ্রমিক কারখানা প্রধান ফটক বন্ধ দেখতে পান। পরে দুপুরের দিকে কারখানা খোলার সিদ্ধান্ত জানানো হলে তারা পুনরায় কাজে যোগ দেন।
মিরপুর ও পল্লবী এলাকার একাধিক পোশাক কারখানা ঘুরে শ্রমিক এবং কারখানা কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তবে চলমান পরিস্থিতি ও মামলার কারণে অনেকেই পরিচয় প্রকাশে রাজি হননি। বিশেষ করে পুরুষ শ্রমিকদের কেউই কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তবে কারখানার কয়েকজন নারী শ্রমিক সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন।
মিরপুর ৭ নম্বরে একটি কারখানায় মেশিন অপারেটর হিসেবে কাজ করেন নাসিমা বেগম। তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘দেখুন, আমরা তো আসলে গার্মেন্টস শ্রমিক। আমাদের অনেক পরিশ্রম, যেটা সাধারণ মানুষ বোঝে না। ঠিক টাইমে অফিসে আসতে হয়, কাজের টার্গেট থাকে, এরপর ওভারটাইম থাকে।’
তিনি জানান, ১০ বছর ধরে কাজ করে তার মূল বেতন ১৬ হাজার টাকার কিছু বেশি। ওভারটাইমসহ হাতে পান ২৩ থেকে ২৪ হাজার টাকা। অথচ এর মধ্যে বাসাভাড়াতেই চলে যায় ১২ হাজার টাকা। তার স্বামী অটোরিকশা চালান, কিন্তু তার আয়ও আগের মতো নেই। এই আয়ে সন্তানদের ভালো-মন্দ খাওয়ানোই কঠিন হয়ে পড়ে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বিবেচনা করার দাবি জানিয়ে এই পোশাককর্মী বলেন, ‘ভিয়েতনাম, চীন ও ভারতসহ অন্যান্য দেশে যেমন বেতন দেওয়া হয়, আমাদের ক্ষেত্রেও সেটা বিবেচনা করা উচিত।’
তবে বাস্তবতার কথাও তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘গার্মেন্টস যদি টিকে থাকে, তবেই আমাদের চাকরি টিকে থাকবে। বেতন বাড়ানো হলো, কিন্তু পরে কারখানা বা চাকরি থাকল না—এমনটা যেন না হয়। জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে, তার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে একটি যৌক্তিক মজুরি নির্ধারণ করা দরকার।’
আরেক পোশাককর্মী নিলুফা জানান, তিনি ১৪ বছর ধরে কাজ করছেন। ওভারটাইমসহ তার মাসিক আয় ১৯ থেকে ২৩ হাজার টাকার মধ্যে। স্বামী-সন্তানসহ তিনজনের সংসারে বাসাভাড়ায় যায় ৭ হাজার টাকা। আর সিলিন্ডার গ্যাসসহ থাকার অন্যান্য খরচ মিলিয়ে চলে যায় ৯ হাজার টাকা।
তিনি বলেন, ‘মালিকপক্ষ বেতন বাড়ালে অতিরিক্ত কাজের চাপ দেয়, শ্রমিক ছাঁটাই করে, ছুটিসহ অন্যান্য সুবিধায় কড়াকড়ি করে। আবার বেতন বাড়াতে গিয়ে কিছু গার্মেন্টস বন্ধও হয়ে যেতে পারে, সেটাও আমরা জানি। কিন্তু বর্তমানে জিনিসপত্রের যে দাম, তাতে এই বেতনে আসলে কারও পক্ষেই চলা সম্ভব হচ্ছে না।’
তিনি বলেন, ‘ফ্যাক্টরি টিকে থাকলে শ্রমিক টিকে থাকবে, আবার শ্রমিক টিকে থাকলেই গার্মেন্টস টিকে থাকবে। তবে আন্দোলনে যেসব ভাঙচুর হয়েছে, সেগুলোর জন্য সাধারণ শ্রমিকদের যেন হয়রানির শিকার হতে না হয়। যারা ভাঙচুর করেছে তারা দুষ্কৃতকারী, সাধারণ শ্রমিকেরা এর সঙ্গে ছিল না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের খুঁজে বের করুক।’
এদিকে এ প্লাস গ্রুপের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট (এইচআর অ্যান্ড অ্যাডমিন) দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘গত কয়েক দিন ধরে গার্মেন্টস সেক্টরে চলা অস্থিরতায় শিপমেন্টসহ নানা দিক দিয়ে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। ক্ষতির পরিমাণ এখনো পুরোপুরি হিসাব করা হয়নি। আমরা চাই দ্রুত পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে যাক।’
তবে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আট-দশটি কারখানায় যেভাবে সিদ্ধান্ত হবে, আমাদের ক্ষেত্রেও তা-ই হবে।’
